বিদেশি ডিগ্রির দাম কমছে চীনে, বাড়ছে দেশে পড়ার আগ্রহ
একসময় চীনের কোনো পরিবারে সন্তান বিদেশে পড়তে যাচ্ছে—এমন খবর ছিল অত্যন্ত গর্বের। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা মানে ছিল নতুন পৃথিবী দেখা। নতুন দক্ষতা অর্জন। আর দেশে ফিরে ভালো চাকরির সম্ভাবনা। কিন্তু সেই ধারণায় এখন বড় পরিবর্তন এসেছে। বেইজিংয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে পরামর্শ দেন ইয়াং ফান। ১৫ বছর আগে তিনি যখন এ পেশায় আসেন, তখন বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের আলাদা মর্যাদা ছিল। এখন বাবা-মায়ের প্রশ্ন অন্য রকম। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি খারাপ না হয়, তাহলে এত টাকা খরচ করে সন্তানকে বিদেশে পাঠানোর প্রয়োজন কী? আরও পড়ুন চীনে ‘ফুল ফ্রি স্কলারশিপে’ উচ্চশিক্ষা: বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন দিগন্ত চীনের তরুণদের বিদেশে পড়তে যাওয়ার পরিসংখ্যানেও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। চীনা শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়া কমছে কেন? চীন বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যত বেশি যুক্ত হয়েছে, বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও তত বেড়েছে। বিশেষ করে, ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের পর দেশটির রপ্তানি দ্রুত বাড়ে। সঙ্গে বাড়তে থাকে বিদেশে পড়তে যাওয়া চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। শুরুর দিকে মূলত মেধাব
একসময় চীনের কোনো পরিবারে সন্তান বিদেশে পড়তে যাচ্ছে—এমন খবর ছিল অত্যন্ত গর্বের। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা মানে ছিল নতুন পৃথিবী দেখা। নতুন দক্ষতা অর্জন। আর দেশে ফিরে ভালো চাকরির সম্ভাবনা। কিন্তু সেই ধারণায় এখন বড় পরিবর্তন এসেছে।
বেইজিংয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে পরামর্শ দেন ইয়াং ফান। ১৫ বছর আগে তিনি যখন এ পেশায় আসেন, তখন বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের আলাদা মর্যাদা ছিল।
এখন বাবা-মায়ের প্রশ্ন অন্য রকম। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি খারাপ না হয়, তাহলে এত টাকা খরচ করে সন্তানকে বিদেশে পাঠানোর প্রয়োজন কী?
চীনের তরুণদের বিদেশে পড়তে যাওয়ার পরিসংখ্যানেও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
চীনা শিক্ষার্থীদের বিদেশে যাওয়া কমছে কেন?
চীন বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যত বেশি যুক্ত হয়েছে, বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও তত বেড়েছে। বিশেষ করে, ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের পর দেশটির রপ্তানি দ্রুত বাড়ে। সঙ্গে বাড়তে থাকে বিদেশে পড়তে যাওয়া চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও।
শুরুর দিকে মূলত মেধাবী ও তুলনামূলক সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরাই বিদেশে যেতেন। তাদের অনেকে বিদেশে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। আর যারা চীনে ফিরেছেন, তারাও পেয়েছেন ভালো চাকরি ও সামাজিক মর্যাদা।
পরবর্তী সময়ে চীনে মানুষের আয় বাড়তে থাকে। ফলে আরও বেশি তরুণ পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেতে শুরু করেন।
কিন্তু ২০১৯ সালের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। করোনা মহামারি, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিদেশে পড়াশোনার পথকে কঠিন করে তুলেছে।
২০২৫ সালে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার চীনা তরুণ বিদেশে পড়তে গেছেন। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় সাত লাখ। অর্থাৎ ছয় বছরের ব্যবধানে বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০২৫ সালে বিদেশে পড়তে যাওয়া চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০১৬ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন।
ভিসা ও অভিবাসননীতিও বড় বাধা
কিছু দেশে চীনা শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে পড়াশোনার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চীনা শিক্ষার্থীদের ভিসা কঠোরভাবে বাতিল করার কথা জানিয়েছিল। বিশেষ করে কিছু ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষে দক্ষ কর্মীদের থেকে যাওয়ার অন্যতম পথ এইচ-১বি ভিসা। সেই ভিসার ক্ষেত্রেও বেতনকে গুরুত্ব দেওয়ার নীতি নেওয়া হয়েছে।
এতে নতুন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে থেকে কাজ করার সুযোগ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
২৫ বছর বয়সী চীনা তরুণী হাওয়ের অভিজ্ঞতা এর জ্বলন্ত উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্টার্টআপে কাজ করছিলেন তিনি। কিন্তু ভিসার জটিলতার কারণে চাকরি পরিবর্তনের সুযোগ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ায় সম্প্রতি চীনে ফিরে গেছেন।
বিদেশে পড়ার খরচ বেড়েছে
বিদেশে উচ্চশিক্ষার আগ্রহ কমার আরেকটি বড় কারণ খরচ।
চীনের বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিউ ওরিয়েন্টালের এক জরিপ অনুযায়ী, চলতি বছর বিদেশে পড়াশোনার গড় খরচ প্রায় ৬ লাখ ৫০০০ ইউয়ান (১ কোটি ১০ লাখ টাকা প্রায়)। ২০২৩ সালের তুলনায় এই খরচ প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বেশি।
অন্যদিকে, চীনের দুর্বল অর্থনীতির কারণে পরিবারগুলোও ব্যয়ের বিষয়ে বেশি সতর্ক হয়েছে। ফলে বিদেশে যেতে চাওয়া শিক্ষার্থীরাও এখন খরচের সঙ্গে সম্ভাব্য লাভের হিসাব কষছেন।
যেসব দেশে তুলনামূলক কম খরচে ভালো শিক্ষা পাওয়া যায়, সেসব দেশ তাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
হংকং, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ছে আগ্রহ
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। অন্যদিকে হংকং, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ায় তাদের সংখ্যা বাড়ছে।
বেইজিংয়ের শিক্ষা পরামর্শক ইয়াং ফানের কাছে হংকং এখন অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। তার অনেক গ্রাহক হংকংয়ে পড়াশোনার বিষয়ে খোঁজ নেন।
এর কারণও স্পষ্ট। হংকংয়ের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র্যাংকিং ভালো। চীনের মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি হওয়ায় যাতায়াতও সহজ।
এ ছাড়া মালয়েশিয়ার মতো তুলনামূলক কম খরচের দেশও শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করছে। সেখানে একটি ডিগ্রি অর্জনে প্রায় এক লাখ ইউয়ানের বাজেটেই কাজ চালানো সম্ভব।
বিদেশে গেলেও ফিরছেন চীনে
শুধু বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে না। যারা যাচ্ছেন, তাদের বড় অংশই পড়াশোনা শেষে চীনে ফেরত যাচ্ছেন। বিদেশফেরত এসব শিক্ষার্থীকে চীনে ‘হাইগুই’ বলা হয়।
২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ৯৪ শতাংশই পড়াশোনা শেষে চীনে ফিরেছেন। এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ হার।
২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৫২ লাখ হাইগুই শিক্ষার্থী চীনে ফিরেছেন বলে সরকারি পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে বিদেশি ডিগ্রির সামাজিক মর্যাদাও আগের মতো নেই।
চাকরির বাজারে যেমন বিদেশি ডিগ্রির বাড়তি সুবিধা কমেছে, তেমনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিদেশে পড়াশোনা আগের মতো বড় আকর্ষণ নয়।
বিদেশি ডিগ্রিতে চাকরির সুবিধা কমছে
নিউ ওরিয়েন্টালের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশফেরত একজন শিক্ষার্থীর গড় প্রারম্ভিক মাসিক বেতন প্রায় ১২ হাজার ৮০০ ইউয়ান (২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা প্রায়)। চীনের স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই গড় বেতন প্রায় ১০ হাজার ৭০০ ইউয়ান (১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা প্রায়)। অর্থাৎ পার্থক্য খুব বেশি নয়।
অনেক বিদেশফেরত শিক্ষার্থী এর চেয়েও কম বেতনের চাকরি করছেন। কারও কারও আবার জীবিকা চালাতে ডেলিভারি কর্মীর কাজও করতে হচ্ছে।
চীনের একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এক তরুণী জানান, তাকে বিদেশে পড়াতে পরিবার ২০ লাখ ইউয়ানের (৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা প্রায়) বেশি খরচ করেছিল। কিন্তু দেশে ফিরে তিনি যে চাকরি পান, তাতে মাসে বেতন ছিল মাত্র চার হাজার ইউয়ান (৭৩ হাজার টাকা প্রায়)।
এই আয় দিয়ে বিদেশে পড়াশোনার খরচ তুলতে তার ১০০ বছর লেগে যেতে পারে—আক্ষেপ করে বলেন তিনি।
চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ও এখন আকর্ষণীয়
অন্যদিকে চীনের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে দ্রুত ওপরে উঠছে।
কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়ে পেকিং বিশ্ববিদ্যালয় ও সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান যথাক্রমে ১৩ ও ১৪।
‘৯৮৫’ ও ‘২১১’ নামে পরিচিত চীনের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এখন অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে শক্তিশালী মনে করা হয়।
অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও যুক্তরাষ্ট্রের আইভি লিগের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো চীনা শিক্ষার্থীদের কাছে আলাদা মর্যাদা রাখে। তবে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের মতো ক্ষেত্রে চীনের গবেষণাও এখন আন্তর্জাতিকভাবে শক্তিশালী।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো খরচ। চীনের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার বার্ষিক টিউশন ফি সাধারণত কয়েক হাজার ইউয়ান। বিদেশে পড়াশোনার লাখ লাখ ইউয়ানের খরচের তুলনায় যা অনেক কম।
চীনা শিক্ষার্থী কমায় বিপাকে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়
চীনা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছে কিছু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশেষ করে, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় চীনা শিক্ষার্থীদের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাজ্যের ২৪টি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠন রাসেল গ্রুপে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে চীনাদের অংশ ছিল দুই-পঞ্চমাংশের বেশি।
চীনা শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নতুন স্নাতকোত্তর কোর্স চালু করেছিল। বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হতো স্থানীয় শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি ফি।
ফলে শিক্ষক নিয়োগ, নতুন ভবন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধায়ও বিনিয়োগ করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
লন্ডনের সিটি সেন্ট জর্জেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলিপ্পো বোয়েরির ভাষায়, তখন আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি ‘ভ্রম’ তৈরি হয়েছিল।
এখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেউ কেউ কোর্স বন্ধ করছে। কেউ কর্মী ছাঁটাই করছে। কেউ আবার স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দিচ্ছে।
বিদেশে যাওয়া কমলে ক্ষতি চীনেরও
চীনা শিক্ষার্থীদের বিদেশযাত্রা কমে যাওয়া শুধু পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যই সমস্যা নয়। এর প্রভাব চীনের ওপরও পড়তে পারে।
চীন যখন বিশ্বের জন্য তার দরজা খুলতে শুরু করেছিল, বিদেশফেরত শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা। চীনের আধুনিকায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর বর্তমান ২১ সদস্যের মধ্যে আটজনই বিদেশে পড়াশোনা করেছেন। বিদেশে পাওয়া অভিজ্ঞতা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিদেশের বাজারে প্রবেশে সহায়তা করেছে।
কিন্তু বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা যদি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, তাহলে সেই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান চীনের ভেতরে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগও কমবে।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/
What's Your Reaction?








