বাংলাদেশের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক বিপ্লব জ্বালানি খাত থেকেই শুরু হবে

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়িয়ে বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি বড় ধাপ অতিক্রম করেছে। কিন্তু সেই সাফল্যের আড়ালে তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকি আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা। এলএনজি, কয়লা ও জ্বালানি তেলের আমদানি বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে, উৎপাদন ব্যয়ও হচ্ছে অস্থির। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী দুই দশকের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে দেশীয় গ্যাস, বঙ্গোপসাগরের সম্পদ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতি। বিদ্যুতের পর এবার জ্বালানিতে স্বনির্ভরতার চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে নিজস্ব সম্পদভিত্তিক অর্থনীতির পথে রয়েছে বাংলাদেশ। এটা হবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক বিপ্লব। দ্বিতীয় অর্থনৈতিক রূপান্তর বলতে শুধু নতুন গ্যাস বা বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; বরং দেশীয় প্রাকৃতিক ও নবায়নযোগ্য সম্পদকে শিল্প, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও উচ্চমূল্য সংযোজনের সঙ্গে যুক্ত করে একটি resource-to-industry economy গড়ে তোলাকে বোঝানো হচ্ছে।  পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক জ্বালানির প্রধান উৎস এখনো প্রাকৃতিক গ্যাস। তবে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র গুলোর উৎপাদন কমছে। নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হওয়ায়

বাংলাদেশের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক বিপ্লব জ্বালানি খাত থেকেই শুরু হবে
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়িয়ে বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি বড় ধাপ অতিক্রম করেছে। কিন্তু সেই সাফল্যের আড়ালে তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকি আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা। এলএনজি, কয়লা ও জ্বালানি তেলের আমদানি বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে, উৎপাদন ব্যয়ও হচ্ছে অস্থির। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী দুই দশকের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে দেশীয় গ্যাস, বঙ্গোপসাগরের সম্পদ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতি। বিদ্যুতের পর এবার জ্বালানিতে স্বনির্ভরতার চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি থেকে নিজস্ব সম্পদভিত্তিক অর্থনীতির পথে রয়েছে বাংলাদেশ। এটা হবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক বিপ্লব। দ্বিতীয় অর্থনৈতিক রূপান্তর বলতে শুধু নতুন গ্যাস বা বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; বরং দেশীয় প্রাকৃতিক ও নবায়নযোগ্য সম্পদকে শিল্প, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও উচ্চমূল্য সংযোজনের সঙ্গে যুক্ত করে একটি resource-to-industry economy গড়ে তোলাকে বোঝানো হচ্ছে।  পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক জ্বালানির প্রধান উৎস এখনো প্রাকৃতিক গ্যাস। তবে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র গুলোর উৎপাদন কমছে। নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হওয়ায় চাহিদা মেটাতে ক্রমেই বাড়ছে এলএনজি আমদানি।  বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা দেখিয়ে দিয়েছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে শিল্প, রপ্তানি এবং মূল্যস্ফীতিতে।  এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোরও পরিকল্পনা রয়েছে। অতীতে একটি জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল পরিকল্পনা বড় নীতিগত দুর্বলতা ছিল। ভবিষ্যতে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, জ্বালানি খাতে দক্ষতা, ব্যয়-সাশ্রয়, স্বচ্ছ ট্যারিফ নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার মতে, জ্বালানির প্রকৃত মূল্য, দক্ষ ব্যবহার এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি না হলে খাতটির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না। গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করলেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। অনুসন্ধান, উত্তোলন, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং শিল্পে ব্যবহারের পুরো শৃঙ্খলকে একসঙ্গে উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা জরুরি। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারপারসন ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, শিল্পায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের জ্বালানি অপরিহার্য। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ উভয়ই বাড়বে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল, উৎপাদনশীল শিল্প এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতগুলোতে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গতি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস আবিষ্কার হলে কেবল যে আমদানি কমবে তা না বরং গ্যাসভিত্তিক সার, পেট্রোকেমিক্যাল, রাসায়নিক শিল্প এবং অন্যান্য ডাউনস্ট্রিম শিল্প গড়ে উঠবে। এতে একই সম্পদ থেকে বহুগুণ অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন সম্ভব হবে। শুধু গ্যাস নয়, দরকার সম্পদভিত্তিক শিল্পনীতি।  তার মতে, বাংলাদেশের পরবর্তী উন্নয়ন কৌশল শুধু সম্পদ উত্তোলনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বরং সেই সম্পদকে শিল্পে রূপান্তর করে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের দিকে যেতে হবে।  সাকিফ শামীম জানান, নরওয়ে তেল ও গ্যাসের আয়কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সার্বভৌম সম্পদ তহবিলে বিনিয়োগ করেছে। কাতার গ্যাসকে কেন্দ্র করে এলএনজি, পেট্রোকেমিক্যাল ও বৈশ্বিক বিনিয়োগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। আবার ইন্দোনেশিয়া নিকেলকে কেন্দ্র করে ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশকেও একইভাবে ‘রিসোর্স টু ইন্ডাস্ট্রি’ কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যেখানে গ্যাস শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি নয়, বরং শিল্পায়নের কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহৃত হবে। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আব্দুল মান্নান বলেন, স্থলভাগের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লকগুলোতে। নতুন প্রোডাকশন শেয়ারিং কনট্রাক্ট (PSC), আধুনিক সিসমিক জরিপ এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow