বন্ধ চিনিকলে মাসে ব্যয় ২৪ লাখ টাকা

উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান রংপুরের শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেড। সরকারি সিদ্ধান্তে ২০২০ সাল থেকে এর উৎপাদন বন্ধ। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এবং আধুনিকায়নের অভাবের মুখে মিলটির কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও এটি চালুর ব্যাপারে গত কয়েক বছরে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন স্থানীয় আখচাষি ও মিলের কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী। বর্তমানে মিলের যন্ত্রপাতিগুলোতে মরিচা ধরছে। মিলের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতিমাসে গুনতে হচ্ছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ চিনিকলগুলো আবার চালু ও লাভজনকভাবে চালানোর জন্য টাস্কফোর্স গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। ওই টাস্কফোর্সের সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর মাড়াই স্থগিত চিনিকলগুলোর স্থগিতাদেশ তুলে নেয় বিএসএফআইসি। টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে রংপুরের শ্যামপুর ও দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ চিনিকল দুটিতে ২০২৭-২৮ মৌসুম

বন্ধ চিনিকলে মাসে ব্যয় ২৪ লাখ টাকা

উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান রংপুরের শ্যামপুর সুগার মিলস লিমিটেড। সরকারি সিদ্ধান্তে ২০২০ সাল থেকে এর উৎপাদন বন্ধ। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এবং আধুনিকায়নের অভাবের মুখে মিলটির কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও এটি চালুর ব্যাপারে গত কয়েক বছরে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন স্থানীয় আখচাষি ও মিলের কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারী।

বর্তমানে মিলের যন্ত্রপাতিগুলোতে মরিচা ধরছে। মিলের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতিমাসে গুনতে হচ্ছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্ধ চিনিকলগুলো আবার চালু ও লাভজনকভাবে চালানোর জন্য টাস্কফোর্স গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। ওই টাস্কফোর্সের সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর মাড়াই স্থগিত চিনিকলগুলোর স্থগিতাদেশ তুলে নেয় বিএসএফআইসি।

টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে রংপুরের শ্যামপুর ও দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ চিনিকল দুটিতে ২০২৭-২৮ মৌসুম থেকে আখমাড়াই শুরু করতে তিন বছরে পর্যায়ক্রমে সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদানের সুপারিশ করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে এ সহায়তার কথা বলা হয়।

বন্ধ চিনিকলে মাসে ব্যয় ২৪ লাখ টাকা

বিএসএফআইসির নথিপত্র বলছে, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শ্যামপুর চিনিকলের জন্য ৫১ কোটি ৭০ লাখ চেয়ে গত বছরের ১৩ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠির জবাবে গত বছরের ৩০ জুলাই বিএসএফআইসিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনকে অর্থ বিভাগ থেকে বিগত দুই দশকে ‘পরিচালন ঋণ’ বাবদ বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়। বিএসএফআইসি একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান এবং এ বাবদ সরকারি বিপুল ভর্তুকি হ্রাসের উদ্যোগে চিনিকলগুলো বন্ধ করা হয়েছিল। তাই অর্থ বরাদ্দে অসম্মতি জানায় অর্থ বিভাগ।

শ্রমিক ইউনিয়ন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পরিকল্পিতভাবে মিলটিকে লোকসানি দেখানো হয়েছে। এটি আধুনিকায়ন করলে পুনরায় লাভজনক করা সম্ভব।

‘টানা লোকসানের মুখে ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুম থেকে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয় রংপুরের একমাত্র ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্যামপুর চিনিকলের। একসময়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ঘেরা এ মিলে এখন কেবলই সুনসান নীরবতা। দাপ্তরিক কাজকর্ম চললেও নেই কর্মচাঞ্চল্য। শ্রমিক-চাষিদের আগের মতো হাঁকডাক নেই’

চিনিকল অ্যামপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘শ্যামপুর চিনিকল ঘিরে এ এলাকার শ্রমিক-চাষি মিলে কয়েক হাজার পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হতো। মিল বন্ধের পর স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন জায়গায় বদলি হলেও বেশিরভাগ অস্থায়ী কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্যামপুর চিনিকল চালুর ঘোষণা দিয়েছিল। এতে আশায় বুক বেঁধেছিলেন এ এলাকার মানুষজন। কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এটি চালুর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। এতে শ্রমিক-কর্মচারীদের হতাশা বাড়ছে।’

বন্ধ চিনিকলে মাসে ব্যয় ২৪ লাখ টাকা

আসন্ন বাজেটে মিল চালুর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আবু সুফিয়ান বলেন, ‘শ্যামপুর চিনিকল এ এলাকার মানুষের প্রাণের স্পন্দন ছিল। এটি বন্ধ হওয়ার পর থেকে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। আমরা চাই সরকার দ্রুত আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে মিলটি সচল করুক।’

সূত্রমতে, টানা লোকসানের মুখে ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুম থেকে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয় রংপুরের একমাত্র ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্যামপুর চিনিকলের। একসময়ের প্রাণচাঞ্চল্যে ঘেরা এ মিলে এখন কেবলই সুনসান নীরবতা। দাপ্তরিক কাজকর্ম চললেও নেই কর্মচাঞ্চল্য। শ্রমিক-চাষিদের আগের মতো হাঁকডাক নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর বন্দরে ১৯৬৪ সালে নির্মাণ হয় শ্যামপুর সুগার মিল। ১১১ দশমিক ৪৫ একর জমির ওপর নির্মিত এ মিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মাড়াই শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। দৈনিক আখ মাড়াইয়ের সক্ষমতা রাখা হয় এক হাজার ১৬ টন। বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ধরা হয় ১০ হাজার ১৬১ টন। বছরে মিলের মেশিন চালু থাকে তিন মাস। চালুর পর থেকে লাভের মুখ দেখলেও ২০০০ সালের পর থেকে টানা লোকসানের মুখে পড়ে মিলটি। ব্যাংক ঋণ, ঋণের সুদ ও শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন খাত মিলে শেষ পর্যন্ত লোকসান বেড়ে হয় কয়েকশ কোটি টাকা।

বন্ধ চিনিকলে মাসে ব্যয় ২৪ লাখ টাকা

এ পরিস্থিতিতে তৎকালীন শিল্প, বাণিজ্য, অর্থ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি মিলটির মাড়াই কার্যক্রম বন্ধের সুপারিশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুমে মিলের কার্যক্রম বন্ধ করে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন। মিল এলাকায় আখ উৎপাদন কমে যাওয়া ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে লোকসানের বোঝা বাড়ছে বলে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও তা মানতে নারাজ ছিলেন শ্রমিক-কর্মচারী ও আখচাষিরা।

আরও পড়ুন:
বন্ধ চিনিকলে বাড়ছে দেনা-দুর্ভোগ
আখের অভাবে বন্ধ হলো নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল
চিনিকলের বর্জ্যে দূষিত চন্দনা-বারাশিয়া নদীর পানি, মরছে মাছ
শতকোটি টাকা বিনিয়োগেও কার্যত অচল কেরু চিনিকল
কেরু চিনিকলে মুনাফায় রেকর্ড, চিনিতে লোকসান

কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অদক্ষ জনবল ও অব্যবস্থাপনাসহ নানা কারণে লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে দাবি করে মিল চালুর দাবিতে আন্দোলন শুরু করে চিনিকল অ্যামপ্লয়িজ ইউনিয়ন ও আখচাষি কল্যাণ সমিতি। তবে শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি সেই আন্দোলন। অব্যাহত লোকসান দেখিয়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় মিলটি।

‘বর্তমানে মিলে কর্মরত স্থায়ী-অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো বেতন-ভাতা বকেয়া নেই। সরকারিভাবে মিল চালুর ঘোষণার পর কর্মপরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের পাঠানো হয়েছে। অর্থ ছাড় হলেই মিল চালুর কার্যক্রম শুরু হবে’—ব্যবস্থাপনা পরিচালক

মিল সূত্রে জানা যায়, কার্যক্রম চালু থাকাকালীন এ মিলে সবশেষ ৪৯৩জন স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন। মিলটি বন্ধের পর অনেকেই অবসর গ্রহণ করেছেন। কিছু জনবল অন্যান্য মিলে বদলি করা হয়েছে। বর্তমানে শ্যামপুর চিনিকলে ৬৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। এরমধ্যে সাতজন কর্মকর্তা ও ৯ জন শিক্ষকসহ ২৯ জন স্থায়ী, ৩২ জন পাহারাদার, একজন সুইপার ও একজন মুয়াজ্জিনসহ ৩৪ জন অস্থায়ী জনবল নিয়ে চলছে দাপ্তরিক কাজ।

স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা এবং কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাবদ প্রতিমাসে প্রায় ২৪ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে জানান মিলের সহকারী ব্যবস্থাপক (ভান্ডার) দেবাশীষ সিংহ রায়।

তিনি বলেন, ‘২৪ লাখ টাকার মতো ব্যয় হলেও এর বিপরীতে মিলের জমি লিজ দিয়ে বছরে ৬-৭ লাখ টাকার মতো আয় হয়। এছাড়া মিলের জমি, যন্ত্রপাতি, মেশিন, আবাসিক ও প্রশাসনিক ভবন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জনবল প্রয়োজন। তা নাহলে অবশিষ্ট কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হবে না।’

শ্যামপুর চিনিকলের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক (এক্সটেনশন) জাহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, জয়পুরহাট চিনিকলের আওতায় (সাব জোন) এবার ৩০০ একর জমিতে আখ চাষ হয়েছে। মাড়াইয়ের জন্য এখানকার আখ নিয়ে যাওয়া হয় জয়পুরহাট চিনিকলে। তবে নতুন করে মিল চালু কিংবা লাভজনক করতে গেলে কমপক্ষে তিন মৌসুম সময় প্রয়োজন। এক মৌসুমের আখ দিয়ে মিল চালু করা যায় না। এ মৌসুমে বরাদ্দ পেলেও পুরোপুরি চিনি উৎপাদনে যেতে তিন মৌসুম সময় লাগবে।

 

বদরগঞ্জের একজন কৃষক ফজলুল হক। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মিল চালু থাকা অবস্থায় নিয়মিত আখচাষ করতাম। এখন আখ চাষ বাদ দিয়ে ধান, গম, ভুট্টা, সবজি আবাদ করি।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী মানিক মিয়া বলেন, ‘কৃষিনির্ভর রংপুরের অন্যতম একটি ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল শ্যামপুর সুগার মিল। এরসঙ্গে জড়িত ছিল কয়েক হাজার পরিবার। এখন কাজ হারিয়ে অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সংস্কার করে মিলটি পুনরায় চালুর কথা শুনেছিলাম। এটা করতে পারলেও ভালো হতো। তবে সেই প্রক্রিয়া কবে নাগাদ শুরু হবে বা আদৌ হবে কি-না তা অনিশ্চিত। যে প্রক্রিয়ায় হোক না কেন, এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মিলটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালু করা প্রয়োজন।’

মিলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে মিলে কর্মরত স্থায়ী-অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো বেতন-ভাতা বকেয়া নেই। সরকারিভাবে মিল চালুর ঘোষণার পর কর্মপরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের পাঠানো হয়েছে। অর্থ ছাড় হলেই মিল চালুর কার্যক্রম শুরু হবে।’

এসআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow