বাবা: দি বস
অভিলাষ মাহমুদ বাবাকে নিয়ে কখনো বাবা দিবস পালন করা হয়নি। কোনো দিন সামনাসামনি গিয়ে বলতে পারিনি, ‘বাবা আজ বাবা দিবস। চলো, আজকের দিনটা তোমাকে নিয়ে উদযাপন করি।’ আমাদের প্রজন্মের অনেক সন্তানের মতো আমিও হয়তো বাবার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করেছি, কিন্তু তা প্রকাশ করতে শিখিনি। ছোটবেলা থেকে দেখেছি বাবা খুব পরিশ্রমী মানুষ। আমি আমার দাদাকে দেখিনি। তবে পরিবারের মুখে শুনেছি সংগ্রামের গল্প। আজানের পর ভোরের অন্ধকারে বাবা কর্ণফুলীর চরে ঘাস কাটতে যেতেন। শুধু আমাদের গরুর জন্য নয়, আরেক আত্মীয়ের গরুর জন্যও ঘাস সংগ্রহ করতেন। ঘাস কেটে ঘরে ফিরেই আবার কাজে চলে যেতেন। সংসারের দায়িত্ব যেন তার কাঁধে চিরকালীন এক অঙ্গীকার হয়ে ছিল। আমাদের দাদিও ছিলেন অসাধারণ সাহসী ও কর্মঠ একজন নারী। বাবার মুখে শোনা একটি ঘটনা আজও মনে গেঁথে আছে। একদিন মাগরিবের সময় আমার এক ফুফি খালের পাড়ে গিয়েছিলেন । হঠাৎ তার চিৎকার শুনে দাদি দা হাতে জঙ্গলের ভেতর ছুটে যান। পেরতী (কোনো খারাপ অশরীরী শক্তি) তাকে তাকে নিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু দাদির সাহসের কাছে কোনো ভয় টিকতে পারেনি। তিনি মেয়েকে উদ্ধার করে ঘরে ফিরিয়ে আনেন। আরও পড়ুন বাবা দিবসের খেরোখাতা সে
অভিলাষ মাহমুদ
বাবাকে নিয়ে কখনো বাবা দিবস পালন করা হয়নি। কোনো দিন সামনাসামনি গিয়ে বলতে পারিনি, ‘বাবা আজ বাবা দিবস। চলো, আজকের দিনটা তোমাকে নিয়ে উদযাপন করি।’
আমাদের প্রজন্মের অনেক সন্তানের মতো আমিও হয়তো বাবার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করেছি, কিন্তু তা প্রকাশ করতে শিখিনি। ছোটবেলা থেকে দেখেছি বাবা খুব পরিশ্রমী মানুষ। আমি আমার দাদাকে দেখিনি। তবে পরিবারের মুখে শুনেছি সংগ্রামের গল্প। আজানের পর ভোরের অন্ধকারে বাবা কর্ণফুলীর চরে ঘাস কাটতে যেতেন। শুধু আমাদের গরুর জন্য নয়, আরেক আত্মীয়ের গরুর জন্যও ঘাস সংগ্রহ করতেন। ঘাস কেটে ঘরে ফিরেই আবার কাজে চলে যেতেন। সংসারের দায়িত্ব যেন তার কাঁধে চিরকালীন এক অঙ্গীকার হয়ে ছিল।
আমাদের দাদিও ছিলেন অসাধারণ সাহসী ও কর্মঠ একজন নারী। বাবার মুখে শোনা একটি ঘটনা আজও মনে গেঁথে আছে। একদিন মাগরিবের সময় আমার এক ফুফি খালের পাড়ে গিয়েছিলেন । হঠাৎ তার চিৎকার শুনে দাদি দা হাতে জঙ্গলের ভেতর ছুটে যান। পেরতী (কোনো খারাপ অশরীরী শক্তি) তাকে তাকে নিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু দাদির সাহসের কাছে কোনো ভয় টিকতে পারেনি। তিনি মেয়েকে উদ্ধার করে ঘরে ফিরিয়ে আনেন।

বাবা দিবসের খেরোখাতা
সেই সাহসী দাদা-দাদির মেঝো সন্তান আমার বাবা। জেনেটিকলি তাদের কাছ থেকেই তিনি সাহস, পরিশ্রম আর দায়িত্ববোধ উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছিলেন। আজ সেই বাবাই বার্ধক্যের নানা রোগে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। যার কাঁধে ভর করে আমরা বড় হয়েছি, তার হাঁটাচলাতেই এখন ক্লান্তির ছাপ। বয়সের ভার তো আছেই, তার ওপর মায়ের চলে যাওয়ার শোক বাবাকে যেন আরও ভেঙে দিয়েছে।
আমার একটি ছোট্ট ইচ্ছা ছিল। মাকে প্রায়ই বলতাম, ‘পরেরবার বাবা দিবস পালন করবো আমরা। বাবাকে আগে থেকে কিছু জানাবো না। হঠাৎ করে সবাই মিলে তাকে চমকে দেবো।’ মা হাসতেন। আমিও ভাবতাম, এবার না হয় পরেরবার। সময় তো আছেই।
মনে মনে আরও একটি স্বপ্ন ছিল। বাবা দিবস পালন করতে পারলে পরে একদিন মা দিবসও পালন করবো। পুরো পরিবারকে নিয়ে দুজনকে পাশে বসিয়ে কিছু আনন্দের মুহূর্ত উপহার দেবো। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, ভাগ্যে লিখা ছিল আরেক। এবার বাবা দিবস আসার আগেই আমরা মাকে হারিয়ে ফেলেছি। যে মানুষটিকে পাশে রেখে এসব পরিকল্পনা করতাম, তিনি আজ আর নেই। তাই এবার বাবা দিবস এলেও সেই স্বপ্ন আর পূরণ হবে না।
আমরা তিন ভাই ও এক বোন। আমি বড়। ভাইবোনদের মধ্যে ছোট ভাই মামুনকে সবার আগে বিয়ে দিয়েছি। এখন সেও একজন বাবা। তাকে দেখে মাঝে মাঝে ভাবি, একজন সন্তানের বাবা হওয়া সহজ, কিন্তু একজন দায়িত্বশীল বাবা হওয়া অনেক বড় ব্যাপার। সময়ই তার উত্তর দেবে।
আমাদের তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন শারমিন। মা বেঁচে থাকতে সে সবসময় মায়ের কাছাকাছি থাকতো। সংসারের নানা কাজে, সুখে-দুঃখে, অসুস্থতায় মায়ের ছায়ার মতো পাশে ছিল। অবশ্য তখনো যে বাবার খোঁজ রাখতো না, তা নয়। বাবার প্রয়োজনেও সে সবসময় এগিয়ে আসতো।
কিন্তু মাকে হারানোর পর যেন তার জীবনের অনেক কিছু বদলে গেছে। এখনো ‘আম্মু, আম্মু’ বলে কাঁদতে থাকে। মায়ের অনুপস্থিতি সে এখনো মেনে নিতে পারে না। সেই শূন্যতার মাঝেই বাবার পাশে সবচেয়ে বেশি সময় কাটাচ্ছে সে। বাবার ওষুধ, খাওয়া, বিশ্রাম, প্রয়োজনীয় কাজকর্ম, সবকিছু নিয়েই তার চিন্তা।

প্রথম বাবা দিবসের আয়োজন কেমন ছিল
একসময় আমাদের কাছে বাবা আর মা ছিলেন দুটি আলাদা আশ্রয়। এখন মা বলতে স্মৃতি, ছবি আর দোয়া। আর বাবা বলতে আমাদের সামনে বসে থাকা সেই মানুষটি, যিনি নিজের শোক বুকে চেপে এখনো আমাদের জন্য বেঁচে আছেন। তাই আজ বাবা ডাকলেই শুধু বাবাকে নয়, তার ভেতর যেন মায়ের ছায়াকেও খুঁজে পাই। বাবা-মা বলতে এখন আমাদের কাছে একজনই মানুষ, আমাদের বাবা।
আমি নিজেও দেরিতে বিয়ে করেছি। কখনো কখনো মনে হয়, ছোট ভাইয়ের বয়সে যদি আমার বিয়ে হতো, তাহলে হয়তো আজ আমার সন্তানও অনেক বড় হয়ে যেত। কিন্তু মানুষের জীবনের সময়সূচি মানুষ নিজে তৈরি করতে পারে না। আল্লাহই ভালো জানেন কার জীবনে কী লেখা আছে।
মাকে হারানোর পর থেকে অনেক কিছুই আগের মতো লাগে না। পরিবারের হাসি কমে গেছে, কথাবার্তা কমে গেছে, উৎসবের রং ফিকে হয়ে গেছে। মনে হয়, আমাদের পুরো পরিবারটাই যেন কোথাও ভেঙে গেছে। ঘর আছে, মানুষ আছে, কিন্তু সেই আগের উষ্ণতা নেই।
তবুও বাবার দিকে তাকালে মনে হয়, আমাদের শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। কারণ তিনি এখনও আছেন। তার জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ আর ভালোবাসার ঋণ কোনো দিন শোধ হবে না। আজ শুধু একটি কথাই বলতে ইচ্ছে করে-বাবা, তোমাকে কখনো ঠিকমতো বলা হয়নি, কতটা ভালোবাসি। আর মা, তোমাকেও বলা হয়নি, তোমাকে ছাড়া সংসারটা এতটা শূন্য হয়ে যাবে। আল্লাহ আমার মাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন এবং আমার বাবাকে সুস্থতা, ধৈর্য ও শান্তি দান করুন।
আমিন।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও গাল্পিক
কেএসকে
What's Your Reaction?