পুলিশ ক্যাডার হলেন ছেলে, ফল প্রকাশের ১৯ দিন আগে বাবার চিরবিদায়

কৃষক বাবার পকেটে হয়তো সবসময় অঢেল অর্থ ছিল না, কিন্তু সন্তানের প্রতি ছিল পাহাড়সম বিশ্বাস ও ভালোবাসা। বাবার সেই অটুট বিশ্বাসের শক্তিতে ভর করেই গড়ে উঠেছিল ছেলের বিসিএস জয়ের দীর্ঘ লড়াই। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত ও বহু প্রতীক্ষিত সাফল্য ধরা দিল ঠিকই, কিন্তু তা দেখে যেতে পারলেন না জন্মদাতা পিতা। ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন অদম্য তরুণ শিহাব খান। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের মাত্র ১৯ দিন আগে গত ২ জুন নিঃশব্দে চিরবিদায় নেন তার প্রিয় বাবা। শিহাব খান ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪তম ব্যাচের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী শিহাব খানের বাড়ি রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার যশাই ইউনিয়নের চরলক্ষীপুর (হরিরামপুর) গ্রামে। তার বাবা আব্দুস শুকুর পেশায় একজন কৃষক এবং মা শিখা বেগম একজন গৃহিণী। শিহাব খান উদয়পুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এসএসসি, পাংশা সরকারি কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি এবং ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন।  শিহাব খানের বিসিএস যাত্রায় কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে করতে হয়েছে দীর্ঘ

পুলিশ ক্যাডার হলেন ছেলে, ফল প্রকাশের ১৯ দিন আগে বাবার চিরবিদায়

কৃষক বাবার পকেটে হয়তো সবসময় অঢেল অর্থ ছিল না, কিন্তু সন্তানের প্রতি ছিল পাহাড়সম বিশ্বাস ও ভালোবাসা। বাবার সেই অটুট বিশ্বাসের শক্তিতে ভর করেই গড়ে উঠেছিল ছেলের বিসিএস জয়ের দীর্ঘ লড়াই। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত ও বহু প্রতীক্ষিত সাফল্য ধরা দিল ঠিকই, কিন্তু তা দেখে যেতে পারলেন না জন্মদাতা পিতা। ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন অদম্য তরুণ শিহাব খান। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের মাত্র ১৯ দিন আগে গত ২ জুন নিঃশব্দে চিরবিদায় নেন তার প্রিয় বাবা।

শিহাব খান ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪তম ব্যাচের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী শিহাব খানের বাড়ি রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার যশাই ইউনিয়নের চরলক্ষীপুর (হরিরামপুর) গ্রামে। তার বাবা আব্দুস শুকুর পেশায় একজন কৃষক এবং মা শিখা বেগম একজন গৃহিণী। শিহাব খান উদয়পুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এসএসসি, পাংশা সরকারি কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি এবং ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। 

শিহাব খানের বিসিএস যাত্রায় কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে করতে হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম। ৪১তম বিসিএসে তিনি নন-ক্যাডার (৯ম গ্রেড) হিসেবে প্রকৌশল কলেজে রসায়নের প্রভাষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এরপর ৪৩তম ও ৪৫তম বিসিএসে ভাইভা দিয়েও ক্যাডার হতে ব্যর্থ হন তিনি। ৪৪তম বিসিএসে তিনি কারিগরি শিক্ষা ক্যাডার (রসায়ন), ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে এবং ৪৬তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার (রসায়ন) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে এসে তার বহু কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণ হয়- তিনি পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

তবে এই সাফল্যের আনন্দের মাঝেই জড়িয়ে আছে গভীর এক বেদনা। তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা, বাবা আব্দুস শুকুর প্রামানিক, ফল প্রকাশের মাত্র ১৯ দিন আগে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে জীবনের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অর্জনের সাক্ষী হয়ে যেতে পারেননি তিনি, যিনি ছিলেন তার স্বপ্নপূরণের প্রধান ভরসা ও প্রেরণা।

শিহাব খান কালবেলাকে বলেন, আমি তো এমন কোনো সফলতা চাইনি, যে অর্জনের দিকে তাকিয়ে বাবার চোখ দুটো আর কখনো হাসবে না। বাবার হাতে একসময় অঢেল টাকা ছিল না। সংসারের ন্যূনতম খরচ চালাতেও কষ্ট হতো। কিন্তু শিহাবের প্রতি তার বিশ্বাস ছিল অটুট। প্রতিটি বিসিএসের পর তিনি বলতেন, আরেকবার চেষ্টা কর, তুমি পারবে। সেই বিশ্বাসই ছিল শিহাবের সবচেয়ে বড় শক্তি।

বাবার মৃত্যুর স্মৃতিচারণ করে শিহাব বলেন, ৭ম বার বিসিএস ভাইভা দেওয়ার পর কাঙ্ক্ষিত রেজিস্ট্রেশন নম্বরটি খুঁজে পেলাম। অথচ ফল প্রকাশের মাত্র ১৯ দিন আগে বাবা এমন এক ঠিকানায় চলে গেলেন, যেখান থেকে কোনো ফলাফল আর পৌঁছায় না। আজও মনে হয়, তিনি যদি আর কয়েকটা দিন বেঁচে থাকতেন।

পুলিশ ক্যাডারে যোগদানের বিষয়ে তিনি বলেন, পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করলে আমার প্রধান লক্ষ্য হবে আইনকে নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করে জনগণের আস্থা অর্জন করা। একজন সৎ, পেশাদার ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চাই। অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনগণের জন্য কার্যকর সেবা প্রদান করাই আমার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। পাশাপাশি নেতৃত্বের গুণাবলি ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের একজন দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই এবং প্রান্তিক মানুষের কাছে দ্রুত সেবা পৌঁছে দিয়ে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ও শান্তিময় রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে আমি কাজ করতে চাই।

শিক্ষার্থীরা কীভাবে বিসিএসের ভালো প্রস্তুতি নিতে পারে– এ বিষয়ে শিহাব খান বলেন, বিসিএস এক অদ্ভুত প্রেম চক্র। যেখানে অর্জনের চেয়ে হারানোর ভয় বেশি, প্রতিনিয়ত কণ্টকাকীর্ণ পারিপার্শ্বিক পরিবেশ আপনাকে দংশন করে চলবে, তবুও আপনাকে বারবার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। প্রতিটা ধাপের ব্যর্থতা আপনাকে সর্বগ্রাস করে অসুস্থ ময়দানে ছেড়ে দিবে, আবার একটু সফলতা আপনাকে নতুন করে নেশা জাগাবে, নতুন করে বাঁচতে শেখাবে।

তিনি বলেন, এক একটি ধাপের সফলতা আপনার কাছে মুগ্ধ করার মতো। এক স্নিগ্ধ সকাল অথচ ব্যর্থ মানুষগুলোর গল্প কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। ব্যর্থতায় আপনার জীবন থেকে মূল্যবান একটি বছর হারিয়ে যাবে, আপনি অন্যদের থেকে এক কদম পিছিয়ে যাবেন। তবুও সংগ্রামী মানুষগুলো আবার উঠে দাঁড়াবে। প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ় বিশ্বাস, অসীম ধৈর্য ও ভাগ্যের সম্বলিত ফলাফল হলো বিসিএস। এতো কিছুর সমন্বয়হীনতার অভাবে অদম্য মেধাবীরাও এক সময় অন্য কূলে নোঙর ভেড়ান। 

শিহাব খান বলেন, কেউ পেয়ে যায় অল্প সাধনায়, আর কেউ অনেক সাধনা করে থাকে অপূর্ণ। জীবনের এই বৈপরীত্যময় সমীকরণই আমাদের প্রাপ্তির প্রকৃত ব্যাকরণ ভেঙে দেয়। এখানে শ্রম সর্বদা ফলের সমান্তরাল নয়, আর প্রাপ্তিও নিছক ভাগ্যের অর্পণমাত্র নয়।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow