পানিবন্দি ২৫ গ্রামের মানুষ, খোয়াইয়ের পানিতে ভেসে গেল স্বপ্ন
ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে সদর ও বাহুবল উপজেলার অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে অসংখ্য বসতবাড়ি, ফসলি জমি, শাকসবজির ক্ষেত, মাছের ঘের, পোলট্রি খামার ও গ্রামীণ সড়ক। কয়েক শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৎস্যচাষিরা। কয়েক মাসের শ্রমে গড়ে তোলা আউশ ধান, সবজির ক্ষেত ও ফলের বাগান পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেখে কৃষকদের চোখে এখন শুধুই হতাশা। হবিগঞ্জ-মিরপুর আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে ডুবে যাওয়ায় সড়ক খানাখন্দে পরিণত হয়েছে৷ এতে করে যান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন মানুষ। হবিগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাকসুদুল আলম কালবেলাকে বলেন, কৃষি বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বন্যায় ৬৯৭ হেক্টর আউশ ধান, ১৩১ হেক্টর শাকসবজি এবং ২০ হেক্টর ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া মাছের ঘের থেকে মাছ ভেসে যাওয়ায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন
ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে সদর ও বাহুবল উপজেলার অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে অসংখ্য বসতবাড়ি, ফসলি জমি, শাকসবজির ক্ষেত, মাছের ঘের, পোলট্রি খামার ও গ্রামীণ সড়ক। কয়েক শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৎস্যচাষিরা।
কয়েক মাসের শ্রমে গড়ে তোলা আউশ ধান, সবজির ক্ষেত ও ফলের বাগান পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেখে কৃষকদের চোখে এখন শুধুই হতাশা। হবিগঞ্জ-মিরপুর আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে ডুবে যাওয়ায় সড়ক খানাখন্দে পরিণত হয়েছে৷ এতে করে যান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন মানুষ।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাকসুদুল আলম কালবেলাকে বলেন, কৃষি বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বন্যায় ৬৯৭ হেক্টর আউশ ধান, ১৩১ হেক্টর শাকসবজি এবং ২০ হেক্টর ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া মাছের ঘের থেকে মাছ ভেসে যাওয়ায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। হাঁস-মুরগি, পোলট্রি খামার এবং কয়েকটি ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
প্রাথমিক হিসাবে শুধু সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়ন, পৈল ইউনিয়নেই ২০ কোটি টাকার উপরে ক্ষতি হয়েছে৷ একই সঙ্গে পাশের বাহুবল উপজেলার তামাতাশি ও মিরপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের কৃষকদের আরও ২০ কোটি টাকার উপরে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে৷ জেলায় মোট প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে কৃষি অফিস সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে সদর উপজেলার পইল ও বাহুবল উপজেলার লামাতাসি ইউনিয়নেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র চালু এবং বানভাসি মানুষের জন্য শুকনো খাবারসহ ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি কিংবা তুলনামূলক নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন।
এদিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কিছু এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করলেও সেই পানি পইল ও বাহুবল উপজেলার লামাতাসি ও মিরপুর ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকায় ঢুকে পড়ছে। ফলে একদিকে কোথাও পানি কমলেও অন্যদিকে নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চল। এতে অনেক পরিবারের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি।
অপরদিকে খোয়াই নদীর হবিগঞ্জ ও শায়েস্তাগঞ্জ অংশে পানি কমে বিপৎসীমার নিচে নেমে গেলেও কুশিয়ারা ও কালনী-কুশিয়ারা এবং সুতাং নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে৷ ফলে রোববার থেকে বানিয়াচং, নবীগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ ও লাখাইয়ের হাওরে পানি বাড়তে শুরু করেছে৷ ফলে হাওর এলাকার লোকজন এখন আতঙ্কে রয়েছেন৷
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশল সায়েদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, বর্তমানে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার অন্যান্য নদ-নদীর পানিও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তবে নিম্নাঞ্চলে জমে থাকা পানি পুরোপুরি না নামা পর্যন্ত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে সময় লাগবে৷
তিনি আরও বলেন, রোববার দুপুর পর্যন্ত খোয়াই নদীর পানি কমে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে৷ আর কুশিয়ার নদীর বানিয়াচং উপজেলার মার্কুলী পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৪ সে.মি, কালনী-কুশিয়ারা নদীর আজমিরীগঞ্জে পয়েন্ট বিপৎসীমার ৭৩ সে.মি এবং সুতাং নদীর লাখাই উপজেলায় বিপৎসীমার ৬৭ সে.মি. উপরে রয়েছে৷ বৃষ্টিপাত কমে গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২১ মি.মি. বৃষ্টিপাতের রেকর্ড করা হয়েছে৷
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন কালবেলাকে বলেন, বন্যায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলা, বাহুবল ও বানিয়াচং উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ছয় হাজার ৪৪৫ পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন৷ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২৮ হাজার ১৪০ জন মানুষ৷ তিনটি উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের মাঝে এখন পর্যন্ত নগদ ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল ও ১৮২০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে৷ এছাড়া জেলা প্রশাসনের কাছে আরও মজুত রয়েছে ২০০ প্যাকেট শুকনা খাবার, ৭০ টন চাল ও নগদ তিন লাখ টাকা৷
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খোয়াই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ও নদী পারের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এতে প্রতিরক্ষা বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বাধটি ভেঙে যায়। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানান এলাকাবাসী৷
সদর উপজেলার চরহামুয়া গ্রামের মিন্টু মিয়া নামের বাসিন্দা বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে তারা ভয় পান। তাদের ভাষ্য, ক্যামেরার সামনে কথা বললে এলাকায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। তারা অনেক প্রভাবশালী। সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ ও চরহামুয়া এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালীর নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
এলাকাবাসী অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং খোয়াই নদীর ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিরক্ষা বাঁধ দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, স্থায়ী নদী শাসনের উদ্যোগ না নিলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই এ ধরনের বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ জি কে গউছ রোববার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও খোয়াই নদীর ভেঙে যাওয়া বাঁধটি পরিদর্শন করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন৷
তিনি বলেন, খোয়াই নদী থেকে বালু উত্তোলনের জন্য কোনো বৈধ ইজারা নেই। সরকারও এভাবে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ে আগ্রহী নয়। যারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে দলের (বিএনপি) কেউ জড়িত থাকলেও কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত থাকতে পারে না। কোনো বালুখেকো, দুর্বৃত্ত বা অবৈধ সুবিধাভোগী আমাদের বন্ধু হতে পারে না।
What's Your Reaction?