পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের তাড়াতে যৌন সহিংসতা ছড়াচ্ছে ইসরায়েলিরা

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করতে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীরা যৌন সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। মানবাধিকার ও আইন বিশেষজ্ঞরা এমন অভিযোগ তুলেছেন। ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুরা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে হামলা, জোরপূর্বক নগ্ন করা, শরীরের ভেতরে আক্রমণাত্মক ও বেদনাদায়ক তল্লাশি, ইসরায়েলিদের নিজেদের যৌনাঙ্গ প্রদর্শন এবং যৌন সহিংসতার হুমকি। গত তিন বছরে ওয়েস্ট ব্যাংক প্রোটেকশন কনসোর্টিয়ামের গবেষকরা সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার ১৬টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন। তবে লজ্জা ও সামাজিক ঘৃণার ভয়ে অনেকেই প্রকাশে অভিযোগ তোলেননি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর এই জোট জানায়, যৌন সহিংসতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে, তাদের নিজ ভূমি ও বাড়িতে থাকা বা সেখান থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে এবং দৈনন্দিন জীবনের ধারা পরিবর্তন করতে। ‘পশ্চিম তীরে যৌন সহিংসতা এবং জোরপূর্বক স্থানান্তর’ শীর্ষক গবেষণায় ২০২৩ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের কমিউনিটি ও তাদ

পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের তাড়াতে যৌন সহিংসতা ছড়াচ্ছে ইসরায়েলিরা

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করতে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীরা যৌন সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। মানবাধিকার ও আইন বিশেষজ্ঞরা এমন অভিযোগ তুলেছেন।

ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুরা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে হামলা, জোরপূর্বক নগ্ন করা, শরীরের ভেতরে আক্রমণাত্মক ও বেদনাদায়ক তল্লাশি, ইসরায়েলিদের নিজেদের যৌনাঙ্গ প্রদর্শন এবং যৌন সহিংসতার হুমকি।

গত তিন বছরে ওয়েস্ট ব্যাংক প্রোটেকশন কনসোর্টিয়ামের গবেষকরা সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার ১৬টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন। তবে লজ্জা ও সামাজিক ঘৃণার ভয়ে অনেকেই প্রকাশে অভিযোগ তোলেননি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর এই জোট জানায়, যৌন সহিংসতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে, তাদের নিজ ভূমি ও বাড়িতে থাকা বা সেখান থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে এবং দৈনন্দিন জীবনের ধারা পরিবর্তন করতে।

‘পশ্চিম তীরে যৌন সহিংসতা এবং জোরপূর্বক স্থানান্তর’ শীর্ষক গবেষণায় ২০২৩ সাল থেকে ফিলিস্তিনিদের কমিউনিটি ও তাদের বাড়ির ভেতরে যৌন সহিংসতা এবং অপমানজনক আচরণের বাড়তে থাকা ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রস্রাব করা, বেঁধে রেখে ও নগ্ন করে অপমানজনক ছবি তোলা ও তা ছড়িয়ে দেওয়া, শৌচাগার ব্যবহার করতে যাওয়া নারীদের অনুসরণ করা এবং নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। সামাজিক কলঙ্কের শঙ্কায় এসব ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব যৌন সহিংসতা ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জানিয়েছে, নারী ও শিশুদের ওপর বাড়তে থাকা সহিংসতা, বিশেষ করে মেয়েদের লক্ষ্য করে যৌন হয়রানি তাদের এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে।

অভিযোগ উঠেছে, এসব নির্যাতনের সময় উপস্থিত ইসরায়েলি সেনারা বারবার তা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন বা দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। এক নারীকে দুই নারী সেনা তার বাড়িতে ঢুকে বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ শরীর তল্লাশির জন্য কাপড় খুলতে বাধ্য করেন ও তাকে ‘বেদনাদায়ক অভ্যন্তরীণ তল্লাশির’ শিকার হতে হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাকে এমনভাবে পা খুলতে বলা হয়েছিল, যাতে তিনি ব্যথা অনুভব করেন। পাশাপাশি তার প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করা হয় ও শরীরের সংবেদনশীল অংশে স্পর্শ করা হয়।

শুধু নারী নয়, পুরুষদেরও যৌন নির্যাতন ও হয়রানির লক্ষ্যবস্তু করেছে দখলদার ইসরায়েলিরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গত মাসে উত্তর জর্ডান ভ্যালির খিরবেত হুমসা এলাকার ২৯ বছর বয়সী কুসাই আবু আল-কেবাশকে নগ্ন করে তার যৌনাঙ্গে প্লাস্টিকের বাঁধন লাগিয়ে তার কমিউনিটি ও আন্তর্জাতিক কর্মীদের সামনে মারধর করেন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা।

২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ওয়াদি আস-সিক গ্রামের ফিলিস্তিনিদের নগ্ন করে হাতকড়া পরিয়ে মারধর করা হয়, তাদের ওপর প্রস্রাব করা হয়, ঝাড়ুর হাতল দিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় এবং তাদের নগ্ন ছবি তুলে তা প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়- এমন অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমনকি যখন কোনো কমিউনিটি বাস্তুচ্যুত হয়নি, তখনো যৌন সহিংসতা ও হয়রানির গুরুতর প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে নারী ও কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলিদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে মেয়েরা স্কুল ছেড়ে দিয়েছে ও নারীরা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।

এছাড়া এই পরিস্থিতির কারণে বাল্যবিয়ের প্রবণতাও বেড়েছে। মেয়েদের নিরাপদ রাখতে অনেক পরিবার অল্প বয়সেই তাদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া অন্তত ছয়টি পরিবার ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ে দিয়েছে।

রামাল্লাহভিত্তিক উইমেন’স সেন্টার ফর লিগ্যাল এইড অ্যান্ড কাউন্সিলিংও ফিলিস্তিনি নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা এবং হয়রানির মাধ্যমে কমিউনিটিকে ভেঙে দেওয়া ও বাস্তুচ্যুত করার প্রমাণ নথিভুক্ত করেছে।

সংস্থাটি জানিয়েছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে নারীরা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন, যার মধ্যে তল্লাশির সময় জোরপূর্বক প্রবেশ করানোও রয়েছে। এছাড়া চেকপয়েন্টে ইসরায়েলি সেনারা নিজেদের উন্মুক্ত করা এবং তল্লাশির সময় কিশোরীদের স্পর্শ করার ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি ঋতুস্রাব চলাকালে মেয়েদের নিয়ে উপহাস করার ঘটনাও সামনে এসেছে।

ডব্লিউসিএলএসি’র অ্যাডভোকেসি ইউনিট ম্যানেজার কিফায়া খরাইম বলেন, মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে না ও অল্প বয়সে জোরপূর্বক তাদের বিয়ে হচ্ছে। তারা সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক, কিন্তু তাদের মা-বাবা তাদের নিরাপত্তার জন্য এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে চাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, যৌন সহিংসতার কারণে নারীরা কাজে যেতে পারছেন না, ফলে তারা চাকরি হারাচ্ছে এবং বাড়িতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

খরাইম জানান, তাদের দল হয়তো মোট ঘটনার খুব সামান্য অংশই জানতে পেরেছে। এটি হয়তো মোট ঘটনার ১ শতাংশ। স্থানীয় কমিউনিটির আস্থা অর্জন করে এসব তথ্য জানতে আমাদের অনেক গবেষণা করতে হয়েছে।

ইসরায়েলভিত্তিক সংস্থা ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস ইসরায়েলের অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চল বিভাগের প্রধান মিলেনা আনসারি বলেন, পশ্চিম তীরে যৌন সহিংসতা ও হয়রানির এই বৃদ্ধি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলার দায়মুক্তির সংস্কৃতির মধ্যেই ঘটছে।

তিনি বলেন, স্দে তেইমান কেন্দ্রে এক বন্দিকে ধর্ষণের ভিডিও সামনে আসার পরও অভিযুক্ত সেনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।

তার ভাষায়, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা কার্যত যৌন সহিংসতার ব্যবহারে সবুজ সংকেত দিচ্ছেন, যখন তারা সবচেয়ে আলোচিত ও প্রমাণিত ঘটনাতেও বিচার করছেন না। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনকে গ্রহণযোগ্য করার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নেসেটে এমন আলোচনা হয়েছে যে, ফিলিস্তিনিকে ধর্ষণ করা ঠিক কি না। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও স্পষ্টভাবে বলেননি যে, আটক ব্যক্তিদের ধর্ষণের বিরোধিতা করে ইসরায়েল।

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলায় জড়িত বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইহুদ ওলমার্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ফিলিস্তিনিদের ‘ইহুদি সন্ত্রাসীদের’ হাত থেকে রক্ষার আহ্বান জানান।

এই প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহে অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন ফিলিস্তিনি কমিউনিটির ৮৩টি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এতে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও চলাচল সীমাবদ্ধতার মুখে থাকা মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন ঝুঁকিতে থাকা মানুষ, যারা ইতোমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, নারী, তরুণ কর্মী এবং কমিউনিটি নেতারা। তবে এই ফলাফল পুরো পশ্চিম তীরের পরিসংখ্যানগত প্রতিনিধিত্ব করে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) কোনো মন্তব্য করেনি।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

এসএএইচ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow