প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবে রূপান্তরের অপেক্ষা

২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি ও ঘোষণা দেন। নগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় তিনি এই ঘোষণা দেন। তবে, সত্যিকার অর্থে এ ঘোষণা কার্যকরে পরবর্তী সরকারগুলো আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে একরকম কাগজে-কলমেই থমকে যায় বাণিজ্যিক রাজধানীর কার্যক্রম। এর প্রায় ২৩ বছর পর চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি একই মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান চট্টগ্রামকে ‘সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী’ গড়ে তোলার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তাই সরকার গঠন করতে যাওয়া বিএনপি প্রধানের এ ঘোষণা কতটা বাস্তবায়ন হবে, আর বাস্তবায়নের জন্য কী কী উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন তা নিয়ে আলোচনা চলছে চট্টগ্রামের সর্বত্র। বরাবরের মতোই চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক হাব; বন্দর, শিল্প, বাণিজ্য- সবকিছু এখানে সংরক্ষিত। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কার্যকর কৌশল, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন প্রয়োজন- বলে মনে করছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আর বিশ্লেষকরা। বাণিজ্যিক রাজধানীর প্রতিশ্রুতির ব্যাকগ্রাউন্ড চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। চট্টগ্র

প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবে রূপান্তরের অপেক্ষা

২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি ও ঘোষণা দেন। নগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় তিনি এই ঘোষণা দেন। তবে, সত্যিকার অর্থে এ ঘোষণা কার্যকরে পরবর্তী সরকারগুলো আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ফলে একরকম কাগজে-কলমেই থমকে যায় বাণিজ্যিক রাজধানীর কার্যক্রম। এর প্রায় ২৩ বছর পর চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি একই মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান চট্টগ্রামকে ‘সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী’ গড়ে তোলার ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেন।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তাই সরকার গঠন করতে যাওয়া বিএনপি প্রধানের এ ঘোষণা কতটা বাস্তবায়ন হবে, আর বাস্তবায়নের জন্য কী কী উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন তা নিয়ে আলোচনা চলছে চট্টগ্রামের সর্বত্র। বরাবরের মতোই চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক হাব; বন্দর, শিল্প, বাণিজ্য- সবকিছু এখানে সংরক্ষিত। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কার্যকর কৌশল, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন প্রয়োজন- বলে মনে করছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী আর বিশ্লেষকরা।

বাণিজ্যিক রাজধানীর প্রতিশ্রুতির ব্যাকগ্রাউন্ড

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বিপুল পরিমাণ আমদানি ও রপ্তানি সামলায়; রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রেকর্ড ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করেছে, যা এর আগের বছরের (২০২৪ সালে ৫ হাজার ৭৬ কোটি টাকা) তুলনায় ৩৮৪ কোটি টাকা বেশি।

এটি গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং বন্দরটির ১৩৮ বছরের ইতিহাসে অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স। চট্টগ্রাম বন্দরের এ ধারাবাহিকতা নিয়মিত। দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে প্রতিদিন প্রায় শতকোটি টাকার লেনদেন হয়। আমদানিনির্ভর নিত্যপণ্যের ৫০-৬০ শতাংশ খাতুনগঞ্জ থেকে সরবরাহ হয়। শুধু বন্দর কিংবা খাতুনগঞ্জ নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশের অন্যান্য জেলাগুলোর চেয়ে এগিয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ও প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র, যা প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পায়ন ও আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। দেশের ৯০% আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এই বন্দর দিয়ে হয়, যা জাতীয় রাজস্ব আয়ে ৬০ শতাংশ এবং প্রবাস আয়ে বড় অবদান রাখে। অর্থনৈতিক দিক থেকে চট্টগ্রাম এগিয়ে থাকার মূল কারণসমূহ হচ্ছে, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর।

যা দেশের প্রধান বাণিজ্যিক লাইফলাইন, বাণিজ্যের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে এ বন্দর। শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ: ভারী শিল্প, শিপিং, এবং তৈরি পোশাক শিল্পের বিশাল হাব, যা কর্মসংস্থান তৈরি করছে। আর্থিক হাব: চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, বহুজাতিক কোম্পানি এবং প্রধান ব্যাংকিং কার্যক্রমের কেন্দ্র। অবকাঠামোগত সুবিধা: ইপিজেড, কর্ণফুলী টানেল, এশিয়ান হাইওয়ে, এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। বৈদেশিক আয়: প্রবাসী আয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় জেলাগুলোর অন্যতম।

১০০ দফা অ্যাকশন প্ল্যান থাকা জরুরি

এই পরিবেশে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ গড়ার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের দ্বিতীয় মহানগরীকে নতুন কৌশলে এগিয়ে নিতে পারে। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সরকার যেন উদ্যোগ নেন এমনটাই প্রত্যাশা করছেন এখানকার নাগরিকরা। তেমনই একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সাইফুল বারী। তিনি চীন থেকে বিভিন্ন পণ্য এনে অনলাইন এবং অফলাইনে বিক্রি করেন। পাশাপাশি নবীন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‘বাণিজ্যিক রাজধানীর ধারণা অত্যন্ত শক্তিশালী। এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে, শুধু চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী কিংবা উদ্যোক্তরাই নন, সারাদেশের ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন। ব্যাংকগুলোতে আর্থিক লেনদেন বাড়বে। ক্ষুদ্রঋণের পরিমাণ বাড়বে। এটা একদিকে যেমন দারিদ্রতা হ্রাস করবে অন্যদিকে তেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

নারী উদ্যোক্তা সায়মা আলম বলছেন, প্রতিশ্রুতি শুধু ঘোষণা নয়- পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্যাকেজ থাকা চাই। সফল বাস্তবায়নের জন্য ন্যূনতম একটি ১০০ দফা অ্যাকশন প্ল্যান থাকা জরুরি- যেখানে সময়সীমা, দফতরভিত্তিক কাজের দায়িত্ব এবং বাজেট নিশ্চিত হবে।

বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সহকারী অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ কালবেলাকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এ-বিষয়ে পূর্বে নেওয়া প্রকল্প/ ব্যবস্থার পুনর্নিরীক্ষণ করার লক্ষ্যে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পরবর্তী করণীয় কী কী সেটা ঠিক করে নিতে হবে। তারপর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ-কাজগুলো ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম তিন মাসের মধ্যে করা জরুরি।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এই দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাণিজ্যিক রাজধানীর পূর্ণ মর্যাদা দিতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিতীয় প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে স্থাপন করতে হবে। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী উইংগুলো স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা এখন সময়ের দাবি। এর পাশাপাশি অবকাঠামোগত আমূল পরিবর্তন আবশ্যক। চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরকে শুধু নামেই নয়, বরং বাস্তবেও একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে রূপান্তর করতে হবে।

পর্যাপ্ত কার্গো ভিলেজ স্থাপন এবং বিশ্বের প্রধান বাণিজ্যিক শহরগুলোর সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট চালু করা এখন অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ককে কমপক্ষে ৮ লেনে উন্নীত করা এবং চট্টগ্রামে একটি আধুনিক রেল নেটওয়ার্ক ও সার্কুলার রোড নির্মাণ করা ছাড়া বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব।

চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা এখন আর মৌসুমি দুর্যোগ নয়, এটি একটি স্থায়ী নগর–সংকট। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের প্রধান সড়ক, বাসাবাড়ি ও দোকানপাট ডুবে যায়। খাল দখল, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, পাহাড় কাটা ও অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ- সব মিলিয়ে জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও স্বাভাবিক জীবনকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান জরুরি। কারণ, একটি বন্দরনগরী যদি বর্ষায় অচল হয়ে পড়ে, তার প্রভাব পড়ে পুরো দেশের সরবরাহব্যবস্থায়।

অধ্যাপক আলমগীর মোহাম্মদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে দেশী-বিদেশি চক্রান্তের যে বিষয়টা সর্বমহলে আলোচিত সেটা জরুরি টেইক আপ করা উচিত। বন্দর বিষয়ক সংসদীয় কমিটি ও চট্টগ্রামের নাগরিক কমিটি, স্থানীয় এমপি ও মেয়রকে একীভূত করে একটি ওপেন ডিসকাশন জরুরি। তারপর বন্দরের কাজের একটা কার্যপ্রণালি ও কর্মপরিকল্পনা ওয়েবসাইটে তুলে ধরে এ বিষয়ে সৃষ্ট ধোঁয়াশা দূর করা উচিত। 

তিনি আরও বলেন, জলাবদ্ধতা নিয়ে প্রথম কাজ হবে আগে থেকে চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া। তারপর একটি বর্ষা অবজারভেশনে রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান চট্টগ্রামে প্রথম সফরে আশা করি ঘোষণা দেবেন। চট্টগ্রামবাসীর চাওয়া-পাওয়া পূরণ কতটুকু হবে সেটা অবশ্যই নির্ভর করছে আগামীতে মন্ত্রিসভায় এই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব কতটুকু সেটা দেখা। 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow