বাজারে ঘুরছে অর্ধশত গুইসাপ, হয়েছে মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব
ফরিদপুরের সদরপুরে একটি জলাশয়ের তীরজুড়ে অবাধে বিচরণ করছে বিশালাকৃতির বিলুপ্তপ্রায় অর্ধশত গুইসাপ। ৩০ থেকে ৪০ কেজির মতো ওজনের গুইসাপগুলো দলবদ্ধ হয়ে ময়লার ভাগাড়, ঝোপঝাড়, বাজার এমনকি বাড়ির উঠানে প্রকাশ্যে ঘুরছে। তবে তারা মানুষ ও পরিবারের কোনো ক্ষতি করে না। স্থানীয়দের যেন বন্ধু হয়ে উঠেছে তারা। বিশেষ করে বাজারের দোকানপাট ও বাসা-বাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া পচা মাছ, মরা মুরগি, জবাই করা গরু-ছাগলের হাড় ও নাড়িভুঁড়িসহ ময়লা আবর্জনা খেয়ে বেঁচে থাকার পাশাপাশি বাজার-ঘাট বাড়ির আঙিনা রাখছে পরিষ্কার। যার কারণে গুইসাপগুলো স্থানীয়দের কাছে ও বাজারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা সদর বাজার সংলগ্ন খালের তীরজুড়ে প্রায় দুই যুগ ধরে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিশালাকৃতির গুইসাপগুলো। প্রথমে দুই-চারটি গুইসাপ দেখা গেলেও বংশবিস্তারের মাধ্যমে এখন এগুলোর সংখ্যা প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি। তবে এখন পর্যন্ত কারো কোনো ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠেনি এগুলো। বাজার ও বাসাবাড়ির উঠানে এদের প্রকাশ্যে বিচরণ দেখা গেলেও ময়লা-আবর্জনা, পচা-গলা খাবার ছাড়া গেরস্তের হাঁস-মুরগি বা কোনো কিছুর ক্ষতি করে না। স্থানীয়রা দেখলে তাদের খাবার দে
ফরিদপুরের সদরপুরে একটি জলাশয়ের তীরজুড়ে অবাধে বিচরণ করছে বিশালাকৃতির বিলুপ্তপ্রায় অর্ধশত গুইসাপ। ৩০ থেকে ৪০ কেজির মতো ওজনের গুইসাপগুলো দলবদ্ধ হয়ে ময়লার ভাগাড়, ঝোপঝাড়, বাজার এমনকি বাড়ির উঠানে প্রকাশ্যে ঘুরছে। তবে তারা মানুষ ও পরিবারের কোনো ক্ষতি করে না। স্থানীয়দের যেন বন্ধু হয়ে উঠেছে তারা।
বিশেষ করে বাজারের দোকানপাট ও বাসা-বাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া পচা মাছ, মরা মুরগি, জবাই করা গরু-ছাগলের হাড় ও নাড়িভুঁড়িসহ ময়লা আবর্জনা খেয়ে বেঁচে থাকার পাশাপাশি বাজার-ঘাট বাড়ির আঙিনা রাখছে পরিষ্কার। যার কারণে গুইসাপগুলো স্থানীয়দের কাছে ও বাজারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা সদর বাজার সংলগ্ন খালের তীরজুড়ে প্রায় দুই যুগ ধরে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিশালাকৃতির গুইসাপগুলো। প্রথমে দুই-চারটি গুইসাপ দেখা গেলেও বংশবিস্তারের মাধ্যমে এখন এগুলোর সংখ্যা প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি। তবে এখন পর্যন্ত কারো কোনো ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠেনি এগুলো। বাজার ও বাসাবাড়ির উঠানে এদের প্রকাশ্যে বিচরণ দেখা গেলেও ময়লা-আবর্জনা, পচা-গলা খাবার ছাড়া গেরস্তের হাঁস-মুরগি বা কোনো কিছুর ক্ষতি করে না। স্থানীয়রা দেখলে তাদের খাবার দেয়।
প্রাণীসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গুইসাপ শান্ত স্বভাবের প্রাণী। এরা সাধারণত মাটির গর্ত, গাছের কোটর, পুরোনো দেওয়ালের ফাটল কিংবা পরিত্যক্ত ইটভাটায় বাস করে। প্রাণীটি দিবাচর, তাই দিনে শিকার করে এবং রাতে বিশ্রাম নেয়। সাধারণত বিষধর সাপ ও সাপের ডিম, মৃত মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, শামুক এবং পচা-গলা প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে।
বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরনের গুইসাপের দেখা মেলে। এর মধ্যে রামগদি বা কালো গুই আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম গুইসাপ। এটি দৈর্ঘ্যে ৮ থেকে ৯ ফুট এবং ওজন এক মণের মতো হতে পারে। এদের আলাদা করা কিছুটা কঠিন, তাই সব কটি প্রজাতিই মানুষের কাছে গুইসাপ নামে পরিচিত। এই প্রাণীটি এলাকাভেদে তারবেল, গুইল, ঘোড়েল ইত্যাদি নামেও পরিচিত। গুইসাপ অত্যন্ত উপকারী প্রাণী। গুইসাপ প্রাণীটি কমে যাওয়ার কারণে পরিবেশে ফসলের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড়, ইঁদুরের উৎপাত বাড়ার পাশাপাশি বিষাক্ত সাপের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া পচা-গলা প্রাণীদেহ খেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়া থেকেও রক্ষা করে।
বাজারের পরিচ্ছন্নকর্মী চন্দন জানান, বাজারের ময়লা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করি। গুইসাপগুলো ময়লা আবর্জনা খেয়ে আমার অনেকটা পরিশ্রম কমিয়ে দেয়।
বাজারের ব্যবসায়ী মিজান হাওলাদার জানান, গুইসাপগুলো কোথা থেকে কীভাবে এসেছে জানা নেই। তারা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। বরং বাজারে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এ কারণে কেউ তাদের তাড়িয়ে দেয় না, বরং নিরাপদে বসবাস করতে সহায়তা করছে। অচেনা কোনো মানুষ দেখলে ভয় পাবে। প্রথমে আমরাও ভয় পেলেও এখন আর দেখে কেউ ভয় পায় না। সবাই উপকারী বন্ধু মনে করে। অনেকেই তাদের খেতে দেয়। তারা তাদের মতো করে সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়।
বাজারের আরেক ব্যবসায়ী জিন্নাত আলী খান বলেন, দেখে মনে হয় একেকটির ওজন প্রকার ভেদে এক থেকে দেড় মণের মতো। বাজারে, ঝোপঝাড়ে ও প্রকাশ্যে বিচরণ তাদের। শুধু বাজার নয়, মাঝে মাঝে গুইসাপগুলো আশপাশের বাড়ির উঠানেও চলে আসে। তবে এগুলো সম্পূর্ণ নিরীহ প্রাণী। এখন পর্যন্ত কাউকে কামড়ানো বা কারো ক্ষতি করেছে শুনিনি। যার কারণে কারো মধ্যে তেমন ভয়ের সৃষ্টি করে না। বরং এলাকাবাসী তাদের উপস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, প্রায় দুই যুগ আগে দুই থেকে তিনটি গুইসাপ দেখা যায়। এখন এর সংখ্যা প্রায় ৫০-৬০টি। দেখতে বিশালাকৃতির। দেখে মনে হয় ৩০ থেকে ৪০ কেজির মতো ওজন হবে। ময়লা-আবর্জনা অর্থাৎ মানুষের ফেলে দেওয়া পচা-গলা খাবার খায়। তাদের সামনে দিয়ে হাঁস-মুরগি ঘুরে বেড়ালেও খায় না। যার কারণে মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠছে। প্রাণীগুলো অনেকটাই বিলুপ্তপ্রায়। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি প্রাণীগুলোর অবাধ বিচরণ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে তাদের টিকিয়ে রাখা। না হলে এক সময় প্রাণীগুলো হারিয়ে যাবে।
ফরিদপুর পরিবেশ উন্নয়ন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির জাগো নিউজকে বলেন, গুইসাপ প্রাণীটি মানুষের জন্য ক্ষতিকর না। এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এখন অনেকটাই বিলুপ্ত। এমন প্রাণীর উপস্থিতি একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্রেরই ইঙ্গিত বহন করে। তাই এই গুইসাপগুলোকে রক্ষা করা এবং তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সদরপুর উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা সব্যসাচী মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, সংখ্যায় ৫০টির মতো হবে। ৮-১০টি মিলে দলবদ্ধভাবে বিচরণ করতে দেখা যায়। এখানে তাদের পর্যাপ্ত খাবার থাকায় তারা এখান থেকে যায় না। আবার মানুষজন খাবার দেওয়ায় তাদেরসঙ্গে এক ধরনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। এদের সাপের মতো বিষ নেই। তবে এদের শরীরে ব্যাকটেরিয়া থাকায় যদি কাউকে কামড় বা লেজ দিয়ে আঘাত করে সেই স্থানে ইনফেকশন হতে পারে।
তিনি বলেন, ধানক্ষেতের ইঁদুর ও ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে বলে গুইসাপকে কৃষকের বন্ধুও বলা হয়। এরা সাঁতারেও অত্যন্ত দক্ষ। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জলাভূমির আশপাশে এদের আবাসস্থল দেখা যায়। তবে এগুলোর কোনো সমস্যা হলে আমরা চিকিৎসা দিতে পারি, কিন্তু সংরক্ষণের দায়িত্ব বন বিভাগের।
ফরিদপুরে সহকারী বন সংরক্ষক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তাওহীদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বিষয়টি জানতে পেরেছি। আমরা আজই সরেজমিনে গিয়ে দেখবো। তারপর প্রাণীগুলোকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায় সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আকারে প্রস্তাবনা পাঠানো হবে।
সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শরিফ শাওন জাগো নিউজকে বলেন, প্রাণীগুলো যাতে তাদের মতো করে বেঁচে থাকতে পারে, কেউ যাতে তাদের ক্ষতি করতে না পারে সে বিষয়ে খেয়াল রাখা হবে।
এফএ/জেআইএম
What's Your Reaction?