প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর: কী পেল বাংলাদেশ?

কূটনীতির সাফল্য কখনো বিমানবন্দরের লালগালিচা, যৌথ ছবি কিংবা যৌথ ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি রাষ্ট্রীয় সফরের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় কয়েক বছর পরে—যখন বোঝা যায়, সেই সফর দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, বিনিয়োগ কিংবা ভূরাজনৈতিক অবস্থান কতটা এগিয়ে নিতে পেরেছে। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেবল একটি প্রটোকলভিত্তিক বিদেশ সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল নতুন সরকারের প্রথম বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। সংসদে সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, এই সফরে যদি কোনো অর্জন হয়ে থাকে, সেটি কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, বাংলাদেশের অর্জন। তাঁর উচ্চারিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ স্লোগানটিও সেই দর্শনেরই প্রতিফলন। প্রশ্ন হলো, বাস্তবে বাংলাদেশ কী পেল? আর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণের পথ কতটা সুগম? বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী ক

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর: কী পেল বাংলাদেশ?

কূটনীতির সাফল্য কখনো বিমানবন্দরের লালগালিচা, যৌথ ছবি কিংবা যৌথ ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি রাষ্ট্রীয় সফরের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় কয়েক বছর পরে—যখন বোঝা যায়, সেই সফর দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, বিনিয়োগ কিংবা ভূরাজনৈতিক অবস্থান কতটা এগিয়ে নিতে পেরেছে। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে কেবল একটি প্রটোকলভিত্তিক বিদেশ সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল নতুন সরকারের প্রথম বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

সংসদে সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, এই সফরে যদি কোনো অর্জন হয়ে থাকে, সেটি কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, বাংলাদেশের অর্জন। তাঁর উচ্চারিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ স্লোগানটিও সেই দর্শনেরই প্রতিফলন। প্রশ্ন হলো, বাস্তবে বাংলাদেশ কী পেল? আর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা পূরণের পথ কতটা সুগম?

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা—সবই এখন জাতীয় অগ্রাধিকার। এমন বাস্তবতায় মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মূল লক্ষ্যও ছিল অর্থনৈতিক কূটনীতিকে আরও কার্যকর করা।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দেশটিতে কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু অসংখ্য পরিবারের জীবনযাত্রাই বদলে দেয় না, জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু গত কয়েক বছরে শ্রমবাজারে নানা জটিলতা, নিয়োগে অনিয়ম, মানব পাচারের অভিযোগ এবং কর্মীদের শোষণের কারণে নতুন কর্মী নিয়োগে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা, অবৈধ কর্মীদের বৈধতার সুযোগ এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। দুই দেশ যৌথভাবে শ্রমিক নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নতুন সমঝোতা স্মারক প্রস্তুত এবং যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ সক্রিয় করার বিষয়ে একমত হয়েছে। পাশাপাশি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে আলোচনাও এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

যদি এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ পায়, তাহলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার নতুন গতি পাবে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা সতর্ক করে দেয়—শুধু বাজার খুললেই হবে না, দালালচক্র, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং শ্রমিক শোষণের অবসান ঘটাতে হবে। না হলে অর্জনের বড় অংশই মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে চলে যাবে।

কোনো একটি শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের কূটনীতির অন্যতম ভিত্তিও ছিল এই ভারসাম্য। প্রধানমন্ত্রীর ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ দর্শন যদি বাস্তবে কার্যকর করতে হয়, তাহলে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ। কে কোন পরাশক্তি—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মানুষ কী পেল।

চীন সফরের গুরুত্ব আরও বিস্তৃত। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, সেতু, বন্দর, শিল্পাঞ্চল—বহু খাতে চীনের বিনিয়োগ রয়েছে। এবারের সফরে দুই দেশের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক ও বিভিন্ন সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, সবুজ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ চীনের কাছে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর দাবি তুলেছে। বর্তমানে চীন থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে খুবই কম। প্রধানমন্ত্রী চীনের বাজারে বাংলাদেশি ফল, চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্যের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন। যদি এক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি হয়, তাহলে রপ্তানির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিনিয়োগ। শুধু ঋণ নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের যুগ দ্রুত বদলাচ্ছে। এখন প্রয়োজন উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান। চীনা কোম্পানিগুলো যদি বাংলাদেশে শিল্প স্থাপন করে, তাহলে রপ্তানি বাড়বে, দক্ষতা বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কতার জায়গা। বিদেশি বিনিয়োগ আর বিদেশি ঋণ এক বিষয় নয়। উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ নেওয়া সহজ; কিন্তু ঋণের যথাযথ ব্যবহার, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করা কঠিন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহু দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, পরিকল্পনাহীন ঋণ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা অবশ্যই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, ঋণ টেকসইতা এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভজনকতা বিবেচনায় এগোতে হবে।

এই সফরের আরেকটি তাৎপর্য ভূরাজনৈতিক। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান—সবাই এ অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এ প্রতিযোগিতায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। কোনো একটি শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং জাতীয় স্বার্থ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের কূটনীতির অন্যতম ভিত্তিও ছিল এই ভারসাম্য।

প্রধানমন্ত্রীর ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ দর্শন যদি বাস্তবে কার্যকর করতে হয়, তাহলে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ। কে কোন পরাশক্তি—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের মানুষ কী পেল।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাষ্ট্রীয় সফরের সাফল্য কেবল চুক্তির সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। অতীতে বাংলাদেশ অসংখ্য সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, যার অনেকগুলোই বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ফলে এবারও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তবায়ন।

প্রতিটি সমঝোতার জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। বেসরকারি খাত, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় সফরের ইতিবাচক সংবাদ কয়েক দিনের মধ্যেই সংবাদপত্রের পুরোনো পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। মালয়েশিয়া ও চীন—দুই দেশই প্রযুক্তি, উৎপাদন এবং শিল্পায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। যৌথ কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

আজকের বিশ্বে কূটনীতি আর কেবল রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, উদ্ভাবন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেরও প্রধান হাতিয়ার। যে রাষ্ট্র কূটনীতিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যায়।

মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই সম্ভাবনার একটি নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু দরজা খুলে গেলেই গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া যায় না। প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং জাতীয় ঐকমত্য।

প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, অর্জন যদি হয়ে থাকে, তা বাংলাদেশের মানুষের। এই বক্তব্যের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তখনই, যখন নতুন বিনিয়োগ কারখানায় রূপ নেবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, রপ্তানি বাড়বে, শ্রমিকেরা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ পাবেন এবং সাধারণ মানুষ উন্নয়নের বাস্তব সুফল অনুভব করবেন।

রাষ্ট্রীয় সফরের প্রকৃত সাফল্য কূটনৈতিক ভাষণের করতালিতে নয়, মানুষের জীবনমানের উন্নতিতে। যদি এই সফর বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে, বৈদেশিক সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করে এবং জাতীয় স্বার্থকে আরও সুসংহত করে, তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি সফল সফর হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। আর যদি চুক্তিগুলো বাস্তবায়নের আগেই কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এই সফরও অতীতের বহু সম্ভাবনাময় সফরের মতোই স্মৃতির পাতায় হারিয়ে যাবে। এখন দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; রাষ্ট্রযন্ত্র, বেসরকারি খাত এবং পুরো জাতির—যেন এই কূটনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তব অর্থনৈতিক অর্জনে রূপ দেওয়া যায়। সেটিই হবে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ ফার্স্ট’ দর্শনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

লেখক:  সাংবাদিক, কলামিস্টডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow