বিতর্কিত তিন নির্বাচন নিয়ে কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে

তিনটি জাতীয় নির্বাচনের (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে গঠিত তদন্ত কমিশন সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে সভাপতি করে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিশন ৩২৬ পৃষ্ঠার ২১টি অধ্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ের আলোকপাত করা হয়। যেসব বিষয় আলোকপাত করা হয় তার মধ্যে রয়েছে- কারসাজির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ, নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, নির্বাচনি আইন পরিবর্তন, ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, গাইবান্ধা উপ-নির্বাচন বাতিল এবং পুনঃনির্বাচন, ভোটকেন্দ্র প্রণয়নের দায়িত্ব প্রশাসনের হাতে অর্পণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা, সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন, ২০১৮ সালের রাতের ভোট, ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচন, ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটি ও তাদের কার্যক্রম, নির্বাচনি অনিয়ম ও অভিযোগ, ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনও একতরফা নির্বাচনের অনিয়ম, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম ও অভিযোগ, ২০২

বিতর্কিত তিন নির্বাচন নিয়ে কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে

তিনটি জাতীয় নির্বাচনের (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে গঠিত তদন্ত কমিশন সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে সভাপতি করে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিশন ৩২৬ পৃষ্ঠার ২১টি অধ্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ের আলোকপাত করা হয়।

যেসব বিষয় আলোকপাত করা হয় তার মধ্যে রয়েছে- কারসাজির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ, নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, নির্বাচনি আইন পরিবর্তন, ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন, গাইবান্ধা উপ-নির্বাচন বাতিল এবং পুনঃনির্বাচন, ভোটকেন্দ্র প্রণয়নের দায়িত্ব প্রশাসনের হাতে অর্পণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা, সরকার ও প্রশাসনের ভূমিকা, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন, ২০১৮ সালের রাতের ভোট, ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচন, ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটি ও তাদের কার্যক্রম, নির্বাচনি অনিয়ম ও অভিযোগ, ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনও একতরফা নির্বাচনের অনিয়ম, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম ও অভিযোগ, ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম ও অভিযোগ, ভোট প্রদানের হার, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, সাংবাদিক নীতিমালা, জনমত জরিপের ফলাফল, সুপারিশমালা ও সাধারণ ভোটারদের কাছ থেকে প্রাপ্ত কিছু নির্বাচনি অভিযোগ ও পরামর্শ।

তদন্ত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে যা বলা হয়েছে

২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবিশষ্ট ১৪৭টিতে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতার’ নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন
একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ২১৩ কেন্দ্রে শতভাগ ভোট, সব যায় নৌকার বাক্সে
ভোট দেননি ৮০ শতাংশের বেশি ভোটার, ‘আগেই হয়ে যায়’ অর্ধেকের ভোট

২০১৪ সালের নির্বাচন সারাবিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার মিশন গ্রহণ করে। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধীদল তাদের এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০১৮ সালে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করে রাখা হয়। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়।

২০২৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধীদল নির্বাচনে অংশ না দেওয়ায় ‘ডামি’ প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনকে
‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার অপকৌশল গ্রহণ করা হয়।

তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয় যা নির্বাচন সেল নামে পরিচিত লাভ করে।

২০১৪-২০২৪ পর্যন্ত সময়কালে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে উঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।

তিনটি সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনি অনিয়মে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী যুক্ত থাকায় এবং তদন্ত
কমিশনের জন্য বরাদ্দকৃত সময় অপ্রতুল হওয়ায় সুনির্দিষ্টভাবে এদের নাম ও কার কী ভূমিকা ছিল তা বের করা সম্ভব হয়নি।

নির্বাচনগুলোতে যেসব কর্মকাণ্ড নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে তার একটি তালিকাও প্রণয়ন করা হয়। তালিকায় যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয় তা হলো: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণ ও নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং সশস্ত্র বাহিনীর মনোনীত একটি অংশকে ব্যবহার, বিরোধী প্রার্থী ও কর্মীদের নামে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের, বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের অজামিনযোগ্য মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার ও গুম, জাল ভোট প্রদান, নির্বাচনি কারচুপিতে নির্বাহী বিভাগকে ব্যবহার, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের প্রবেশে বাধা, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সংসদীয় সীমানা নির্ধারণ, আগে থেকেই ব্যালট বাক্সে ভোট ভরে রাখা, প্রদানের হারে পরিবর্তন, ভোটকেন্দ্রে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ, একতরফাভাবে সরকারের আজ্ঞাবহ প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগ, প্রার্থীদের ভয়ভীতি, প্রলোভন দেখিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার, নির্বাচনের পরে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি পরিসংখ্যান প্রকাশ না করা, নির্বাচনের পরে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য ধ্বংস করা, নির্বাচনি অভিযোগ সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে তদন্ত না করা, নির্বাচনে ডামি প্রার্থী দাঁড় করানো, বিরোধী রাজনৈতিক দলে ভাঙনের চেষ্টা, নির্বাচনি পর্যবেক্ষণ নিবন্ধনে পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনে বৈষম্য এবং নির্বাচনের নামে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়।

এমইউ/ইএ/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow