বিশ্বকাপের জন্য রাজা নিজেই কোচ! রোমানিয়ার অবিশ্বাস্য ফুটবল কাহিনি
সিংহাসনের মতো সর্বোচ্চ মর্যাদার একটি জায়গায় বসে একজন রাজার সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ কাজ ঠিক কী হতে পারে? এটার জন্য ভেবে-চিন্তে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিশ্চিতভাবেই রাজ্যকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা! দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির উন্নতি সাধন করাই থাকে মূল লক্ষ্য। সহজভাবে চিন্তা করলে উত্তরটা এমনই হওয়ার কথা। তবে সময়টা যখন ১৯৩০, দেশটা যখন রোমানিয়া এবং রাজা যখন ক্যারল দ্বিতীয়, তখন ব্যতিক্রম কিছু যে ঘটবে- সেটাই স্বাভাবিক। রাজা ক্যারল সিংহাসনে বসেই সিদ্ধান্ত নিলেন- নিজের দেশ রোমানিয়াকে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপে খেলাতেই হবে। ওই সময়ের বাস্তবতায় তিনি যা করেছেন সেটিকে আপত্তিকর বললে কোনো অংশেই ভুল বলা হবে না; কিন্তু ফুটবল পাগল রোমানিয়ার রাজা সিংহাসনে আসীন হয়ে এটাকেই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হিসেবে নিজের জন্য ঠিক করেন। নিজ দেশের সম্মান বৃদ্ধিতে এ লক্ষ্যটাকেই বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা-শ্রম নিয়োজিত করেন। বলা চলে, বিশ্বকাপে খেলার সিদ্ধান্ত মোটেও সহজ ছিল না। কেননা, বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী আসরের মাত্র ৩৫ দিন আগে ক্ষমতায় বসেন ক্যারল দ্বিতীয়। তবুও ৩৭ বছর বয়সী এই প্রাণবন্ত রাজার অদম্য ইচ্ছা শক্তির কাছে সময়
সিংহাসনের মতো সর্বোচ্চ মর্যাদার একটি জায়গায় বসে একজন রাজার সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ কাজ ঠিক কী হতে পারে? এটার জন্য ভেবে-চিন্তে উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিশ্চিতভাবেই রাজ্যকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা! দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির উন্নতি সাধন করাই থাকে মূল লক্ষ্য। সহজভাবে চিন্তা করলে উত্তরটা এমনই হওয়ার কথা। তবে সময়টা যখন ১৯৩০, দেশটা যখন রোমানিয়া এবং রাজা যখন ক্যারল দ্বিতীয়, তখন ব্যতিক্রম কিছু যে ঘটবে- সেটাই স্বাভাবিক।
রাজা ক্যারল সিংহাসনে বসেই সিদ্ধান্ত নিলেন- নিজের দেশ রোমানিয়াকে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপে খেলাতেই হবে। ওই সময়ের বাস্তবতায় তিনি যা করেছেন সেটিকে আপত্তিকর বললে কোনো অংশেই ভুল বলা হবে না; কিন্তু ফুটবল পাগল রোমানিয়ার রাজা সিংহাসনে আসীন হয়ে এটাকেই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হিসেবে নিজের জন্য ঠিক করেন। নিজ দেশের সম্মান বৃদ্ধিতে এ লক্ষ্যটাকেই বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা-শ্রম নিয়োজিত করেন।
বলা চলে, বিশ্বকাপে খেলার সিদ্ধান্ত মোটেও সহজ ছিল না। কেননা, বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী আসরের মাত্র ৩৫ দিন আগে ক্ষমতায় বসেন ক্যারল দ্বিতীয়। তবুও ৩৭ বছর বয়সী এই প্রাণবন্ত রাজার অদম্য ইচ্ছা শক্তির কাছে সময় স্বল্পতা কোনো বাধাই হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তার ঠিক ৮ বছর আগে যে রোমানিয়া নিজেদের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিল, তারাই জায়গা করে নেয় ১৯৩০ সালে লাতিন আমেরিকার উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আসরে।
বিরাট এই চ্যালেঞ্জকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেন রাজা ক্যারল। বিশ্বকাপের প্রথম আসরে দল নিবন্ধনের মাত্র তিনদিন বাকি থাকতেই তিনি সক্ষম হন রোমানিয়ার নাম নিবন্ধন করাতে। কেবল বিশ্বকাপে দলের জায়গা নিশ্চিত করেই দায়িত্ব ছেড়ে দেননি তিনি। মজার বিষয় হলো, ঠিক ওই সময়টাতেই রোমানিয়ায় ফুটবল সংক্রান্ত কোনো একটি অপরাধের কারণে নিষেধাজ্ঞার শাস্তিতে ছিলেন রোমানিয়ার প্রথম সারির ফুটবলাররা। রাজা সেই শাস্তিতে থাকা সব খেলোয়াড়ের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।
শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের দল বাছাই করতে গিয়ে রাজা নিজেই আক্ষরিক অর্থে কোচ বনে যান। সাধারণত যে কোনো ফুটবল দল নির্বাচন করেন সেই দলের কোচ; কিন্তু রাজা ক্যারল তখনকার রোমানিয়ার কোচ কসেল র্যাডুলেস্কুর ওপর স্কোয়াড নির্বাচনের দায়িত্ব না দিয়ে নিজেই বেছে নেন বিশ্বকাপের দল।
যদিও দল গোছাতে গিয়ে পড়তে হয় বড় জটিলতায়। কিন্তু তাতেও দমে যাননি তিনি। নিজের ক্ষমতাবলে রোমানিয়ার বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে নিয়ে আসেন তাদের কর্মস্থল থেকে। যারা কিনা একটি ইংরেজি তেল কোম্পানিতে কাজ করছিলেন। যদিও প্রথমে সেই কোম্পানির কর্মকর্তারা বিশ্বকাপ ও প্রস্তুতিকে সামনে রেখে তিন মাসের বৈতনিক ছুটি দিতে রাজি হননি। এমনকি যেসব কর্মী বিশ্বকাপ খেলতে উরুগুয়ে ভ্রমণ করবে, তাদেরকে আর কখনোই কাজে না ফেরানোর হুমকিও দেওয়া হয়।
এ অবস্থায় নিজে দায়িত্ব নেন রাজা ক্যারল। তিনি ফোন করেন কোম্পানির প্রধানকে। স্পষ্ট জানিয়ে দেন- খেলোয়াড়দের যেতে না দিলে তিনি কোম্পানিটিই বন্ধ করে দেবেন। স্বাভাবিকভাবেই কোম্পানিটি তাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হয়।
সব বাধা অতিক্রম করে রোমানিয়ার রাজার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৩১ সালের ২১ জুন তার নেতৃত্বেই রোমানিয়ার বিশ্বকাপ দল ইতালির জেনোয়া বন্দর থেকে জাহাজে যাত্রা শুরু করে। যাত্রাপথে ভিলফ্রঁশ-সুর-মের থেকে জাহাজে ওঠে ফ্রান্স জাতীয় ফুটবল দলও। সে সঙ্গে জুলেরিমেও (তখনকার ফিফা সভাপতি, এবং পরবর্তীতে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফির নামও তার নামে, ‘জুলেরিমে ট্রফি’ নামকরণ করা হয়) নিজের স্যুটকেসে বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে জাহাজে উপস্থিত ছিলেন।
১৬ দিনের আটলান্টিক মহাসাগর যাত্রায় কোচ কসেল র্যাডুলেস্কু বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ১৯ খেলোয়াড়কে বৃহৎ জাহাজের দশটি ডেকের একটিতে নিয়মিত ফিটনেস ড্রিল করাতেন। তবে বল নিয়ে অনুশীলনের সময় ২০ জনকে সামাল দিতে হতো কোচ কসেলকে। কেননা, নিজেকে কোনোভাবেই খেলা থেকে বিরত রাখতে পারতেন না রাজা ক্যারল।
আসরের গ্রুপ ‘তিনে’ স্বাগতিক উরুগুয়ে ও পেরুর সঙ্গে ছিল রোমানিয়া। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন দলের সুযোগ ছিল সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার। নিজেদের প্রথম ম্যাচে পেরুর বিপক্ষে ২২ বছর বয়সী আদালবার্ট ডেসু মাত্র ৫০ সেকেন্ডেই এগিয়ে দেন রোমানিয়াকে। লাতিন আমেরিকার দল পেরু অবশ্য ১৫ মিনিটের মধ্যেই সমতা ফেরায়। তবে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রার পর শরীর ক্লান্ত থাকার কথা থাকলেও রোমানিয়া দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। শেষ দিকে কনস্টান্টিন স্টানচিউ এবং নিকোলায় কোভাচ আরও দুটি গোল করলে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে রোমানিয়া।
পরের ম্যাচে স্বাগতিক উরুগুয়ের মুখোমুখি হয় রাজা ক্যারলের দেশ। প্রতিপক্ষের দলে খেলতেন হোসে আন্দার্দে, হোসে নাসাজ্জি, পেদ্রো কিয়া এবং পেদ্রো স্কারোনের মতো দুর্দান্ত খেলোয়াড়রা। চ্যাম্পিয়ন দলের বিপক্ষে ডেডলাইন শেষ হওয়ার ৩ দিন আগে বিশ্বকাপে নিবন্ধিত হওয়া রোমানিয়ার ৩-০ ব্যবধানে পরাজয় মোটেও লজ্জার কিছুই ছিল না।
রাজার প্রচেষ্টায় রোমানিয়া বিশ্বকাপে সুযোগ পাওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই দেশটিতে জনপ্রিয় হয়ে যায় ফুটবল- যা সময়ের পরিক্রমায় বদলে গিয়ে এখন একেবারে জাতীয় উন্মাদনায় পরিণত হয়েছে। বলকান অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত ক্রীড়াবিদদের একজন গিওর্গে হ্যাগি বলেন, ‘রোমানিয়ার মানুষ ফুটবল নিয়ে একেবারে পাগল। তাদের আবেগ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’
১৯৪০ সালে ফুটবল পাগল রোমানিয়ার রাজা দ্বিতীয় ক্যারল সিংহাসন ত্যাগ করেন এবং ১৩ বছর পর পর্তুগালে তার জীবনাবসান ঘটে। রাজা ক্যারলের মা-বাবা যথাক্রমে জার্মানি ও ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেই মানুষটি রোমানিয়ার ফুটবল ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন- দেশটির ফুটবলপ্রেমের সূচনার অনুপ্রেরণা হিসেবে।
ইফতেখার নিলয়
আইএন/আইএইচএস/
What's Your Reaction?