বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের জীবনে দরিদ্রতা
আজীবন দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে যাওয়া কবির নাম কাজী নজরুল ইসলাম। ‘দুখু মিয়া’ ডাকনামেই যাঁর শৈশব শুরু হয়েছিল। তাই তো আমৃত্যু দুঃখের সঙ্গেই করতে হয়েছে ঘর-গেরস্থালি। কেননা কবি নজরুলের বাবা কাজী ফকির আহমেদ গ্রামের মসজিদের একজন ইমাম ছিলেন। মায়ের নাম ছিল জাহেদা খাতুন। ফলে অভাবের সংসারেই কাজী নজরুলের জন্ম—এ কথা সহজেই বলা যায়। আর এরই মধ্যদিয়ে গ্রামের মক্তবে কাজী নজরুলের পড়াশোনা শুরু হয়। মাত্র ৯ বছর বয়সে তাঁর একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা মারা যান। ফলে পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা আরও বাড়তে থাকে। এই সময় মক্তবের শিক্ষা শেষ করেন তিনি। দশ বছর বয়সেই নজরুলকে লেখাপড়া ছেড়ে আয়ের পথ খুঁজতে হয়। কারণ সংসার চালাতে হবে তাঁকেই। যে কারণে সেই মক্তবেই এবার ছাত্র পড়ানো শুরু করলেন। সেই সঙ্গে নিজ গ্রামে হাজী পালোয়ানের মাজারের খাদেম এবং মসজিদের মুয়াজ্জিন হলেন। তখন কতইবা ছিল বেতন। কোনো রকমে কেটে যেত জীবন। অভাবের সঙ্গে রোজ দেখা হয়। আরও ভালো কিছুর সন্ধান করতে থাকেন কবি। সে সময় কাজী নজরুলের এক চাচা ছিলেন লেটো দলের ওস্তাদ। লেটো দল হচ্ছে নাচ-গানের দল। যারা বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে, নাটক দেখিয়ে টাকা রোজগার করেন। কিন্তু কী করা
আজীবন দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে যাওয়া কবির নাম কাজী নজরুল ইসলাম। ‘দুখু মিয়া’ ডাকনামেই যাঁর শৈশব শুরু হয়েছিল। তাই তো আমৃত্যু দুঃখের সঙ্গেই করতে হয়েছে ঘর-গেরস্থালি। কেননা কবি নজরুলের বাবা কাজী ফকির আহমেদ গ্রামের মসজিদের একজন ইমাম ছিলেন। মায়ের নাম ছিল জাহেদা খাতুন। ফলে অভাবের সংসারেই কাজী নজরুলের জন্ম—এ কথা সহজেই বলা যায়। আর এরই মধ্যদিয়ে গ্রামের মক্তবে কাজী নজরুলের পড়াশোনা শুরু হয়। মাত্র ৯ বছর বয়সে তাঁর একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা মারা যান। ফলে পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা আরও বাড়তে থাকে। এই সময় মক্তবের শিক্ষা শেষ করেন তিনি।
দশ বছর বয়সেই নজরুলকে লেখাপড়া ছেড়ে আয়ের পথ খুঁজতে হয়। কারণ সংসার চালাতে হবে তাঁকেই। যে কারণে সেই মক্তবেই এবার ছাত্র পড়ানো শুরু করলেন। সেই সঙ্গে নিজ গ্রামে হাজী পালোয়ানের মাজারের খাদেম এবং মসজিদের মুয়াজ্জিন হলেন। তখন কতইবা ছিল বেতন। কোনো রকমে কেটে যেত জীবন। অভাবের সঙ্গে রোজ দেখা হয়। আরও ভালো কিছুর সন্ধান করতে থাকেন কবি। সে সময় কাজী নজরুলের এক চাচা ছিলেন লেটো দলের ওস্তাদ। লেটো দল হচ্ছে নাচ-গানের দল। যারা বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে, নাটক দেখিয়ে টাকা রোজগার করেন। কিন্তু কী করার? মক্তব-মসজিদ ছেড়ে তাকে যোগ দিতে হলো নাচ-গানের দলে। সংসার চালানোই তার কাছে মুখ্য হয়ে উঠলো।
তখন চাচার প্রভাবে দুখু মিয়া প্রবেশ করলেন সেই লেটো দলে। তবে এখানে তাঁর বেশ সুনাম হলো। শিল্প-সংস্কৃতির স্ফূরণ লক্ষ্য করা গেল। সৃজনশীল প্রতিভা প্রস্ফূটিত হতে থাকে। তাঁর লেখা ও সুর করা গানগুলো শ্রোতা-দর্শকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেতে থাকলো। দেখতে দেখতে কয়েক দিনের মধ্যেই লেটো দলের ওস্তাদ হয়ে গেলেন দুখু মিয়া ওরফে কাজী নজরুল। একইসঙ্গে সংসারের অভাব-অনটন দূর করার জন্য অর্থ রোজগার করতে হলেও তাঁর পড়াশোনার কিন্তু আগ্রহ কমেনি। তাঁর খুব ইচ্ছা তৈরি হলো স্কুলে পড়ার।
১৯১০ সালে কাজী নজরুল ইসলাম লেটো দল ছেড়ে দিলেন। ভর্তি হলেন স্কুলে। রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে পড়লেন কিছুদিন। তারপর ভর্তি হলেন মাথরুন হায়ার ইংলিশ স্কুলে। স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ অন্যরা তাঁকে বেশ পছন্দ করতেন। স্কুলে তিনি ছিলেন বেশ চটপটে। পড়াশোনায় ভালো করার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। কিন্তু দুখু মিয়ার তো দুঃখের আর শেষ নেই। একটার পার একটা দুঃখ এসে হাজির হতে থাকে। এবারের দুঃখ অর্থের অভাব। কেননা লেখাপড়া করার মতো টাকা কোথায় তার? ফলে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর আবার তাঁকে উপার্জনের জন্য কর্মে যোগ দিতে হলো।
এবার যোগ দিলেন বাসুদেবের কবিগানের দলে। কবিগানের দলে মুখে মুখে কবিতা বানিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের শোনাতে হয়। দুই দলের মধ্যে কবির লড়াইও চলে। কবিগানের দলে দুখু বেশ নাম করলেন। কবিতা বানাতে আর গান গাইতে তাঁর জুড়ি নেই। কিন্তু তাতেও তো সুরাহা হলো না। এ কাজে তেমন রোজগার নেই। নিজের পেট চালাতে হয়, সংসারেও টাকা পাঠাতে হয়। ফলে রেলওয়ের একজন গার্ডের খানসামা বা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে হলো কিছুদিন। এরপর সেই কাজ ছেড়ে আরেকটু বেশি বেতনের আশায় আসানসোলে চা-রুটির দোকানে রুটি বানানোর কাজ নিতে বাধ্য হলেন।
১৯১৪ সালে এই দোকানে কাজ করার সময় আসানসোলের দারোগা রফিকউল্লাহ তাঁকে দেখতে পেলেন। কাজী নজরুলের সঙ্গে আলাপ করলেন। তাঁর ছড়া-কবিতা শুনে রফিকউল্লাহ বুঝতে পারেন ছেলেটি প্রতিভাবান। তাই তিনি দুখুকে নিয়ে গেলেন ময়মনসিংহের ত্রিশালে। সেখানে দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দিলেন নজরুলকে। সেখানে তাঁর মন টিকলো না। ১৯১৫ সালে ফিরে গেলেন রানীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুলে। সেখানে আবার ভর্তি হলেন অষ্টম শ্রেণিতে। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত সেখানেই পড়াশোনা করেন। দেখতে দেখতে মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এলো। এখন তাঁর প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা দিতে হবে। তবে তার আগেই সুযোগ পেয়ে গেলেন সেনাবাহিনীতে। এবার বুঝি তাঁর রোজগারের ভাবনা ঘুচে গেলো। আর তখনই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়ে যুদ্ধে চলে গেলেন কাজী নজরুল ইসলাম।
দুখু মিয়া তাঁর পুরো শৈশব-কৈশোর দুঃখের সঙ্গে লড়াই করেছেন। তবে কখনোই হাল ছাড়েননি। এত দুর্দশার মধ্যেও কবিতা লেখা কখনো ছাড়েননি। পরের জীবনেও তাঁকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। সারাজীবনই আর্থিক দুর্দশা লেগেই ছিল। ফলে অনেকের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যও সহ্য করতে হয়েছে। অনাদর-অবহেলা মুখ বুজে হজম করেছেন। তবুও নিজেকে মহান করে গড়ে তুলেছেন। এ জন্যই হয়তো কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতার নাম ‘দারিদ্র্য’। কবিতাটি তাঁর ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত। কবিতাটি ১৩৩৩ অগ্রহায়ণের ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। পরে একই বছর মাঘ মাসের ‘সওগাত’ পত্রিকায় পুনরায় মুদ্রিত হয়েছিল। কবিতার শুরুতেই তিনি বলেছেন—
হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান!
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান
কণ্টক-মুকুট শোভা।—দিয়াছ তাপস,
অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;
উদ্ধৃত উলঙ্গ দৃষ্টি; বাণী ক্ষুরধার,
বীণা মোর শাপে তব হ’ল তরবার!
কবি কাজী নজরুল ইসলাম দারিদ্র্যের দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা সম্পর্কিত অনেক কবিতা-গান রচনা করেছেন। পাশাপাশি লিখেছেন প্রেম ও সৌন্দর্যের কবিতা। তিনি দারিদ্র্যপীড়িতদের নিয়ে কবিতা-গান লিখলেও দারিদ্র্যকে কখনো ‘মহান’ বলে মনে করেননি। মহিমান্বিতও করেননি কখনো। কবি নজরুলের ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটি পড়ে অনেকেই মনে করেন, কবি নজরুল দারিদ্র্যের বন্দনা গেয়েছেন হয়তো। দারিদ্র্যকে মহান বলেও অভিহিত করেছেন। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে উপলব্ধি করা যায়, নজরুল দারিদ্র্য কবিতায় দারিদ্র্যের বন্দনা গাননি। তিনি দারিদ্র্যকে মহান বলেননি। বরং বলেছেন, দারিদ্র্য কবিকেই মহান করেছে। দারিদ্র্য সহ্য করেও তিনি সম্মানিত হয়েছেন। দুরন্ত সাহস লাভ করেছেন। অর্থাৎ তিনি সর্বদা দারিদ্র্যকে জয় করতে চেয়েছেন। দারিদ্র্যকে উপেক্ষা করে আনন্দযজ্ঞ করেছেন।
আবার এই দারিদ্র্যের কারণেই তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে দারিদ্র্যের ক্ষুধাতুরের যন্ত্রণাকাতরতা উপলব্ধি করেছেন। ফলে কবি নজরুল বিদ্রোহী হয়েছেন, দরিদ্র ও দারিদ্র্য নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিত্তশালী শোষকদের বিরুদ্ধে কলমযুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। শৈশবকাল থেকেই জীবনের বৃহত্তর অংশ দারিদ্র্যের সঙ্গে কাটিয়েছেন। দারিদ্র্যের দুঃসহতা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন। ফলে তিনি হয়ে উঠেছেন মহান। মানবিক অনুভূতি তাঁকে বার বার নাড়া দিয়ে গেছে। যে কারণে কবি নজরুল উল্লেখ করেছেন ‘দরিদ্র মোর পরমাত্মীয়’। কবিতাটিতে তিনি লিখেছেন—
দরিদ্র মোর ব্যথার সঙ্গী, দরিদ্র মোর ভাই;
আমি যেন মোর জীবনে নিত্য কাঙালের প্রেম পাই!
তাহাদের সাথে কাঁদিব, তাদেরে বাঁধিব বক্ষে মম;
দরিদ্র মোর পরমাত্মীয়, দরিদ্র প্রিয়তম!
অন্যত্র বলেছেন—
যত দিন মোর লেখার শক্তি রবে,
যত দিন আমি বেঁচে রব এই ভবে,
উহাদের কথা লিখিয়া যাইব, কহিব ওদেরি কথা,
পুত্রশোকের মতন জাগিবে বক্ষে ওদেরি ব্যথা।
দরিদ্রদের পাশে থেকে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন কবিতায়—
মোর আল্লার হুকুম পেয়েছে এ হুকুম-বর্দার,
উহাদেরি তরে যুদ্ধ করিব হাতে লয়ে তলোয়ার।
উহাদেরি তরে নিবেদিত মোর এই তনু-মন-প্রাণ,
ওদেরে সঙ্গী করিয়া করিব নবযুগ-অভিযান।
এ ছাড়া তাঁর বহু কবিতা-গানে অনুরূপ মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। দারিদ্র্য তাঁর পরমাত্মীয় ছিল বলেই তিনি দরিদ্রের প্রতি সাহায্য-সহানুভূতির হাত প্রসারিত করার কথা বলেছেন।
এমনকি সম্পদের সুষম বণ্টন ও দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্যে জাকাত প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন গানেও। একটি গানে তিনি উচ্চারণ করেছেন—
দে যাকাত, দে যাকাত, তোরা দে রে যাকাত।
তোর দীল্ খুলবে পরে, ওরে আগে খুলুক হাত।।
দেখ পাক কোরআন, শোন্ নবীজির ফরমান
ভোগের তরে আসেনি দুনিয়ায় মুসলমান
তোর একার তরে দেননি খোদা দৌলতের খেলাত।।
তবে আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য যে, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সাল থেকেই দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তিহীন এবং চলত্শক্তিহীন হয়ে পড়েন। কবি নজরুল ছিলেন সর্বহারাদের কবি, শোষিত-বঞ্চিতদের কথাশিল্পী, সর্বশ্রেণির মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার। তিনি সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষের সঙ্গে মিশেছেন গভীরভাবে, নিবিড়ভাবে। দারিদ্র্যের জাঁতাকলে পড়ে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে রুটির দোকানে। ফলে তিনি বৃহত্তর দুর্ভিক্ষ যেমন দেখেছেন; ততোধিক গভীর দৃষ্টি নিয়ে দেখেছেন সমাজের আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষদের। একবার কথাশিল্পী সুরেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে গল্প শুনেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নাকি তাঁর বইয়ের সমস্ত আয় দিয়ে কুকুরদের জন্য একটা মঠ তৈরি করে যাবেন। খেতে না পেয়ে পথে ঘুরে বেড়ায় যেসব কুকুর, তারা আহার-বাসস্থান পাবে এই মঠে। ফ্রি অব চার্জে। শরৎচন্দ্র নাকি জানতে পেরেছেন, ওই সমস্ত কুকুর পূর্বজনমে সাহিত্যিক ছিল। মরে কুকুর হয়েছে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম শুনে আক্ষেপ নিয়েই বলেছিলেন, ‘সত্যিই আমরা সাহিত্যিকরা কুকুরের জাত। কুকুরের মতই আমরা না খেয়ে কামড়াকামড়ি করে মরি।’ তাই তাঁর প্রার্থনা ছিল, যদি পরজন্ম থেকেই থাকে। তবে আর যেন এদেশে কবি হয়ে না জন্মাই। যদি আসি বরং শরৎচন্দ্রের কুকুর হয়ে আসি। নিশ্চিন্তে দু’মুঠো খেয়ে বাঁচবো।
কবি কাজী নজরুল ইসলাম দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়েই হয়তো এসব কথা বলে গেছেন। কেননা ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, কৃষ্ণনগরে থাকাকালীন নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট ছিল কাজী নজরুলের নিত্যসঙ্গী। তাই তো দারিদ্র্যের চিত্র, সাম্য ও বিপ্লবী চেতনা তাঁর ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসের রূপকল্পের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আনসার নামে এক বিপ্লবী চরিত্রের মধ্যে আমরা কবি নজরুলকে খুঁজে পাই। সেই বিপ্লবী, সংসারত্যাগী, সাহসী চরিত্রটি প্রকারান্তরে নজরুল জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। তাঁর চালচলন, কথাবার্তা, জীবনের প্রতি উদাসিনতা, সংসার বিবাগী, দুঃখক্লিষ্ট মানুষদের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ সবই নজরুল জীবনের সঙ্গে মিলে যায়।
কৃষ্ণনগরে বসবাসকালে মূলত কবিপুত্র বুলবুলের জন্মকালে নজরুলের গরিবি কী ভয়ানক হয়ে উঠেছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর অন্যতম প্রকাশক বর্মণ পাবলিশিং হাউসের ব্রজবিহারী বর্মণকে লেখা একটি চিঠি থেকে। ওই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন—‘স্নেহের ব্রজ! আজ সকাল ছয়টায় আমার একটি পুত্র সন্তান হয়েছে। তোমার বৌদি আপাততঃ ভাল আছে। আমিও আজ সকালে ফিরে এলাম যশোহর, খুলনা, বাগেরহাট, দৌলতপুর প্রভৃতি ঘুরে। টাকার বড্ড দরকার। যেমন করে পার পঁচিশটি টাকা আজই টেলিগ্রাফ মনি-অর্ডার করে পাঠাও। তুমি ত সব অবস্থা জান। বলেও এসেছি তোমায়। ভুলো না যেন। টাকা কর্জ করে পাঠাও।’ শুধু তা-ই নয়; একই সঙ্গে জানা যায়, কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটি সেই সময়েই রচিত। তাই তো মুজফ্ফর আহমদ জানান, কল্লোল পত্রিকার সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাস তার পত্রিকার জন্য কবিতা প্রার্থনা করে মানি-অর্ডারযোগে নজরুলের কাছে দশ টাকা পাঠিয়েছিলেন। নজরুল ‘দারিদ্র্য’ কবিতাটি লিখে পাঠান।
কবি নজরুল ইসলামের জীবনের পুরোটাই আসলে বলতে গেলে এক কঠোর সংগ্রামের গল্প। সে সংগ্রাম দারিদ্র্য, অর্থলিপ্সা, লোভ, প্রতারণা আর শোষণের বিরুদ্ধে ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা আর মানবতাকে জেতানোর সংগ্রাম। বিশেষ করে কবির জীবনের শেষের অধ্যায়টুকু ছিল কবি আর কবি পরিবারের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়। কবি অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর কবির সন্তানেরা ও তাঁর পরিবার হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন ছাড়া আর কাউকে পাশে পাননি। তাঁর কোনো বন্ধু-বান্ধব, শুভানুধ্যায়ীকে তখন তাঁর পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। বরং কবির লেখা বইয়ের স্বত্ত্ব বিক্রি বা কবিতা ছাপাতে গিয়ে পরিচিত মানুষদের দ্বারাই বারবার প্রতারিত হয়েছেন।
১৯৩০ সালের ৭ মে নজরুলের ত্রুটিহীন যত্ন, সেবা ও চিকিৎসাকে ব্যর্থ করে বসন্ত রোগে অসহনীয় কষ্ট পেয়ে কবির দ্বিতীয় পুত্র বুলবুলের (অরিন্দম খালেদ) মৃত্যু হয়। পুত্রশোক এত প্রবল হয়েছিল যে, কবি নজরুল পরে গভীরভাবে আধ্যাত্মিক সাধনার দিকে ঝোঁকেন এবং দীক্ষা নেন। কবি নজরুলের যখন ভয়ানক অর্থসংকট, তাঁর দুই ছেলে সানি ও নিনি তখন বালক এবং প্রমীলা নজরুল প্যারালাইসিস নিয়ে শয্যাশায়ী। এ অবস্থায় কবিকে ঠকানোর লোকের কিন্তু অভাব হয়নি! চরম অর্থকষ্টের সুযোগে কবির বইয়ের কপিরাইট কিনে নিয়ে তাঁকে অবিশ্বাস্যভাবে বঞ্চিত করেছেন প্রকাশকরা। কলকাতার বিখ্যাত পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা ডি এম লাইব্রেরির নাম এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া খবরের কাগজ ও মাসিক পত্রিকার মালিকরা দিন শেষে মাত্র পাঁচ-ছয় টাকা দিয়ে কবিকে বিদায় করতেও কার্পণ্য করেননি। অনেক সময় কবিকে কেবল চা-পান খাইয়ে লিখিয়ে নেওয়া হতো কবিতা-গান।
মূলত শিশুকবিকে মা-বাবা শিশুকালে ভালোবেসে যে ‘দুখু মিয়া’ নাম দিয়েছিলেন; সারাজীবন কবির কষ্টে, সংগ্রামে সে নাম আসলেই সার্থক হয়ে ওঠে। পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি বিভিন্ন কাজ করেন। শৈশবের এসব কঠিন অভিজ্ঞতা তাঁর মানসিকতা এবং সাহিত্যে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই যে কবি নজরুল অল্প বয়সেই কর্মজীবনে প্রবেশ করেন; যা তাঁর জীবনের দারিদ্র্যের চাপেরই প্রতিফলন ছিল। শৈশবের অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর সাহিত্যে সমাজের দরিদ্র ও শোষিত মানুষের প্রতি সহানুভূতির বীজ বপন করেছিল। এত কষ্ট ও সংগ্রামের পরও তাঁর জীবনের ছোট্ট একটি আনন্দের কথা অনেকেই হয়তো জানেন না। দারিদ্র্যের আঘাত সত্ত্বেও ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বরে কবি শুধু শখ মেটাতে হঠাৎ করেই কোনোভাবে একটি ক্রাইসলার মডেলের চোখে পড়ার মতো গাড়ি কিনে বসেন।
তবে এ কথা সত্য, জীবনে অনেক দুঃখ-কষ্ট পেলেও তিনি মোটেই গোমড়ামুখো ছিলেন না। ছিলেন দারুণ হাসি-খুশি, চঞ্চল, ছটফটে একজন মানুষ। যখন হাসতেন; তখন আশপাশের মানুষের মনেও ছড়িয়ে যেত সেই আনন্দের রেশ। হয়তো মানুষের ভালোবাসাই দুখু মিয়াকে সব দুঃখ-কষ্ট জয় করার প্রেরণা দিয়েছিল। দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষটি পাঠকের অন্তরে স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসেছেন। সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। মৃত্যুর এতগুলো বছর পরও মানুষের মুখে মুখে তাঁরই নাম। তাঁরই গুণগান। তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
এসইউ
What's Your Reaction?