বিপন্ন শৈশব বনাম গণমাধ্যমের ভূমিকা, ধর্ষণ ও সামাজিক অবক্ষয়

ধর্ষণ কেবল একটি অপরাধ নয়। এটি আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের একটি ভয়াবহ রূপ। যখন কোনো সমাজে নারী ও শিশুরা অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজের মানবিক মূল্যবোধ গভীর সংকটে রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের ঘটনাগুলো আমাদের বিবেককে চরমভাবে নাড়া দেয়। একটি শিশু পৃথিবী চেনার আগেই যখন এমন নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়, তখন তার পুরো ভবিষ্যৎ মানসিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। এমন ঘটমায় সংবাদ পরিবেশন এবং সামাজিক মূল্যবোধ তৈরিতে আমাদের মূলধারার গণমাধ্যমেরও কিছু দায়বোধ থাকা উচিত। বিগত বছরগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে গড়ে শতাধিক নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বিভিন্ন সময় সাত মাসে ধর্ষণের ঘটনা ৬৮ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বিশ্লেষণ করলে এর ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। করোনাকালীন সময়ে, বিশেষ করে ২০২০ সালে দেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। সেই বছর এক হাজারের বেশি শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর

বিপন্ন শৈশব বনাম গণমাধ্যমের ভূমিকা, ধর্ষণ ও সামাজিক অবক্ষয়

ধর্ষণ কেবল একটি অপরাধ নয়। এটি আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের একটি ভয়াবহ রূপ। যখন কোনো সমাজে নারী ও শিশুরা অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজের মানবিক মূল্যবোধ গভীর সংকটে রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের ঘটনাগুলো আমাদের বিবেককে চরমভাবে নাড়া দেয়। একটি শিশু পৃথিবী চেনার আগেই যখন এমন নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়, তখন তার পুরো ভবিষ্যৎ মানসিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। এমন ঘটমায় সংবাদ পরিবেশন এবং সামাজিক মূল্যবোধ তৈরিতে আমাদের মূলধারার গণমাধ্যমেরও কিছু দায়বোধ থাকা উচিত।

বিগত বছরগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে গড়ে শতাধিক নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, বিভিন্ন সময় সাত মাসে ধর্ষণের ঘটনা ৬৮ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বিশ্লেষণ করলে এর ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। করোনাকালীন সময়ে, বিশেষ করে ২০২০ সালে দেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। সেই বছর এক হাজারের বেশি শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে কয়েক হাজার শিশু ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। 

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের আগের কিছু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৮০টির বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার হতো। বর্তমানে এই ধারা আরও জটিল রূপ নিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৩৪৬ জন নারী ও শিশু। যেখানে একক ধর্ষণের শিকার ১০৭৪ জন, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ২৩৬ জন, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৩ জনকে। আর ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন তিনজন।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা নথিতে থাকা হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের সমাজে এখনো লোকলজ্জা, সামাজিক কলঙ্ক এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার ভয় রয়েছে। এই কারণে অনেক পরিবার থানায় বা আদালতে যেতে চায় না। ফলে অসংখ্য ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়।

অপরাধের ধরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গ্রাম কিংবা শহর সব জায়গাতেই পরিচিত মানুষ, প্রতিবেশী এবং এমনকি নিজের আত্মীয়দের মাধ্যমেই শিশুরা বেশি নির্যাতিত হচ্ছে।

এই সামাজিক ব্যাধি এভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। দ্বিতীয়ত, অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি না হওয়া এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তৃতীয়ত, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পর্নোগ্রাফি এবং বিভিন্ন সহিংস কনটেন্টের সহজলভ্যতা তরুণ সমাজকে বিপথগামী করছে। চতুর্থত, শিশুদের নিজস্ব নিরাপত্তা এবং সচেতনতামূলক শিক্ষার অভাবও এর অন্যতম বড় কারণ।

এই সংকটের আরেকটি সংবেদনশীল দিক হলো আমাদের গণমাধ্যমের ভূমিকা। বর্তমানে মূলধারার টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ফেসবুক-ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমে ধর্ষণের খবর ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। অপরাধের খবর প্রকাশ করা অবশ্যই জরুরি। কারণ এতে সমাজ সচেতন হয় এবং অপরাধীদের শাস্তির দাবি জোরালো হয়। কিন্তু ইদানীং কিছু সংবাদমাধ্যমের মধ্যে এক ধরণের প্রতিযোগিতা দেখা যায়। ভিউ বা দর্শক বাড়ানো এবং কনটেন্ট ভাইরাল করার জন্য অনেক সময় ঘটনাকে অতিরিক্ত নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়।

অনেক ক্ষেত্রে সংবাদের শিরোনাম এমনভাবে দেওয়া হয় যা সাধারণ মানুষের মনে উত্তেজনা তৈরি করে। একে বলা হয় ‘ক্লিকবেইট’ প্রবণতা। এমন সস্তা জনপ্রিয়তার খোঁজে তৈরি সংবাদ সামাজিক সংবেদনশীলতাকে নষ্ট করে দেয়। অনেক সময় অসচেতনতার কারণে ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় বা তার পরিবারের তথ্য আংশিক প্রকাশ পেয়ে যায়। এর ফলে নির্যাতিত শিশুটি এবং তার পরিবার সমাজে নতুন করে মানসিক ও সামাজিক হেনস্থার শিকার হয়। ইন্টারনেট দুনিয়ায় একে কেন্দ্র করে শুরু হয় সাইবার বুলিং বা ভিকটিম-ব্লেমিং। অর্থাৎ অপরাধীকে বাদ দিয়ে উল্টো ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার একটি নোংরা মানসিকতা তৈরি হয়।
গণমাধ্যমের আসল দায়িত্ব হলো সমাজে সচেতনতা তৈরি করা। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে জনমত গঠন করা এবং ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষা করা। শিশু ধর্ষণের মতো সংবেদনশীল খবর প্রচারের সময় সাংবাদিকদের পেশাগত নৈতিকতা এবং আইনি নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত। সংবাদের ভাষা যেন কোনোভাবেই সমাজকে আরও কলুষিত না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

কেবল কঠোর আইন বা শাস্তি দিয়ে এই মহামারি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এই সমস্যার সমাধান করতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন এবং রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন করা এবং নৈতিক শিক্ষা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। একটি সভ্য সমাজ কখনোই শিশুদের কান্নার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। পরবর্তী প্রজন্মের শৈশব যেন বিপন্ন না হতে পারে, এই নিশ্চয়তা তাদেরকে দিতে হবে। এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে এখনই আমাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আর এই কাজে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত গণ-মাধ্যমকেও পরিশীলিত ভুমিকা রাখতে হবে।

লেখক: সাইদুর রহমান, নির্বাচন ও রাজনীতি বিষয়ক সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow