বাংলার যাত্রাপালার স্বর্ণযুগ ও ‘মরমী বধূ’ আজ শুধুই স্মৃতি

৯০ বছর বয়স জগুয়া পালের, গল্প হচ্ছিলো তার সঙ্গে। জানতে চাইলাম আশির দশকের গল্প। তৎকালীন সমাজব্যবস্থার প্রসঙ্গে কথার পিঠে কথা চড়ছিল, এক পর্যায়ে এলো ‘যাত্রাপালা’র কথা। এই প্রসঙ্গ উঠতেই ছলছল করে ওঠে জগুয়া পালের চোখ, যেন আবেগী স্মৃতিতে ফিরলেন তিনি। জানা গেল, আশির দশকের শুরুতে গ্রাম বাংলার সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলেছিল ‘মরমী বধূ’ নামের এক যাত্রাপালা। জসীম উদ্দিনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ অবলম্বনে নাট্যরূপ দেওয়া হয়েছিল। নট ও নাট্যকার নির্মল মুখোপাধ্যায় আর মীনাকুমারী তখন গ্রামের পর গ্রাম রাত জেগে অভিনয় করছেন। ‘মরমী বধূ’ পালা দেখতে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার ভ্যান রিকশা ভাড়া করে যেতেন বাড়ির মেয়েরা। আত্মীয়ের বাড়ি থেকেও যাত্রাপালা দেখতেন মানুষ। নিখাদ প্রেমের এই পালা বলা যায় শরৎচন্দ্রের দেবদাসকে হারিয়ে দিয়েছিল। প্যান্ডেল থেকে চোখ মুছতে মুছতে বের হতেন না এমন নারী-পুরুষের সংখ্যা পাওয়া ছিল দুষ্কর। তার আগে অবশ্য ‘বিবি আনন্দময়ী’, ‘নটী বিনোদিনী’, ‘মীরার বঁধুয়া’, ‘গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম’, ‘মা মাটি মানুষ’ বাংলা দাপিয়ে বেড়ায়। কিন্তু তাদের জনপ্রিয়তার চেয়ে মরমী বধূ ছিল গ্রামের মানুষের অনেক কাছের। তখনো জনপ্রিয়তার বিচার হতো-কতো

বাংলার যাত্রাপালার স্বর্ণযুগ ও ‘মরমী বধূ’ আজ শুধুই স্মৃতি

৯০ বছর বয়স জগুয়া পালের, গল্প হচ্ছিলো তার সঙ্গে। জানতে চাইলাম আশির দশকের গল্প। তৎকালীন সমাজব্যবস্থার প্রসঙ্গে কথার পিঠে কথা চড়ছিল, এক পর্যায়ে এলো ‘যাত্রাপালা’র কথা। এই প্রসঙ্গ উঠতেই ছলছল করে ওঠে জগুয়া পালের চোখ, যেন আবেগী স্মৃতিতে ফিরলেন তিনি।

জানা গেল, আশির দশকের শুরুতে গ্রাম বাংলার সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলেছিল ‘মরমী বধূ’ নামের এক যাত্রাপালা। জসীম উদ্দিনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ অবলম্বনে নাট্যরূপ দেওয়া হয়েছিল। নট ও নাট্যকার নির্মল মুখোপাধ্যায় আর মীনাকুমারী তখন গ্রামের পর গ্রাম রাত জেগে অভিনয় করছেন।

‘মরমী বধূ’ পালা দেখতে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার ভ্যান রিকশা ভাড়া করে যেতেন বাড়ির মেয়েরা। আত্মীয়ের বাড়ি থেকেও যাত্রাপালা দেখতেন মানুষ। নিখাদ প্রেমের এই পালা বলা যায় শরৎচন্দ্রের দেবদাসকে হারিয়ে দিয়েছিল। প্যান্ডেল থেকে চোখ মুছতে মুছতে বের হতেন না এমন নারী-পুরুষের সংখ্যা পাওয়া ছিল দুষ্কর।

jagonewsতার আগে অবশ্য ‘বিবি আনন্দময়ী’, ‘নটী বিনোদিনী’, ‘মীরার বঁধুয়া’, ‘গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম’, ‘মা মাটি মানুষ’ বাংলা দাপিয়ে বেড়ায়। কিন্তু তাদের জনপ্রিয়তার চেয়ে মরমী বধূ ছিল গ্রামের মানুষের অনেক কাছের। তখনো জনপ্রিয়তার বিচার হতো-কতো টিকিট বিক্রি হলো আর হাটে-বাজারে, মাঠে ঘাটে কোন যাত্রাপালা আলোচনা হচ্ছে, তা দিয়ে।

গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম, মীরার বঁধুয়া ছিল পৌরণিক পালা। হিন্দু, এমনকি মুসলমানদের একটি অংশ এই দুই যাত্রাপালা দেখতে ছুটতেন। এর বড় কারণ বীণা দাশগুপ্ত আর বেলা মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়। তবে এই দুই নায়িকাকে ছাপিয়ে মীনাকুমারী হয়ে উঠেছিলেন গ্রাম বাংলার পার্বতী বা লায়লা মজনুর লায়লি।

প্রতিবছর যেমন হালখাতা হয়, তখনো যাত্রাপালায় হালখাতা হতো। বায়না দেওয়া হতো, উল্টোরথে বুকিং নেওয়া হতো ঠিকই, তবে পছন্দমতো তারিখ পাওয়া যেত না। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকটাতেও বেশ জনপ্রিয় ছিল যাত্রাপালা।

তার বেশ কিছুদিনের মধ্যেই হঠাৎ ভাটার টান। যাত্রার স্বর্ণযুগ বলা হয় সত্তরের শুরু থেকে নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়টাকে। অনেকে বলেন, ততদিনে গ্রামে ঢুকে পড়েছে টেলিভিশন, বিনোদন ঘরের মধ্যে পৌঁছে যাওয়ায় যাত্রার নাকি কদর কমেছিল।

কিন্তু যারা যাত্রাপালার আয়োজন করত তাদের মতে ভালো মানের শিল্পীরা এ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন বলেই আজ এ অবস্থা। বর্তমানে যে যাত্রাপালা এসেছে তা মানুষের মন জয় করতে পারেনি। তাই যাত্রাশিল্পে ভাটা পড়তে শুরু করল।

একসময় শীতকাল ছিল যাত্রাপালার অন্যতম সময়। বাংলার গ্রামাঞ্চল ছিল যাত্রাপালার পীঠস্থান। এখন আর সেই ঐতিহ্য নেই। একসময় যাত্রা করে জনপ্রিয় হয়েছিলেন যারা, তাদের অভিনয় দেখতেই মানুষ ভিড় জমাতেন। পরবর্তীকালে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের একটা অংশ নেমে পড়েন আসরে। তাদের দেখতে ভিড় জমান উৎসাহী মানুষ। ঠিক এখন যেমন সিরিয়ালের পরিচিত মুখ দেখলে মানুষ ছুটে যান টিভিতে।

jagonewsআশির দশকে নামকরা পালা দেখতে যেমন মানুষ ছুটতেন প্যান্ডেলে। গ্রামে হতো মনসার ভাসান, বনবিবি চম্পা, রূপবান যাত্রা, বেহুলা-লখিন্দর, লায়লা মজনুর মতো অত্যন্ত জনপ্রিয় যাত্রাপালা। গ্রামে খেটে খাওয়া মানুষ হিন্দু-মুসলমান সন্ধ্যার পর একসঙ্গে বসতেন রিহার্সালে। এক-একটা দল দুই-তিনটি করে পালা নামাত। সেরা অভিনেতা অভিনেত্রীকে খুশি হয়ে বহু মানুষ পুরস্কার দিতেন, তাদের নাম ঘোষণা করা হতো মাইকে, এই নাম ঘোষণার ব্যাপারটা নামী যাত্রাতেও হতো, গ্রামের মানুষ মনে করতেন এতে তার সম্মান বেড়েছে, দেখাদেখি আরও অনেকেই ছুটে আসতেন স্টেজে। অভিনেতাদের মোটা টাকা ব্যক্তিগত আয় হতো। গ্রামে একসময় যাত্রাপালার প্রতিযোগিতা হতো।

সেসব দিন এখন আর নেই। এর কারণ কী? এখন মানুষের সময় কম। সবাই ছুটছেন আয়ের জন্য। সন্ধেবেলাতেও ফুরসত নেই। ধর্ম বেশ বড় আকারেই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, বাঙালি মুসলমানদের বাড়ির বউ আর আগের মতো যাত্রা দেখার অনুমতি পান না। হিন্দু মন্দির যেমন বাড়ছে, মুসলমানদের মসজিদও বাড়ছে।

শহরতলি ছাড়িয়ে এই প্রবণতা এখন গ্রামেও। আগে দেখা যেত বেহুলা সাজছেন মুসলমান অবিবাহিত মেয়ে, হিন্দুর অবিবাহিত ছেলে সাজছেন লখিন্দর, সেসব দিন আর নেই। ধর্মের বেড়াজাল হয়ত আটকে দিয়েছে অনেক কিছু। পাশাপাশি যাত্রাপালায় অসাধু মানুষের নজর পড়েছে। এসেছে অশ্লীলতাও। এছাড়া ঘরে ঘরে এখন টেলিভিশন আছে। হাতে হাতে মোবাইল-ল্যাপটপ আছে। যাত্রাপালায় সময় দেওয়ার সময় কই?

আরও পড়ুন
দেউলিয়ার পর বন্ধ হয়ে গেল ব্রিটিশদের সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’
মাত্র ৬২ বর্গমাইলের ছবির মতো এক দেশ, জানেন কোথায়?

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow