বিপিসির ২৮ কোটি টাকা গচ্চা: ৩ সদস্যের বোর্ড কমিটি গঠন

সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে বেসরকারি চারটি সিআরইউ (ক্যাথালেটিক রিফর্মিং ইউনিট) রিফাইনারি থেকে জ্বালানি তেল কেনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এতে তিন মাসে সরকারের ২৮ কোটি টাকা গচ্চার অভিযোগ ওঠে। সেই অভিযোগের বিষয়ে অপরাধের দায় নির্ধারণে ৩ সদস্যের বোর্ড কমিটি গঠন করেছে বিপিসি। কমিটিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. রফিকুল আলমকে আহ্বায়ক এবং অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ রাশেদুল আমীন ও বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানাকে সদস্য করা হয়েছে। গত ২০ এপ্রিল বিপিসির ১০২৯তম বোর্ড সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ২২ এপ্রিল বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ কমিটি গঠন করা হয়। বোর্ড কমিটি গঠনের বিষয়টি বুধবার (২৮ এপ্রিল) প্রকাশ্যে আসে। জানা যায়, আমদানির পাশাপাশি দেশীয় বেসরকারি চারটি সিআরইউ রিফাইনারি থেকে জ্বালানি তেল কিনে বিক্রি করে বিপিসি। এসব তেলের ক্রয়মূল্য নির্ধারণে সরকারি আদেশকে তোয়াক্কা না করে অর্থের বিনিময়ে বিলম্বে প্রজ্ঞাপন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিপিসির সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। এতে বিগত অর্থবছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন ম

বিপিসির ২৮ কোটি টাকা গচ্চা: ৩ সদস্যের বোর্ড কমিটি গঠন

সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে বেসরকারি চারটি সিআরইউ (ক্যাথালেটিক রিফর্মিং ইউনিট) রিফাইনারি থেকে জ্বালানি তেল কেনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এতে তিন মাসে সরকারের ২৮ কোটি টাকা গচ্চার অভিযোগ ওঠে। সেই অভিযোগের বিষয়ে অপরাধের দায় নির্ধারণে ৩ সদস্যের বোর্ড কমিটি গঠন করেছে বিপিসি।

কমিটিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. রফিকুল আলমকে আহ্বায়ক এবং অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ রাশেদুল আমীন ও বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানাকে সদস্য করা হয়েছে।

গত ২০ এপ্রিল বিপিসির ১০২৯তম বোর্ড সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ২২ এপ্রিল বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ কমিটি গঠন করা হয়। বোর্ড কমিটি গঠনের বিষয়টি বুধবার (২৮ এপ্রিল) প্রকাশ্যে আসে।

জানা যায়, আমদানির পাশাপাশি দেশীয় বেসরকারি চারটি সিআরইউ রিফাইনারি থেকে জ্বালানি তেল কিনে বিক্রি করে বিপিসি। এসব তেলের ক্রয়মূল্য নির্ধারণে সরকারি আদেশকে তোয়াক্কা না করে অর্থের বিনিময়ে বিলম্বে প্রজ্ঞাপন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিপিসির সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। এতে বিগত অর্থবছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে বিপিসির প্রায় ২৮ কোটি টাকা গচ্চা গেছে।

এ নিয়ে গত ২২ নভেম্বর জাগো নিউজে ‘বেসরকারি প্ল্যান্টের তেল কিনে ৩ মাসে বিপিসির ‘গচ্চা’ ২৮ কোটি টাকা’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরের দিন প্রতিবেদনটি অন্য একটি অখ্যাত পত্রিকায় হুবহু প্রকাশিত হয়। তথ্য অধিদপ্তরের বরাতে প্রতিবেদনের বিষয়টি সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের নজরে এলে তিনি অভিযোগটি তদন্ত করার নির্দেশ দেন। এরপর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে জ্বালানি বিভাগ।

গত ১ ফেব্রুয়ারি তদন্ত কমিটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। এর এক মাস পর গত ১ মার্চ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপ-সচিব মো. বজলুর রশীদের সই করা দাপ্তরিক এক চিঠিতে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উপস্থাপিত সুপারিশগুলো বিপিসির বোর্ড সভায় উপস্থাপনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য বিপিসি চেয়ারম্যানকে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন
বেসরকারি প্ল্যান্টের তেল কিনে ৩ মাসে বিপিসির ‘গচ্চা’ ২৮ কোটি টাকা

তদন্ত কমিটির পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তিন মাসে বিলম্বে মূল্য বিজ্ঞপ্তি জারির কারণে বিপিসির ২৮ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়। কিন্তু বিপিসির দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে তিন মাসে ১৭ কোটি ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার ৩১৯ টাকা ৫৯ পয়সা আর্থিক ক্ষতি নির্ধারণ করে তদন্ত কমিটি।

প্রতিবেদনে এক পর্যালোচনায় তদন্ত কমিটি উল্লেখ করে- ২০২২ সালে প্রাইসিং কমিটি গঠনের পর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত শাহরিয়ার মো. রাশেদ উপ-মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া মূল্য বিজ্ঞপ্তি জারির তারিখ পর্যালোচনায় দেখা যায়, জুলাই ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫ এর আগে কোনো মাসেই নির্দেশনা অনুযায়ী ৭ তারিখের মধ্যে মূল্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়নি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়—সার্বিক বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ১০-১০-২০২২ তারিখের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিপিসির প্রাইসিং কমিটির দায়িত্ব ছিল প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেলের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ ও বিজ্ঞপ্তি জারি করা। তবে বাস্তবে মূল্য বিজ্ঞপ্তি জারি করতে অতিরিক্ত ৩ থেকে ১০ দিন সময় লেগেছে, যাকে তারা (প্রাইসিং কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব) একটি ‘চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

সভার পর কার্যবিবরণী প্রস্তুত, সদস্যদের স্বাক্ষর সংগ্রহ, নথি উপস্থাপন ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের কারণে বিলম্ব হয়েছে বলে দাবি করা হয়। বিলম্বের বিষয়টি একবার নয়, বরং একাধিক মাসে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। অভিযোগ ওঠার পর বিপিসি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন পেশের জন্য বলা সত্ত্বেও কমিটি তিন মাস পর ‘বিষয়টি স্পর্শকাতর’ উল্লেখ করে তদন্তে অপারগতা প্রকাশ করে। এতে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। পরবর্তীসময়ে প্রাইসিং কমিটির সদস্য সচিবকে অন্য বিভাগে বদলি করার পর প্রাইসিং বিজ্ঞপ্তি নিয়মিত হওয়ায় বিপিসির আর্থিক ক্ষতি বন্ধ হয়, যা অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও জোরালো করে।

বিশ্লেষণে আরও প্রতীয়মান হয় যে, প্রাইসিং কমিটির সদস্য সচিব বিপিসির নিজস্ব ডিজিএম পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা। অন্যদিকে এ (প্রাইসিং) কমিটির আহ্বায়ক প্রেষণে নিযুক্ত একজন কর্মকর্তা। সরকার কোনো কর্মকর্তাকে কোনো দপ্তরে প্রেষণে নিয়োগ দিলে তাকে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া বা তার কাছ থেকে কাজ করিয়ে নেওয়া ওই দপ্তরের স্থায়ী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব। বিপিসিতে পরিচালক (অপারেশন ও পরিকল্পনা) হিসেবে ড. এ কে এম আজাদুর রহমান গত ৫ মার্চ ২০২৫ তারিখ অপরাহ্নে যোগ দেন এবং পদাধিকারবলে তিনি প্রাইসিং কমিটির আহ্বায়ক।

তবে প্রাইসিং কমিটির সদস্য সচিব শাহরিয়ার মোহাম্মদ রাশেদ ২০২২ সাল থেকে এ কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে নির্ধারিত সময়ে মূল্য নির্ধারণী বিজ্ঞপ্তির গুরুত্ব তার জানা ছিল। তবে তিনি যথেষ্ট সময় নিয়ে সভা আহ্বান, কার্যবিবরণী অনুমোদন ও নথি উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের উদ্যোগ নেননি, যা কর্তব্য কর্মে অবহেলার শামিল। ফলে মার্চ ২০২৫ থেকে মে ২০২৫ সময়কালে বিপিসির ১৭ কোটি ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার ৩১৯ টাকা ৫৯ পয়সা আর্থিক ক্ষতি হয় (বিপিসি থেকে প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী)।

প্রতিবেদনে চারটি মতামত ও সুপারিশ দেয় তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উপস্থাপিত সুপারিশগুলো বিপিসির বোর্ড সভায় উপস্থাপনের মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য গত ১ মার্চ বিপিসি চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এরপর গত ৮ মার্চ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ডিজিএম শাহরিয়ার মোহাম্মদ রাশেদকে সচিবের দপ্তরে সংযুক্ত (ওএসডি) করা হয়।

এমডিআইএইচ/এমএমকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow