বিক্রি হয়েছে ৫৬ মণের সেই ‘কালো মানিক’, খাওয়ানো হবে এতিমদের

টাঙ্গাইলের খামারি হামিদা আক্তার (২৯)। দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে পরম মমতায় সন্তানের মতো লালন-পালন করেছিলেন সাদা-কালো রঙের একটি ষাঁড়। প্রায় ৫৬ মণ ওজনের ষাঁড়টির শখ করে নাম রাখেন ‌‘মানিক’। প্রত্যাশা ছিল গতবারের ঈদে কাঙ্ক্ষিত দামে বিক্রি করবেন। একজন ১৫ লাখ টাকা দামও বলেছিলেন। কিন্তু দামদাতা আর না আসায় সেবার গরু বেচাকেনা হয়নি। তাই অনেক কষ্টে ধারদেনা করে মানিককে আরও এক বছর লালন-পালন করেন তিনি। ইচ্ছা ছিল এবারের ঈদে বিক্রি করবেন। এবারও একজন ১৮ লাখ টাকা দাম মিটিয়ে চলে যান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে! ঈদের সময় ঘনিয়ে এলেও সেই ক্রেতা আর ফিরে আসেননি। এতেই ভালোবাসার মানিক হামিদার জীবনের সবচেয়ে বড় ‘গলার কাঁটা’য় পরিণত হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশালদেহী গরুটির ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে ভাইরাল হয়েছেন। কুড়িয়েছেন লাইক-ভিউ। উপার্জন করেছেন টাকা। কিন্তু ক্যামেরার পেছনের সেই অসহায় হামিদা আক্তারের কাঁন্না আর চরম দুর্দিনের গল্পটা বোঝার বা তার পাশে এসে দাঁড়ানোর ন্যূনতম মানবিকতা দেখাননি কেউ। অবশেষে হামিদার পাশে দাঁড়িয়েছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাসিন্দা আলাউদ্দিন আহমেদ। তার প্রতিষ্ঠিত ‘আলাউদ্দিন আহম

বিক্রি হয়েছে ৫৬ মণের সেই ‘কালো মানিক’, খাওয়ানো হবে এতিমদের

টাঙ্গাইলের খামারি হামিদা আক্তার (২৯)। দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে পরম মমতায় সন্তানের মতো লালন-পালন করেছিলেন সাদা-কালো রঙের একটি ষাঁড়। প্রায় ৫৬ মণ ওজনের ষাঁড়টির শখ করে নাম রাখেন ‌‘মানিক’। প্রত্যাশা ছিল গতবারের ঈদে কাঙ্ক্ষিত দামে বিক্রি করবেন। একজন ১৫ লাখ টাকা দামও বলেছিলেন। কিন্তু দামদাতা আর না আসায় সেবার গরু বেচাকেনা হয়নি।

তাই অনেক কষ্টে ধারদেনা করে মানিককে আরও এক বছর লালন-পালন করেন তিনি। ইচ্ছা ছিল এবারের ঈদে বিক্রি করবেন। এবারও একজন ১৮ লাখ টাকা দাম মিটিয়ে চলে যান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে! ঈদের সময় ঘনিয়ে এলেও সেই ক্রেতা আর ফিরে আসেননি। এতেই ভালোবাসার মানিক হামিদার জীবনের সবচেয়ে বড় ‘গলার কাঁটা’য় পরিণত হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশালদেহী গরুটির ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে ভাইরাল হয়েছেন। কুড়িয়েছেন লাইক-ভিউ। উপার্জন করেছেন টাকা। কিন্তু ক্যামেরার পেছনের সেই অসহায় হামিদা আক্তারের কাঁন্না আর চরম দুর্দিনের গল্পটা বোঝার বা তার পাশে এসে দাঁড়ানোর ন্যূনতম মানবিকতা দেখাননি কেউ।

অবশেষে হামিদার পাশে দাঁড়িয়েছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর বাসিন্দা আলাউদ্দিন আহমেদ। তার প্রতিষ্ঠিত ‘আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন’-এর পক্ষ থেকে গরুটি কিনে নিয়েছে। এতে হামিদার মুখে ফুটেছে হাসি।

খামারি হামিদা টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার ভেঙ্গুলার গ্রামের আব্দুল হামিদের মেয়ে। ‘মানিক’ নামের ষাঁড়টি বর্তমানে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর নন্দলালপুর ইউনিয়নের আলাউদ্দিন নগরের আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশনের খামারে যত্নসহকারে লালন-পালন করা হচ্ছে। আসন্ন ঈদের তৃতীয় দিন ষাঁড়টিকে জবাই করে এতিম, দুস্থ ও অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হবে।

বুধবার (২৭ মে) সকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, টিনশেডের পাকা ঘরে রাখা হয়েছে সাদা-কালো রঙের মানিককে। মাথার ওপরে ঘুরছে ফ্যান। উৎসুক কেউ কেউ গরুটি দেখতে এসেছেন।

বিক্রি হয়েছে ৫৬ মণের সেই ‘কালো মানিক’, খাওয়ানো হবে এতিমদের

খামারটির কর্মচারী রেহেনা বেগম বলেন, ‘বিশাল দেহের গরু মানিককে সোমবার (২৫ মে) টাঙ্গাইল থেকে আনা হয়েছে। তাকে উন্নতমানের খাবার দিয়ে যত্ন করা হচ্ছে। ঈদের পর রান্না করে এতিমদের খাওয়ানো হবে।’

এ বিষয়ে গরুটির লালন-পালনকারী হামিদা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার এতটুকুই লাভ হয়েছে যে আমি কিছু ঋণ শোধ করতে পারছি। তারপরও আলহামদুলিল্লাহ। সবসময় ইচ্ছা ছিল ভালো একটা লোক পাইলে তার কাছে বিক্রি করবো মানিকরে। তাতে লস-লাভ দুই টাকা কম বেশি হোক। তবুও কোনো ব্যাপারী কিংবা কসাইয়ের কাছে মানিকরে বেচবো না। ভালো লোকের কাছে বিক্রি করতে পেরে আমি খুব খুশি।’

প্রায় ১৩ মিনিটের আলাপকালে তিনি বলেন, ‘দুই বছর আগে দুই হাজার ৮০ কেজি ওজন ছিল। বর্তমান মাপ জানা নেই। গতবছর একজন ১৫ লাখ আর এবছর একজন ১৮ লাখ টাকা দাম মিটিয়ে চলে গিয়ে আর ফেরেননি। ২০ লাখ টাকায় ষাঁড়টি বিক্রির ইচ্ছা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বড় গরু কেনার লোক নেই। আবার আরেক বছর পালন করার টাকাও নেই। তাই ১১ লাখ ২০ হাজার টাকায় একজন ভালো মানুষের কাছে বিক্রি করেছি। এতেই খুশি।’

লাভ-লস প্রসঙ্গে হামিদা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘১০ বছর ধইরা পালন করতেছি। আর এখানে যে খাবার খাওয়াছি, খরচের অর্ধেক টাকার চালান উঠে নাই। কষ্ট পরিশ্রম, রাতজাগা এসব তো বাদই। প্রতিদিন ১০ হালি করে বিচি কলা খায়। চার কেজি করে বুট খায়। ভূসি যতটুকু পারে আর এককেজি আতপ চালের ভাত খায়। অনেক টাকা ধারদেনা। তাই বিক্রি করে ঋণ শোধ দিছি। এখনো ঋণ আছে চার লাখ ৮০ হাজার টাকা।’

২০২৪ সালে স্নাতক পড়ার সময় হামিদার মা মারা যান। এখন পরিবারে ছোট বোন আর বৃদ্ধ বাবা। বর্তমানে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন এই খামারি। বিকাশের দোকানের পাশাপাশি বাড়ির খামার দেখাশোনা করছেন।

হামিদা আক্তার বলেন, ‘ইচ্ছা একটা খামার করবো। আর লাভের টাকায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবো। ১৫ লাখ চাইছিলাম। তবে ক্রেতা পাবোনা বলে এই দামে (১১ লাখ ২০ হাজার) বিক্রি করেছি। তবুও আলহামদুলিল্লাহ। দোয়া করবেন। খামারে আরও ১০টি গরু আছে। এখানে যেন ভালো লাভ হয়।’

আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক মোর্শেদ আলম বলেন, ‘অনলাইনে নারী উদ্যোক্তা হামিদার অসহায়ত্ব প্রকাশ পেলে তার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসেন সারথি হন দানবীর আলাউদ্দিন আহমেদ। বছরের পর বছর বুকে পাথর চেপে রাখা যে মানুষগুলোর পাতে এক টুকরো ভালো খাবার জোটেনি, সেই মলিন মুখগুলোতে একটুখানি পরম তৃপ্তির হাসি ফোটাতে ঈদের তৃতীয় দিন গরুটিকে রান্না করে খাওয়ানো হবে।’

আল-মামুন সাগর/এসআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow