প্রতিদিনের ছোট অভ্যাস যেভাবে বদলে দিয়েছে জীবন

এমকে হক, জার্মানি জার্মানিতে আসার পর আমার প্রতিটা দিন কাটত এক তীব্র ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে। সকালে উঠেই অফিসের তাড়াহুড়ো, সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি, সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরা, রান্না ও ঘরের কাজ সামলে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটু স্ক্রোলিং-তারপর ঘুম। প্রতিদিন রাতে মনে হতো, আমি তো প্রচুর পরিশ্রম করছি! এত ব্যস্ত যে নিজের জন্য আলাদা করে একমুহূর্ত সময় কাটানোর সুযোগও নেই। দেখতে দেখতে প্রায় এক বছর এভাবে কেটে গেলো। কিন্তু একদিন হঠাৎ নিজেকে থামিয়ে একটা প্রশ্ন করলাম- আমি কি সত্যি জীবনপথে একধাপ এগিয়েছি, নাকি প্রতিদিন শুধু একই বৃত্তে ঘুরে চলেছি? আরও পড়ুন বাবার নীরব যুদ্ধ: প্রবাসে এসে মেলানো এক জীবনের হিসাব প্রশ্নটা মাথায় আসার পর গত এক বছরের দিনগুলোর হিসাব মেলাতে বসলাম। বুঝতে পারলাম, ব্যস্ত আমি ঠিকই ছিলাম, কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য কার্যকর কিছুই করা হয়নি। আমরা প্রায়ই ‘কঠোর পরিশ্রম করা’ আর ‘প্রকৃত অগ্রগতি অর্জন করা’- এই দুটিকে এক করে ফেলি। অথচ দুটির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। এর কিছুদিন পর অফিসের এক সহকর্মীর কথায় আমার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে যায়। সে কথার প্রসঙ্গে বলল, ‘প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে

প্রতিদিনের ছোট অভ্যাস যেভাবে বদলে দিয়েছে জীবন

এমকে হক, জার্মানি

জার্মানিতে আসার পর আমার প্রতিটা দিন কাটত এক তীব্র ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে। সকালে উঠেই অফিসের তাড়াহুড়ো, সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি, সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরা, রান্না ও ঘরের কাজ সামলে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটু স্ক্রোলিং-তারপর ঘুম।

প্রতিদিন রাতে মনে হতো, আমি তো প্রচুর পরিশ্রম করছি! এত ব্যস্ত যে নিজের জন্য আলাদা করে একমুহূর্ত সময় কাটানোর সুযোগও নেই।

দেখতে দেখতে প্রায় এক বছর এভাবে কেটে গেলো। কিন্তু একদিন হঠাৎ নিজেকে থামিয়ে একটা প্রশ্ন করলাম- আমি কি সত্যি জীবনপথে একধাপ এগিয়েছি, নাকি প্রতিদিন শুধু একই বৃত্তে ঘুরে চলেছি?

প্রশ্নটা মাথায় আসার পর গত এক বছরের দিনগুলোর হিসাব মেলাতে বসলাম। বুঝতে পারলাম, ব্যস্ত আমি ঠিকই ছিলাম, কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য কার্যকর কিছুই করা হয়নি। আমরা প্রায়ই ‘কঠোর পরিশ্রম করা’ আর ‘প্রকৃত অগ্রগতি অর্জন করা’- এই দুটিকে এক করে ফেলি। অথচ দুটির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত।

এর কিছুদিন পর অফিসের এক সহকর্মীর কথায় আমার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে যায়। সে কথার প্রসঙ্গে বলল, ‘প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে আমি নিজেকে একটা নির্দিষ্ট প্রশ্ন করি-আজ আমি এমন কী শিখলাম, যেটা গতকাল পর্যন্ত জানতাম না?’

কথাটা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কারণ আমার কাছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না।

সেদিন বাসায় ফিরে একটি ছোট্ট নোটবুক বের করলাম। প্রতিজ্ঞা করলাম- প্রতিদিন অন্তত একটি নতুন জিনিস এই খাতায় লিখব। সেটা বিশাল কিছু হতে হবে না; একটি নতুন জার্মান শব্দ, প্রোগ্রামিংয়ের নতুন কোনো কনসেপ্ট, বইয়ের একটি গভীর লাইন, কিংবা নিজের কোনো ভুল থেকে শেখা ছোট্ট শিক্ষা।

শুরুর দিকে কাজটা বেশ কঠিন লাগছিল। অনেকদিনই মনে হতো, আজ তো নতুন কিছু শেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু নিয়মের খাতিরে জোর করে হলেও একটি বিষয় খুঁজে বের করতাম। ধীরে ধীরে এই জোর করে চেষ্টা করাটাই আমার অভ্যাসে পরিণত হলো।

ছয় মাস পর যখন সেই নোটবুকের পৃষ্ঠাগুলো উল্টে দেখছিলাম, আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম! সেই ছোট ছোট শেখাগুলো একত্রিত হয়ে আমার ভেতরে এক প্রকাণ্ড পরিবর্তন এনে দিয়েছে। আমি আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কমে গেছে এবং কাজের ক্ষেত্রে যে কোনো নতুন বিষয় আগের চেয়ে দ্রুত আয়ত্ত করতে পারছি।

সেদিন আমার কাছে একটা সত্য খুব পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল- শুধু অন্ধের মতো পরিশ্রম করলেই সফল হওয়া যায় না। পরিশ্রমের সঙ্গে যদি প্রতিনিয়ত শেখার প্রক্রিয়া যুক্ত না থাকে, তবে মানুষ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে কেবল ক্লান্তই হতে থাকে।

আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভীষণ ব্যস্ত, অথচ পাঁচ বছর পরও তাদের জীবন ঠিক আগের জায়গায় আটকে আছে। আবার কিছু মানুষ দিনে হয়তো মাত্র আধা ঘণ্টা সময় দেন নিজের দক্ষতা বাড়াতে, কিন্তু কয়েক বছর পর দেখা যায় তাদের জীবনের গতিপথ পুরোপুরি বদলে গেছে। সময়ের দৈর্ঘ্য সবার জন্যই ২৪ ঘণ্টা; পার্থক্য শুধু এটাই যে, সফল মানুষেরা এই সময়ের একটা অংশ নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করেন।

আজ যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘জার্মানিতে এসে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কোনটা?’ আমি বলব—প্রতিদিন ঘুমানোর আগে নিজেকে ওই একটি প্রশ্ন করা: ‘আজ আমি নতুন কী শিখলাম?’

পৃথিবীতে সবচেয়ে লাভজনক ও নিরাপদ বিনিয়োগ শেয়ারবাজারে নয়, ব্যাংকে নয়, কিংবা কোনো ব্যবসায়ও নয়। সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলো নিজের দক্ষতার ওপর বিনিয়োগ। জীবনের কোনো এক মোড়ে আপনি হয়তো টাকা হারাবেন, চাকরি বদলাবে, কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবে- কিন্তু আপনার ভেতরে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কেউ কোনোদিন কেড়ে নিতে পারবে না।

তাই আজকের এই ব্যস্ত জীবনে আপনাকে একটা ছোট্ট চ্যালেঞ্জ দিতে চাই। আজ রাতে ঘুমানোর আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে শুধু এই প্রশ্নটা করুন:

‘আজ আমি নতুন কী শিখলাম?’

যদি আজ উত্তর না থাকে, তবে কাল যেন অবশ্যই একটা উত্তর থাকে। বিশ্বাস করুন, প্রতিদিনের এই সামান্য চর্চাটি মাত্র এক বছর পর আপনাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে দাঁড় করাবে, যা দেখে আপনি নিজেই অবাক হয়ে যাবেন।

এমআরএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow