প্রেমের সম্পর্ক-অন্তরঙ্গ ভিডিও ফাঁসের আশঙ্কাই ছিল মোটিভ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা জোবায়েদ হোসাইন হত্যা মামলার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তে বলা হয়েছে, এটি তাৎক্ষণিক কোনো হামলা ছিল না; বরং প্রায় এক মাস ধরে পরিকল্পনা, নজরদারি, ঘটনাস্থল রেকি এবং সুযোগের অপেক্ষার পর হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়। এছাড়া জোবায়েদ, ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা এবং বর্ষার প্রেমিক মাহির রহমানকে ঘিরে প্রেমের সম্পর্কের জটিলতা ও অন্তরঙ্গ ছবি-ভিডিও ফাঁসের আশঙ্কাই হত্যার মূল কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত শেষে গত ৩০ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন বংশাল থানার এসআই ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. আশরাফ হোসেন। অভিযোগপত্রে ৫০ জন সাক্ষীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফরেনসিক, ডিএনএ এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে মাহির রহমান (১৯), বার্জিস শাবনাম বর্ষা (১৯) এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লানকে (২১) অভিযুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে মাহিরকে মূল হামলাকারী, বর্ষাকে হত্যার পরিকল্পনাকারী এবং আয়লানকে সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছরের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলার

প্রেমের সম্পর্ক-অন্তরঙ্গ ভিডিও ফাঁসের আশঙ্কাই ছিল মোটিভ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা জোবায়েদ হোসাইন হত্যা মামলার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্তে বলা হয়েছে, এটি তাৎক্ষণিক কোনো হামলা ছিল না; বরং প্রায় এক মাস ধরে পরিকল্পনা, নজরদারি, ঘটনাস্থল রেকি এবং সুযোগের অপেক্ষার পর হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়। এছাড়া জোবায়েদ, ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা এবং বর্ষার প্রেমিক মাহির রহমানকে ঘিরে প্রেমের সম্পর্কের জটিলতা ও অন্তরঙ্গ ছবি-ভিডিও ফাঁসের আশঙ্কাই হত্যার মূল কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত শেষে গত ৩০ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন বংশাল থানার এসআই ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. আশরাফ হোসেন। অভিযোগপত্রে ৫০ জন সাক্ষীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফরেনসিক, ডিএনএ এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে মাহির রহমান (১৯), বার্জিস শাবনাম বর্ষা (১৯) এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লানকে (২১) অভিযুক্ত করা হয়েছে। তদন্তে মাহিরকে মূল হামলাকারী, বর্ষাকে হত্যার পরিকল্পনাকারী এবং আয়লানকে সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছরের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলার ১৫ নম্বর নুরবক্স লেনের রৌশান ভিলা ভবনে ছাত্রী বর্ষাকে পড়াতে গিয়ে খুন হন জোবায়েদ। সেদিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ভবনের নিচতলায় তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি কোনোভাবে তিনতলার সিঁড়ি পর্যন্ত উঠলেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান।

পরদিন নিহতের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন।

প্রেমের সম্পর্ক থেকেই হত্যার পরিকল্পনা

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বর্ষা ও মাহিরের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। মাহির বোরহানউদ্দিন কলেজের এবং বর্ষা ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি বাড়িতে বেড়ে ওঠায় ছোটবেলা থেকেই তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে সেই সম্পর্কে বিচ্ছেদ হলে গৃহশিক্ষক জোবায়েদের সঙ্গে বর্ষার প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়।

তদন্তে উঠে এসেছে, জোবায়েদ ও বর্ষার মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্কও গড়ে ওঠে। মোবাইল ফরেনসিক বিশ্লেষণে এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরবর্তী সময়ে মাহিরের সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক পুনরায় শুরু হলে জোবায়েদের কাছে থাকা অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও ফাঁস হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, এরপরই জোবায়েদকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন বর্ষা ও মাহির।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে তারা জোবায়েদকে হত্যার পরিকল্পনা শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন।

রেকি, ছুরি কেনা, তারপর হামলা

তদন্তে বলা হয়েছে, হত্যার আট থেকে নয় দিন আগে মাহির ও তার বন্ধু আয়লান ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন। পরে তারা দুটি সুইচ গিয়ার ছুরি কেনেন এবং কয়েক দিন ধরে সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, বর্ষা নিয়মিত জোবায়েদের টিউশনে আসা-যাওয়ার তথ্য মাহিরকে জানাতেন। ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে জোবায়েদ নিজের লাইভ লোকেশন বর্ষার কাছে পাঠান। সেই লোকেশন পাওয়ার পর ওত পেতে থাকা মাহির ও আয়লান হামলা চালান।

তদন্তে বলা হয়েছে, প্রায় ১০ ইঞ্চি লম্বা ধারালো সুইচ গিয়ার ছুরি দিয়ে জোবায়েদের ঘাড়ে আঘাত করা হয়। এতে তার গলার ডান পাশের ক্যারোটিড আর্টারি ও ইন্টারনাল জুগুলার ভেইন ছিন্ন হয়ে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়।

উদ্ধার হওয়া ছুরির ফরেনসিক পরীক্ষায় মাহিরের ডিএনএ পাওয়া গেছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাহির বলেছেন, ‘বর্ষা আমাকে প্রতিদিন চাপ দিত’

অভিযোগপত্রে মাহিরের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে মাহির বলেছেন, বর্ষা তাকে জোবায়েদকে হত্যা করার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ দিতেন।

জবানবন্দিতে মাহির বলেন, মারার পর ধরা পড়লে সামাল দিব কেমনে; এই প্রশ্ন করলে বর্ষা বলে, ওদের বাসায় অনেক অ্যাডভোকেট আছে। কোথায় মারা যায় জানতে চাইলে বর্ষা বলে, বর্ষার বাসার নিচে সুনশান নীরবতা, ওখানে মারলে সুবিধা হইব। বর্ষা আমাকে ডেইলি চাপ দিত মারার জন্য। ঘটনার দিন ১৯ অক্টোবর বেলা ১টার দিকে বর্ষা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, কখন মারবা?

ঘটনার দিন জোবায়েদ বাসার কাছে আসলে বর্ষার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক এ প্রশ্ন নিয়ে একপর্যায়ে তর্কাতর্কি হয়। এরপর ব্যাগ থেকে ছুরি বের করে তিনি আঘাত করেন। মাহির বলেন, আমি আয়নালকে বলি, ছুরি লইয়া আয়, পরে আয়নাল আর যায় নাই।

জোবায়েদের বাঁচার আকুতিতে বর্ষার অসম্মতি: ‘তোর শাস্তি হওয়া উচিত’

ওই বিল্ডিংয়ের নিচে হামলার পর গুরুতর আহত জোবায়েদ কোনোভাবে সিঁড়ি বেয়ে উপরে তিনতলায় উঠে বর্ষাকে দেখতে পান। এ সময় বর্ষার সামনে গিয়ে বাঁচানোর আকুতি জানান জোবায়েদ। তখন বর্ষা তাকে ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তোর শাস্তি হওয়া উচিত।’

তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, এই বক্তব্য বর্ষা নিজেও জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন।

তদন্তে আরও বলা হয়েছে, হত্যার কয়েক দিন আগে মাহির ও আয়লান জোবায়েদকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বর্ষাকে আর না পড়ানোর জন্য সতর্ক করেছিলেন। তবে জোবায়েদ বিষয়টি গুরুত্ব দেননি।

তদন্ত কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন জানান, হত্যাকাণ্ডের আগের রাত পর্যন্তও বর্ষা ও জোবায়েদের মধ্যে প্রেমিক-প্রেমিকার মতো কথোপকথন চলছিল। অত্যন্ত কৌশলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যোগাযোগ বজায় রাখায় জোবায়েদ পরিকল্পনার কিছুই বুঝতে পারেননি। ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

আগামী ১২ আগস্ট আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন

আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার বিকেলে অভিযোগপত্রটি প্রসিকিউশনের জিআরও শাখায় পৌঁছায়। গত ১৩ জুলাই অভিযোগপত্র দাখিলের দিন ধার্য থাকলেও তা যথাসময়ে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ফলে আদালত আগামী ১২ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই কামাল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশতিয়াক হোসেন জিপু বলেন, অভিযোগপত্র বর্তমানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনায় রয়েছে। এরপর বিচারকের কাছে উপস্থাপন করে নথিভুক্ত করা হবে।

তিনি বলেন, অভিযোগপত্রে ডিএনএ রিপোর্ট এবং মাহিরের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি রয়েছে। এসব প্রমাণের ভিত্তিতে তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। অন্য আসামিদের বিরুদ্ধেও শক্ত প্রমাণ রয়েছে।

অভিযুক্ত বর্ষার (মামলার দুই নম্বর আসামি) মা আনিকা রহমান দাবি করেছেন, তার মেয়ে নির্দোষ। তিনি বলেন, আমি আগেও বলেছি, আমার মেয়ে নির্দোষ। এখনও বলছি, আমার মেয়ে নির্দোষ।

মামলার বাদী ও নিহত জোবায়েদের বড় ভাই এনায়েত হোসেন বলেন, অভিযোগপত্র আদালতে জমা হয়েছে এতটুকুই জানি। অভিযোগপত্রে ওই তিন আসামি আছে, এটা তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন। আমার পড়ার সুযোগ হয়নি।

তিনি আরও বলেন, যেহেতু এটি একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা, বিচারিক প্রক্রিয়া যেন দ্রুত শুরু ও শেষ হয়, এটাই চাওয়া। দ্রুত বিচার হলে মানুষ বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow