বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ বোলার থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন

ব্যাট-বল হাতে যার স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর, সেই মোবারক হোসেন ইমন এখন পরিচিত ‘ডেভিড ইমন’ নামে। একসময় চট্টগ্রামের ক্রিকেটাঙ্গনে সম্ভাবনাময় বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে যার পরিচিতি ছিল; কয়েক বছরের ব্যবধানে তার নাম উঠে আসে নগরের অপরাধ জগতের আলোচনায়। হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক মামলার আসামি হিসেবে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা ডেভিড ইমনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গোঁফ কেটে ছদ্মবেশে সহযোগীদের নিয়ে যশোর সীমান্ত ব্যবহার করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি। টানা নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং চট্টগ্রাম ও যশোর জেলা পুলিশের সমন্বিত অভিযানের পর তাকে আটক করা হয়। বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের ৯টি দলের যৌথ অভিযানে ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার অন্য তিনজন হলেন- ঢাকার জুরাইনের আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (২৫), কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ এলাকার মো. শামীম (২৮) এবং নোয়াখালীর সাহারপাড়া এলাকার সাফায়েত হোসেন

বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ বোলার থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন

ব্যাট-বল হাতে যার স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর, সেই মোবারক হোসেন ইমন এখন পরিচিত ‘ডেভিড ইমন’ নামে। একসময় চট্টগ্রামের ক্রিকেটাঙ্গনে সম্ভাবনাময় বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে যার পরিচিতি ছিল; কয়েক বছরের ব্যবধানে তার নাম উঠে আসে নগরের অপরাধ জগতের আলোচনায়। হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক মামলার আসামি হিসেবে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা ডেভিড ইমনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গোঁফ কেটে ছদ্মবেশে সহযোগীদের নিয়ে যশোর সীমান্ত ব্যবহার করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি। টানা নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং চট্টগ্রাম ও যশোর জেলা পুলিশের সমন্বিত অভিযানের পর তাকে আটক করা হয়।

বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের ৯টি দলের যৌথ অভিযানে ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার অন্য তিনজন হলেন- ঢাকার জুরাইনের আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (২৫), কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ এলাকার মো. শামীম (২৮) এবং নোয়াখালীর সাহারপাড়া এলাকার সাফায়েত হোসেন (২৮)।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঝুমঝুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ অভিযানে যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ যৌথভাবে অংশ নেয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।’

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম কালবেলাকে বলেন, জেলা পুলিশের একাধিক দলের দীর্ঘদিনের নজরদারি ও ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবেই বুধবার সকালে ডেভিড ইমনসহ তার সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের নিয়ে যশোর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, ডেভিড ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান আলমকে গ্রেপ্তারের জন্য একই সময়ে পৃথক অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পালিয়ে যান। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রসংক্রান্ত একাধিক অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে ডেভিড ইমনকে খুঁজছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গ্রেপ্তারের আগে প্রায় সাত দিন ধরে তার অবস্থান ও চলাচলের ওপর নজরদারি চালানো হয়।

২২ গজে শুরু হয়েছিল পথচলা
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের একটি সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম মোবারক হোসেন ইমনের। বাবা মো. মুসা। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ফটিকছড়িতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উপজেলা চেয়ারম্যান তৈয়বের অনুসারী হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাকে দেখা যেত। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি রাজনীতির সেই পরিসর থেকে সরে গিয়ে অন্য একটি বৃত্তে যুক্ত হন বলে দাবি স্থানীয়দের। ছোটবেলা থেকেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন তিনি। লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্রিকেটের প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ।

এলাকার মাঠ থেকে শুরু হওয়া ক্রিকেটের পথ তাকে নিয়ে আসে চট্টগ্রাম শহরে। ২০১৯ সালের দিকে তিনি যোগ দেন ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে। নিয়মিত অনুশীলন করতেন বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও কাজীর দেউরী এলাকায়। বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে দ্রুতই পরিচিতি পান ইমন। ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবের বোলিং অনুসরণ করতেন তিনি। ক্রিকেট নিয়েই ছিল তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমির কোচ আমিনুল হক বলেন,‘ইমন খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। বেশি কথা বলত না। নিয়মিত অনুশীলন করত। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই একাডেমিতে এসেছিল। বোলিংয়ে তার সম্ভাবনা ছিল। পরে করোনার সময়ের পর থেকে আর তাকে দেখা যায়নি। এরপর একদিন গণমাধ্যমে ‘ডেভিড ইমন’ নামে আলোচনায় আসে। তখন জানতে পারি, সেই ছেলেটিই মোবারক হোসেন ইমন।’

একাডেমির সাবেক কয়েকজন ক্রিকেটারের জানান, ইমনের বোলিং নিয়ে কোচদের মধ্যে আশাবাদ ছিল। বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার মতো সামর্থ্যও ছিল তার। তবে পারিবারিক সংকটের কারণে ধীরে ধীরে ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যান তিনি।

পরিচিতদের তথ্য অনুযায়ী, ইমনের বাবা দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। পরিবারের সীমিত আয়, বাবার চিকিৎসা এবং নিজের ক্রিকেট চালিয়ে নেওয়ার চাপ- সব মিলিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন তিনি। একসময় নিয়মিত অনুশীলন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ক্রিকেটাঙ্গন থেকে হারিয়ে যান সম্ভাবনাময় এই তরুণ।

অপরাধ জগতে নতুন পরিচয়ে ডেভিড ইমন
ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর মোবারক হোসেন ইমন কীভাবে অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তা নিয়ে রয়েছে নানা তথ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি। ওই সময় থেকেই বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের গ্রুপের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে।

পুলিশের দাবি, অল্প সময়ের মধ্যেই সাজ্জাদ গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিতি পান ডেভিড ইমন। নগরের বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের তৎপরতার মধ্যে তার নাম সামনে আসে। সাজ্জাদ গ্রুপের কার্যক্রম চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, চান্দগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত ছিল। পাশাপাশি জেলার রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি এলাকাতেও এ চক্রের সদস্যদের তৎপরতার তথ্য পাওয়া যায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন কারাগারে যাওয়ার পর ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম চক্রটির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদা দাবি, হামলা ও অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ আসতে থাকে।

একসময় ক্রিকেট মাঠে যে তরুণকে সম্ভাবনাময় স্পিনার হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেই ইমনকে ঘিরে তৈরি হয় ভিন্ন পরিচয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অস্ত্রসহ ছবি প্রকাশের মাধ্যমে অপরাধ জগতের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে।

হত্যা মামলার অভিযোগে ইমনের নাম
পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট চট্টগ্রামে আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা মামলায় ডেভিড ইমনের নাম আসে।এরপর ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় আলোচিত জোড়া হত্যা মামলায় তার নাম উঠে আসে।একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাতেও তাকে আসামি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হত্যা ছাড়াও অস্ত্র, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। সর্বশেষ নগরের চন্দনপুরা এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় আবারও আলোচনায় আসে ডেভিড ইমনের নাম।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই দুপুরে চন্দনপুরা এলাকায় ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) নামের একটি ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, হামলাকারীরা অস্ত্র নিয়ে এসে প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালায় এবং নগদ অর্থ নিয়ে যায়।ওই ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে অভিযান শুরু করে পুলিশ। তদন্তে ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীদের নাম সামনে আসে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করে।

এর আগে নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে ডেভিড ইমনের দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।গ্রেপ্তাররা হলেন মো. আসিফ (২৫) ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফ (২৪)। পুলিশের তথ্যমতে, আসিফের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। আরিফের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় আরও দুই রাউন্ড গুলি। পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুজন নিজেদের ডেভিড ইমনের সহযোগী বলে পরিচয় দিয়েছেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডেভিড ইমনকে ধরতে অভিযান জোরদার করা হয়।

আত্মগোপন থেকে যশোরে গ্রেপ্তার
সহযোগীদের গ্রেপ্তারের পর ডেভিড ইমনের অবস্থান শনাক্তে দেশের বিভিন্ন স্থানে নজরদারি শুরু করে পুলিশ। একপর্যায়ে তার অবস্থান চট্টগ্রামের বাইরে শনাক্ত হয়। ডেভিড ইমন অবস্থান পরিবর্তন করে আত্মগোপনে ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় নিজেকে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলেও দেখানোর চেষ্টা করতেন।

পুলিশ জানায়, কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে যশোর সীমান্ত ব্যবহার করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন ডেভিড ইমন। এরপর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ যশোর জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করে। এর ধারাবাহিকতায় বুধবার ভোরে যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় ডিবি ও কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিডকে গ্রেপ্তার করা হয়।একই অভিযানে তার তিন সহযোগী আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল, মো. শামীম ও মো. সাফায়েত হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চট্টগ্রামের সক্রিয় অপরাধচক্র, অস্ত্রের উৎস, সহযোগী এবং বিভিন্ন মামলার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow