বিয়ের বাজার করতে এসে নিখোঁজ ছেলে, এখন আদালতে বাবা
বিয়ের কেনাকাটা করতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন সুধাংশু গোপ (৩৭)। দুই দিন পরই ছিল তার বিয়ে। কিন্তু ঢাকায় পৌঁছানোর কিছু সময়ের মধ্যেই পরিবারের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর থানা, পুলিশ ফাঁড়ি, জিডি, মুক্তিপণের টাকা- দিয়েও ছেলেকে ফিরে পাননি বাবা বিষ্ণুপদ গোপ। ২৬ দিন ধরে ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে অবশেষে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সুধাংশু গোপকে উদ্ধারে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। সোমবার (৩ আগস্ট) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবর রহমানের আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন। আদালত প্রাঙ্গণে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় বাবা আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায়, বিষ্ণুপদ গোপ ছেলের সন্ধানে বিভিন্ন কাগজপত্র হাতে নিয়ে ঘুরছেন। চোখে-মুখে ক্লান্তি আর উৎকণ্ঠার ছাপ স্পষ্ট। সঙ্গে থাকা স্বজনরাও উদ্বিগ্ন। ২৬ দিন ধরে ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। আদালতে আসার আগেও তিনি পুলিশের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছেন, কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। আরও পড়ুন স্কুলছাত্রকে অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি,
বিয়ের কেনাকাটা করতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন সুধাংশু গোপ (৩৭)। দুই দিন পরই ছিল তার বিয়ে। কিন্তু ঢাকায় পৌঁছানোর কিছু সময়ের মধ্যেই পরিবারের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর থানা, পুলিশ ফাঁড়ি, জিডি, মুক্তিপণের টাকা- দিয়েও ছেলেকে ফিরে পাননি বাবা বিষ্ণুপদ গোপ।
২৬ দিন ধরে ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে অবশেষে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সুধাংশু গোপকে উদ্ধারে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
সোমবার (৩ আগস্ট) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবর রহমানের আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন।
আদালত প্রাঙ্গণে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় বাবা
আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায়, বিষ্ণুপদ গোপ ছেলের সন্ধানে বিভিন্ন কাগজপত্র হাতে নিয়ে ঘুরছেন। চোখে-মুখে ক্লান্তি আর উৎকণ্ঠার ছাপ স্পষ্ট। সঙ্গে থাকা স্বজনরাও উদ্বিগ্ন। ২৬ দিন ধরে ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। আদালতে আসার আগেও তিনি পুলিশের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছেন, কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি।
জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বিষ্ণুপদ গোপ বলেন, ছেলে সুধাংশুর বিয়ে ঠিক হয়েছিল ১২ জুলাই। ১০ জুলাই সকালে সে বিয়ের বাজার করতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। সকাল প্রায় ১০টার দিকে ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়। তখন সে জানায় গাবতলীতে পৌঁছেছে। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
থানায় থানায় ঘুরেও মেলেনি ছেলের সন্ধান
ওরা বলছিল, টাকা দিলে আমার ভাইরে (ছেলেকে) ছেড়ে দেবে। আবার বলছিল, যে মেয়ের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছে, সেই মেয়েকে বিয়ে না করলে ছেড়ে দেবে। আমরা তাদের কথা মেনেছি, টাকা দিয়েছি। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও আমার ছেলেকে ছাড়েনি। - বাবা বিষ্ণুপদ গোপ
ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথমে দারুস সালাম থানায় গেলে সেখান থেকে সাভার ও কালিয়াকৈর থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। পরে কালিয়াকৈর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এরপরও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়াই। - বলছিলেন, বাবা বিষ্ণুপদ গোপ।
২৬ দিন ধরে ছেলের খোঁজ না পেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন বাবা বিষ্ণুপদ গোপ/ছবি: আশিকুজ্জামান
তিনি বলেন, নিখোঁজ হওয়ার পরদিন বিকেলে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা ফোন করে টাকা দাবি করেন। ছেলেকে জীবিত ফেরত পাওয়ার আশায় তাদের কথামতো কয়েক দফায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পাঠানো হয়।
বিষ্ণুপদ গোপ বলেন, ‘ওরা বলছিল, টাকা দিলে আমার ভাইরে (ছেলেকে) ছেড়ে দেবে। আবার বলছিল, যে মেয়ের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছে, সেই মেয়েকে বিয়ে না করলে ছেড়ে দেবে। আমরা তাদের কথা মেনেছি, টাকা দিয়েছি। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও আমার ছেলেকে ছাড়েনি।’
বিয়ে ভেঙে দেওয়ারও শর্ত দেয় অপহরণকারীরা
ভুক্তভোগীর বাবা বলছেন, অপহরণকারীরা শুধু টাকা নয়, ছেলের নির্ধারিত বিয়েও ভেঙে দেওয়ার শর্ত দেয়। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রয়োজনে সেই বিয়ে আর হবে না। তবুও ছেলেকে ফেরত দেওয়া হয়নি।
বাবা বিষ্ণুপদ গোপের দাবি, বিয়ের বিষয়ে আগে থেকেই কিছু অসঙ্গতি ছিল। যে মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে ঠিক হয়েছিল, তার আত্মীয়-স্বজনের আচরণে তাদের সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। পরে সেই সন্দেহ আরও গভীর হয়। তবে তিনি কারও বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ না এনে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটনের দাবি জানান।
যা আছে মামলায়
আদালতে দায়ের করা মামলায় বলা হয়, গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বাসিন্দা সুধাংশু গোপের গায়ে হলুদ ছিল ১১ জুলাই এবং বিয়ে ছিল ১২ জুলাই। বিয়ের কেনাকাটার জন্য ১০ জুলাই সকাল ৮টার দিকে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।
সকাল ১০টা ২ মিনিটে তিনি তার ফুফাতো ভগ্নিপতি অ্যাডভোকেট পাপ্পু ঘোষকে ফোন করে জানান, তিনি গাবতলীতে অবস্থান করছেন। পাপ্পু ঘোষ তাকে সায়েন্স ল্যাব এলাকার মাল্টিপ্ল্যান মার্কেটের সামনে আসতে বলেন। এরপর থেকেই তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করা যায়নি।
১১ জুলাই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি ভিকটিমের বোনের মোবাইলে ফোন করে জানায়, সুধাংশু তাদের হেফাজতে রয়েছে। তাকে জীবিত ফেরত পেতে হলে টাকা পাঠাতে হবে এবং নির্ধারিত বিয়ে বাতিল করতে হবে। - পরিবার
ছেলের সন্ধান পেতে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন বাবা বিষ্ণুপদ গোপ/ছবি: আশিকুজ্জামান
মামলার বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, মোবাইল ফোনের সর্বশেষ লোকেশন পাওয়া যায় সাভারের ভাকুর্তা ইউনিয়নের মোগড়াকান্দা এলাকায়। এরপর পরিবারের সদস্যরা নিউমার্কেট থানা, গাবতলী পুলিশ ফাঁড়ি, দারুস সালাম থানা, সাভার থানা এবং কালিয়াকৈর থানাসহ বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করেন। ১১ জুলাই কালিয়াকৈর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়।
মুক্তিপণ হিসেবে কয়েক দফায় টাকা নেওয়ার অভিযোগ
মামলায় আরও বলা হয়, ১১ জুলাই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি ভিকটিমের বোনের মোবাইলে ফোন করে জানায়, সুধাংশু তাদের হেফাজতে রয়েছে। তাকে জীবিত ফেরত পেতে হলে টাকা পাঠাতে হবে এবং নির্ধারিত বিয়ে বাতিল করতে হবে।

‘অপহরণ বাণিজ্যের’ নিরাপদ আস্তানা পাহাড়
পরিবারের সদস্যরা কয়েক দফায় বিকাশ ও অন্যান্য মাধ্যমে বিভিন্ন নম্বরে টাকা পাঠান। এর মধ্যে ২০ হাজার ৩৭০ টাকা, ১২ হাজার ২২২ টাকা এবং ১০ হাজার ১৮৫ টাকাসহ একাধিক লেনদেনের তথ্য মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরদিন আবারও অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও ভিকটিমকে মুক্তি দেওয়া হয়নি।
আইনজীবীর বক্তব্য
মামলায় বাদীকে সহায়তা করা আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোকছেদুল হাসান মণ্ডল জাগো নিউজকে বলেন, সুশান্ত ওরফে সুধাংশু গোপকে অপহরণ করে পরিবারের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে আদালতে মামলা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পরিবার শুরু থেকেই বিভিন্ন থানায় গিয়ে সহযোগিতা চাইলেও কার্যকর কোনো ফল পায়নি। পরে আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন এবং ভিকটিমকে দ্রুত উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।
‘২৬ দিন পর আদালতে এলাম’
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট পাপ্পু ঘোষ বলেন, ভিকটিম তার শ্যালক। ১০ জুলাই সকাল ১০টার দিকে তার সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল। তখন তিনি জানিয়েছিলেন আমিনবাজার এলাকায় রয়েছেন। এরপর থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। দীর্ঘ ২৬ দিন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও কোনো সন্ধান না পেয়ে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
আমার ছেলেটাকে জীবিত ফেরত চাই। তদন্ত করে যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। - বিষ্ণুপদ গোপ
তিনি বলেন, ‘আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা আশা করছি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সুধাংশুকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হবে এবং পরিবার ন্যায়বিচার পাবে।’
সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ
শুনানি শেষে আদালত মামলাটি গ্রহণ করে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে নিখোঁজ সুধাংশু গোপকে দ্রুত উদ্ধারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২৬ দিন ধরে ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে বিষ্ণুপদ গোপের একটাই প্রত্যাশা- ‘আমার ছেলেটাকে জীবিত ফেরত চাই। তদন্ত করে যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।’
এমডিএএ/এমআরএম
What's Your Reaction?

