ফুটবল উন্মাদনা, উল্লাস ও উত্তেজনার একাল-সেকাল
মাহাফুজা শিরিন ফুটবলের জন্ম ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী শ্রমঘন সমাজে। ক্লান্ত শরীর, কলকারখানার ধোঁয়া, একঘেয়ে রসহীন যান্ত্রিক জীবনের মধ্যে শ্রমিকরা খুঁজেছিল শরীরের এক বিস্ফোরণ সম্মিলিত উত্তেজনার এক নীরিহ যুদ্ধ। সময়ের ধাপে ধাপে ফুটবল খেলা মানুষের সমষ্টিগত মনস্তত্ত্ব, অহং, ভয়, প্রতিশোধ, স্বপ্ন, প্রেম আর পরাজয়ের গোপন ব্যাকরণ হয়ে ওঠে। চার বছর পরপর পৃথিবী যেন নিজের ভেতরে জমে থাকা কোন আদিম উন্মাদোনা নতুন করে জাগিয়ে তোলে। রাত জাগে শহর, মুখে রং লাগে, ভিনদেশী পতাকা ওড়ে বাড়ির ছাদে, সম্পর্কের মধ্যে ছোটখাটো শীতল যুদ্ধ শুরু হয়-আর মানুষ ভুলে যায় সে কোন মতের, কোন পেশার, কোন শ্রেণির। গোলপোস্টের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে কেবল আবেগ আর ভালোবাসা। মানব ইতিহাসে কিছু উন্মাদনা আছে, যেগুলোকে কেবল খেলা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বাঙালি আর ফুটবল এ যেন এক চিরন্তন প্রেমের গল্প। বিশ্বকাপ ফুটবল বা কোপা আমেরিকার মতো বড় আসর এলে এ দেশের মানুষের ঘুম হারাম হয়ে যায়। তবে সময়ের হাত ধরে এই ফুটবল কেবল ছড়ায়নি; এটি মানুষের সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। আরও পড়ুন আর্জেন্টিনার জার্সির পেছনে ‘১৮৯৩’ লেখার কারণ জানেন? উন্মাদনার ধ
মাহাফুজা শিরিন
ফুটবলের জন্ম ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী শ্রমঘন সমাজে। ক্লান্ত শরীর, কলকারখানার ধোঁয়া, একঘেয়ে রসহীন যান্ত্রিক জীবনের মধ্যে শ্রমিকরা খুঁজেছিল শরীরের এক বিস্ফোরণ সম্মিলিত উত্তেজনার এক নীরিহ যুদ্ধ। সময়ের ধাপে ধাপে ফুটবল খেলা মানুষের সমষ্টিগত মনস্তত্ত্ব, অহং, ভয়, প্রতিশোধ, স্বপ্ন, প্রেম আর পরাজয়ের গোপন ব্যাকরণ হয়ে ওঠে।
চার বছর পরপর পৃথিবী যেন নিজের ভেতরে জমে থাকা কোন আদিম উন্মাদোনা নতুন করে জাগিয়ে তোলে। রাত জাগে শহর, মুখে রং লাগে, ভিনদেশী পতাকা ওড়ে বাড়ির ছাদে, সম্পর্কের মধ্যে ছোটখাটো শীতল যুদ্ধ শুরু হয়-আর মানুষ ভুলে যায় সে কোন মতের, কোন পেশার, কোন শ্রেণির। গোলপোস্টের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে কেবল আবেগ আর ভালোবাসা।
মানব ইতিহাসে কিছু উন্মাদনা আছে, যেগুলোকে কেবল খেলা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বাঙালি আর ফুটবল এ যেন এক চিরন্তন প্রেমের গল্প। বিশ্বকাপ ফুটবল বা কোপা আমেরিকার মতো বড় আসর এলে এ দেশের মানুষের ঘুম হারাম হয়ে যায়। তবে সময়ের হাত ধরে এই ফুটবল কেবল ছড়ায়নি; এটি মানুষের সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
উন্মাদনার ধরনে এসেছে এক বিশাল পরিবর্তন। এসেছে ‘একাল’ আর ‘সেকালের’ দৃশ্যপট। দেখা গেল চারিদিকে সুনসান নীরবতা। হঠাৎ পাড়ার কোনো এক বাড়ি থেকে সমস্বরে ভেসে এলো ‘গোওওওল!’ ব্যস, মুহূর্তেই যেন পুরো এলাকার নীরবতা ভেঙে চুরমার। কেউ বাড়ির ছাদ থেকে চিৎকার করছেন, কেউ রাস্তায় নেমে ভুভুজেলা বাজাচ্ছেন, আবার কেউ হয়তো প্রিয় দলের গোল খাওয়া দেখে মলিন মুখে টিভির সামনে বসে আছেন। ফুটবল মানেই তো এমন নির্ভেজাল উল্লাস আর বাঁধভাঙা উত্তেজনা।
মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে থাকে, অথচ তার ভেতরে জেগে ওঠে অদ্ভুত এক ব্যক্তিগত আবেগ যেন মাঠে দৌড়ানো খেলোয়াড়টি তার নিজের প্রতিনিধি। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর ফুটবল আর কেবল মাঠের মধ্যে থাকেনি। এটি জাতির, রাষ্ট্রের, এমনকি এটি যেন রাজনৈতিক মানচিত্রেরও ভাষা হয়ে ওঠে। কখনো কখনো মনে হবে একেকটি গোল যেন ইতিহাসের জমে থাকা অভিমান। একেকটি ম্যাচ যেন ছোট আকারের কূটনীতি।
একসময় পৃথিবীর শিশুদের কাছে ফুটবলের রাজা ছিলেন দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর কালোমানিক পেলে। যার পায়ের জাদু ব্রাজিলকে দিয়েছিল এক নতুন পৌরানিক মর্যাদা। দরিদ্র দেশও বিশ্বকে মুগ্ধ করতে পারে, একথা বহুজাতি যেন প্রথম বিশ্বাস করতে পেরেছিল তার মধ্য দিয়ে। পেলে কেবল ফুটবলার ছিলেন না; তিনি ছিলেন উপনিবেশ-উত্তর পৃথিবীর আত্মবিশ্বাসের এক রূপক।
তারপর এলেন দিয়াগো ম্যারাডোনা তাঁর পায়ের মধ্যে ছিল, গরীব মানুষের রাগ, রাস্তাঘাটের ধুলা, অসম পৃথিবীর বিরূদ্ধে দাঁড়ানোর বিশেষ শক্তি। তিনি একজন ফুটবলার নন বিদ্রোহী কবিও বটে। পেলের জাদু কিংবা দিয়েগোর বিদ্রোহী কবিতার পর ফুটবল এসে দাঁড়িয়েছে আরও দৃশ্যমান, আরও বিস্তৃত এক মহাবিশ্বে। নেইমারের শিল্পময় দৌড়, মেসির নীরব জাদু,রোনালদোর সেই যান্ত্রিক শৃঙ্খলা, মডরিচের অনমনীয় নেতৃত্ব কিংবা সুয়ারেজের চমকমিশ্রিত উন্মাদনা সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এখন বহু চরিত্রের মহাকাব্য।
সাদাকালো টেলিভিশনের যুগে বিশ্বকাপ ছিল অপেক্ষার উৎসব। রেডিওর কান থেকে সাদা-কালো টিভি আজকের প্রজন্মের কাছে যা রূপকথা, সেকালের মানুষের কাছে সেটাই ছিল বাস্তবতা। নব্বইয়ের দশক বা তারও আগে ফুটবল উন্মাদনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল রেডিওর ট্রানজিস্টর। ধারাভাষ্যকারের মুখে ‘বল নিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন স্ট্রাইকার...’ শুনেই কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন থমকে যেত।
এরপর এলো সাদা-কালো টিভির যুগ। এক বাড়িতে টিভি পাড়ার দশ বাড়ির মানুষ সেখানে গাদাগাদি করে বিশ্বকাপ খেলা দেখছে এই দৃশ্য ছিল সামাজিকতারও এক বিশেষ মহড়া। পুরো পাড়ায় হয়তো একটা বা দুইটা বাড়িতে টেলিভিশন থাকত। ফুটবল ম্যাচ মানেই ছিল সেই বাড়ির উঠোনে পুরো মহল্লার মানুষের ভিড়। ব্যাটারি দিয়ে টিভি চালানো, বারবার অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে ‘ঝিরঝির’ কমানোর সেই আকুলতার মাঝে যে আনন্দ ছিল, তা আজ অতুলনীয়। ছাদে ছাদে প্রিয় দলের পতাকা ওড়ানোর প্রতিযোগিতা আর পাড়ার মোড়ে চায়ের কাপে ঝড় তোলা আড্ডা এসবই ছিল সেকালের ফুটবলের আসল সৌন্দর্য।
সময়ের চাকা ঘুরে আমরা এখন ডিজিটাল যুগে। এখন আর টিভির সামনে বসে থাকারও বাধ্যবাধকতা নেই; হাতের স্মার্টফোনেই ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা লাইভ স্ট্রিমিংয়ে দেখে নেওয়া যাচ্ছে প্রিয় তারকার পায়ের জাদু। আগে চায়ের দোকানে যে তর্ক হতো এখন তা হচ্ছে টাইম লাইনে। একালের উন্মাদনার বড় একটা অংশ দখল করে নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামে এখন খেলা শুরুর আগেই শুরু হয়ে যায় ট্রল আর ‘মেমে’ যুদ্ধ। এক দলের সমর্থক অন্য দলকে খোঁচা দিয়ে পোস্ট করছেন, তৈরি হচ্ছে মজার সব রিলস। বড় বড় ক্যাফে, রেস্তোরাঁ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে জায়ান্ট স্ক্রিনে হাজারো মানুষের একসঙ্গে খেলা দেখা একালের উন্মাদনাকে নিয়ে গেছে অন্য মাত্রায়। জার্সি গায়ে চশমা পরে সেলফি পোস্ট করা এখন ম্যাচ ডে-র অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মানুষ হয়তো নিজের না পারা স্বপ্নকে অন্যের সাফল্যে আশ্রয় দেয়। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল কিংবা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে বিশ্বকাপের উন্মাদনা আরও অদ্ভুত। দেখা যায় যেসব দেশের দল বিশ্বকাপে নেই সেসব দেশের মানুষই বেশি ঝগড়া করে, সবচেয়ে বেশি কাঁদে। এদের মধ্যে কেউ ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠে। ছাদে পতাকা ওড়ে, বন্ধুত্বে ফাটল ধরে। উন্মাদনা যখন শুধুই উল্লাসে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা বিনোদন।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে একালের ফুটবল উত্তেজনায় যোগ হয়েছে কিছু নেতিবাচক দিক। সোশ্যাল মিডিয়ায় সুস্থ ট্রল অনেক সময় রূপ নেয় নোংরা সাইবার বুলিংয়ে। প্রিয় দলের হার মেনে নিতে না পেরে অন্য দলের সমর্থকদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা, গালিগালাজ করা এখন নিত্যদিনের চিত্র। শুধু ভার্চুয়াল জগতেই নয়, মাঠের উত্তেজনা অনেক সময় ছড়িয়ে পড়ে বাস্তবেও।
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল বা রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনা ম্যাচকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি, মারামারি, এমনকি ঘরবাড়ি ভাঙচুরের খবরও গণমাধ্যমে আসে। ফুটবল যেখানে বিশ্বকে এক সুতোয় গাঁথার কথা, সেখানে এই উগ্র মানসিকতা উৎসবের রঙকে মলিন করে দেয়।
তবে বর্তমানে ফুটবলের এই রঙিন উন্মাদনার পিছনে ইতিবাচক দিকও কম নয়, ফুটবল এখন নিছক খেলা নয়, এটি বহুজাতিক অর্থনীতির এক সুবিশাল মঞ্চ। এক সময় গলির ছেলেরা বল মারত স্বপ্ন দেখে; এখন সেই স্বপ্নের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে বাজার, এজেন্ট, প্রচারণা আরা পুঁজির বিশাল হিসাবখাতা। বিশ্বকাপ খেলোয়াড়রা সম্প্রচারস্বত্ব, ব্র্যান্ড, জার্সি বিজ্ঞাপন, ডিজিটাল এলগোরিদম, স্পনসরশিপ সব মিলিয়ে এখন বিলিয়ন ডলারের এক সম্রাজ্য। এছাড়াও দর্শকদের আবেগও এখানে এক ধরনের পণ্য; যাকে নিঃশব্দে কিনে নেয় কর্পোরেট পৃথিবী।
শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়; এটি মানুষের সভ্যতার আয়নায় নিজের মুখ দেখার এক অদ্ভুত আয়োজন। ফুটবল উন্মাদনার রূপ একাল থেকে সেকালে যতই বদলাুক না কেন, এর ভেতরের মূল আবেগটা কিন্তু একই আছে। এখনো ম্যারাডোনা-পেলের স্মৃতি রোমন্থন হয়, এখনো মেসি-নেইমার-এমবাপ্পের জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকে তরুণ প্রজন্ম। এখানে একদিকে থাকে নিষ্পাপ শৈশব, রাতজগা চোখ, পাড়ার ছাদে উড়তে থাকা পতাকা, হেরে গিয়ে অকারণ বিষণ্নতা; অন্যদিকে থাকে রাষ্ট্রের কূটনীতি, কর্পোরেট অর্থ, মিডিয়ার অদৃশ্য মগজধোলাই। ফুটবল উত্তেজনায় যোগ হয়েছে কিছু নেতিবাচক দিক। প্রিয় দলের হার মেনে নিতে না পেরে অন্য দলের সমর্থকদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা, গালিগালাজ করা এখন নিত্যদিনের চিত্র। অনেক সময় এই উগ্র মানসিকতা উৎসবের আনন্দকে মানসিক যন্ত্রণার রূপ দেয়।
ফুটবল উন্মাদনার রূপ একাল থেকে সেকালে যতই বদলাক না কেন, এর ভেতরের মূল আবেগটা কিন্তু একই আছে। পরিবর্তন আসবেই, কিন্তু আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন উত্তেজনার আতিশয্যে ফুটবলের নান্দনিকতা হারিয়ে না যায়। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঠেই থাকুক, আর সোশ্যাল মিডিয়ার খোঁচাখুঁচি থাকুক কেবলই নিছক মজায়। ফুটবল হোক সুস্থ বিনোদন, সম্প্রীতি আর বাঁধভাঙা উল্লাসের এক মিলনমেলা।
কেএসকে
What's Your Reaction?



