বিশ্বকাপে মাতোয়ারা ট্রাম্প, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিচ্ছেন মার্কিন সেনারা
যুক্তরাষ্ট্রে কড়া নিরাপত্তায় বসে যখন আর্জেন্টিনা-স্পেনের মধ্যকার ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল নিয়ে মাতোয়ারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ঠিক তখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে অকাতরে প্রাণ হারাচ্ছেন মার্কিন সেনারা। একদিকে ভিআইপি গ্যালারিতে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর উদযাপনের আলো, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে মার্কিন ইউনিফর্মে লাগছে রক্তের দাগ। একই সময়ে হোয়াইট হাউজের এই বৈপরীত্য নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। গ্যালারিতে ট্রাম্প, পাহারায় স্নাইপার-যুদ্ধবিমান নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রোববার (১৯ জুলাই) বিশ্বকাপের সবচেয়ে জমকালো ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফুটবল দুনিয়ার চোখ এখন লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা এবং লামিন ইয়ামালের স্পেনের দ্বৈরথের দিকে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সশরীরে গ্যালারিতে উপস্থিত থাকবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আরও পড়ুন মাঠে বসে স্পেন-আর্জেন্টিনা ফাইনাল দেখবেন ট্রাম্প, পাহারায় যুদ্ধবিমান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ট্রাম্প খেলা শেষে ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে যৌথভাবে বিজয়ী দলের অধিনায়কের হাতে সোনাল
যুক্তরাষ্ট্রে কড়া নিরাপত্তায় বসে যখন আর্জেন্টিনা-স্পেনের মধ্যকার ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল নিয়ে মাতোয়ারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ঠিক তখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে অকাতরে প্রাণ হারাচ্ছেন মার্কিন সেনারা। একদিকে ভিআইপি গ্যালারিতে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর উদযাপনের আলো, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে মার্কিন ইউনিফর্মে লাগছে রক্তের দাগ। একই সময়ে হোয়াইট হাউজের এই বৈপরীত্য নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।
গ্যালারিতে ট্রাম্প, পাহারায় স্নাইপার-যুদ্ধবিমান
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রোববার (১৯ জুলাই) বিশ্বকাপের সবচেয়ে জমকালো ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফুটবল দুনিয়ার চোখ এখন লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা এবং লামিন ইয়ামালের স্পেনের দ্বৈরথের দিকে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে সশরীরে গ্যালারিতে উপস্থিত থাকবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ট্রাম্প খেলা শেষে ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে যৌথভাবে বিজয়ী দলের অধিনায়কের হাতে সোনালি ট্রফি তুলে দেবেন। ট্রাম্পের এই উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে স্টেডিয়াম ও তার আশপাশের এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এই আয়োজনকে সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। স্টেডিয়ামের আকাশে সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান, ছাদে রয়েছে স্নাইপার দল। এফবিআই এরই মধ্যে নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে এমন শত শত ড্রোন জব্দ করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প/ ফাইল ছবি: হোয়াইট হাউজ
সম্প্রতি ট্রাম্প টাওয়ারে আয়োজিত এক ফিফা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প রসিকতা করে বলেছিলেন, আগামীতে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবেই বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পারে, যেখানে মেক্সিকো বা কানাডার সহযোগিতার প্রয়োজন পড়বে না। ফুটবল বিশ্বকাপের এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে প্রচার করছেন।
হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি কারোলিন লেভিটও দাবি করেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও নিরাপদ বিশ্বকাপ।
তবে ট্রাম্প যখন স্টেডিয়ামের জমকালো লাইট আর ফুটবল উৎসবে মেতে আছেন, ঠিক তখনই পেন্টাগন থেকে আসছে একের পর এক দুঃসংবাদ।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে ঝরছে রক্ত
ফুটবল মাঠের উৎসবের ঠিক উল্টো পিঠে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বলন্ত যুদ্ধক্ষেত্র। ইরানে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে, ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত এবং অনেক সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন। একজন সেনা এখনো নিখোঁজ।
গত শুক্রবার রাতে জর্ডানের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। সেন্টকম ঘাঁটির নাম প্রকাশ না করলেও ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা জর্ডানের আল আজরাক ঘাঁটিতে এই হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন সেনাদের সঙ্গে পিট হেগসেথ/ ফাইল ছবি: এক্স@হেগসেথ
মার্কিন সামরিক বাহিনী এখনো নিহতদের নাম প্রকাশ করেনি। তবে তারা জানিয়েছে, হামলা প্রতিহত করতে গিয়েই এই সেনাদের মৃত্যু হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম সরাসরি ইরানি হামলায় মার্কিন সেনাদের মৃত্যু হলো।
এই যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৬ জন মার্কিন সেনা নিহত হলেন। আহত হয়েছেন ৪৩০ জনেরও বেশি। অন্যদিকে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নিহতের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউজ দেশবাসীকে আরও বড় ক্ষয়ক্ষতির জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে আসছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বলেছেন, এ ধরনের বড় মাত্রার সামরিক অভিযানে হতাহতের ঘটনা এড়ানো অসম্ভব।
জনমনে অসন্তোষ ও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ
নতুন করে মার্কিন সেনাদের এই মৃত্যু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধ আরও বাড়াতে বাধ্য করতে পারে। শনিবার রাতে টানা অষ্টম রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে দীর্ঘস্থায়ী এই সামরিক অভিযান মার্কিন জনগণের কাছে ক্রমশ জনপ্রিয়তাহীন হয়ে পড়ছে।
যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, ‘সেনাদের এই আত্মত্যাগ আমাদের সংকল্পকে আরও শক্তিশালী করেছে।’ অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই মৃত্যুকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আবারও দাবি করেছেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না।
ইরান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাদের মরদেহ/ ফাইল ছবি: হোয়াইট হাউজ
এখন পর্যন্ত কত মার্কিন সেনা নিহত?
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৬ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে প্রথম ঘটনা ঘটে ১ মার্চ। কুয়েতের একটি বেসামরিক বন্দরে ইরানি ড্রোন হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন। একই দিনে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে আহত আরেক সেনা পরে মারা যান।
১২ মার্চ ইরাকে মার্কিন বাহিনীকে সহায়তাকারী একটি কেসি-১৩৫ প্লেন বিধ্বস্ত হলে আরও ছয় সেনা নিহত হন। এছাড়া ১ জুলাই আরব সাগরে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর এক পাইলট মারা যান। আর সর্বশেষ জর্ডানের ঘাঁটিতে নিহত হলেন আরও দুই মার্কিন সেনা।
উৎসবে ঢাকা পড়েছে কান্নার রোল
নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সির আকাশে এখন কানাডার দাবদাহের ধোঁয়া এবং বিশ্বকাপের আতশবাজির আলো মিশে একাকার। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ৮৫ হাজার দর্শক যখন ম্যারাডোনা-মেসির উত্তরসূরি কিংবা স্পেনের তরুণ তুর্কিদের পায়ের জাদু দেখতে বিভোর, তখন যুক্তরাষ্ট্রের হাজারও সেনা পরিবার টিভির পর্দায় তাকিয়ে আছেন আতঙ্কে।

ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পাশে ডোনাল্ড ট্রাম্প/ ছবি: এপি-ইউএনবি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন জেনেশুনেই ফুটবল বিশ্বকাপের এই উন্মাদনাকে ব্যবহার করছে দেশের ভেতরের যুদ্ধবিরোধী জনমতকে ধামাচাপা দিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের একটি বড় অংশ এখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে, কেন সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের এক যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের জীবন দিতে হচ্ছে? এই যুদ্ধের শেষ কোথায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের আসল অর্জন কী?
বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের প্রথমার্ধের বিরতিতে আজ ম্যাডোনা, শাকিরা, বিটিএস ও কোল্ডপ্লের মতো বিশ্বখ্যাত তারকাদের নিয়ে এক জমকালো কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে। সেই সুরের মূর্ছনা যখন বিশ্ববাসীকে মাতিয়ে রাখবে, তখন হয়তো পেন্টাগনের কোনো এক বদ্ধ ঘরে তৈরি হবে নিহত নতুন কোনো মার্কিন সেনার নামের তালিকা। ট্রাম্পের একহাতে থাকবে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি, আর অন্যহাতে থাকবে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সেনাদের কফিন গ্রহণের ফাইল।
ফুটবল উৎসবের এই আলো আর যুদ্ধক্ষেত্রের অন্ধকার— ২০২৬ সালের জুলাইয়ের এই দিনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের পাতায় এক চরম বৈপরীত্যের দলিল হয়ে থাকবে।
সূত্র: আল-জাজিরা, দ্য টেলিগ্রাফ
কেএএ/
What's Your Reaction?


