ফিফা বিশ্বকাপে যেমন ফুটবলাররা মূল আকর্ষণ, তেমনি ম্যাচ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রেফারিরা। চাপ ও দায়িত্বের কারণে তাদের পারিশ্রমিকও যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য।
বিশ্বকাপ সামনে রেখে ফুটবল বিশ্ব যখন তারকা খেলোয়াড়, আয়োজক শহর ও শিরোপাপ্রত্যাশী দলগুলো নিয়ে ব্যস্ত, তখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠী থাকবে কঠোর নজরদারিতে—রেফারি ও ম্যাচ কর্মকর্তারা।
তারা বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের ম্যাচ পরিচালনা করেন এবং অনেক সময় কয়েক সেকেন্ডের সিদ্ধান্তই পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে ৪৮ দল নিয়ে ১০৪ ম্যাচের এই বিশ্বকাপে আগের চেয়ে বেশি চাপ ও দায়িত্ব সামলাতে হবে ম্যাচ কর্মকর্তাদের।
রেফারিদের আয় কত?
ফিফা এবারের বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক বেতন প্রকাশ করেনি। তবে আগের বিশ্বকাপ ও বিদ্যমান পারিশ্রমিক কাঠামোর ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, রেফারিরা টুর্নামেন্টে উল্লেখযোগ্য অর্থ আয় করেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে শীর্ষ পর্যায়ের রেফারিরা টুর্নামেন্ট শুরুর আগে প্রায় ৭০ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৬ লাখ টাকা) বেস ফি পেয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এর পাশাপাশি প্রতিটি ম্যাচ পরিচালনার জন্য আলাদা ফি দেওয়া হয়, যা ম্যাচ ও দায়িত্ব অনুযায়ী প্রায় ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত (বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকা) হতে পারে। সহকারী রেফারি ও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিদেরও টুর্নামেন্ট ভাতা ও ম্যাচভিত্তিক পারিশ্রমিক দেওয়া হয়, তবে প্রধান রেফারিদের তুলনায় তা কিছুটা কম।
জানা গেছে, এবার রেফারিরা এককালীন ১ লাখ মার্কিন ডলার পাবেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১ কোটি ২২ লাখ টাকা।
এছাড়া ম্যাচ পিছু বেতনও এবার বাড়ছে, যার পরিমাণ দাঁড়াবে ১০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ১২ লাখ ৮২ হাজার টাকা); এর সঙ্গে থাকবে বোনাস।
ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বকাপ ফাইনালে যিনি দায়িত্বে থাকবেন, তিনি বিভিন্ন ম্যাচের দায়িত্ব মিলিয়ে প্রায় ৩ লাখ ডলার পাবেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৬৮ লাখ। সহকারী রেফারিরা পাবেন ২৫ হাজার ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৩০ লাখ টাকা।
এই বেতন বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি লাভ হবে ইংরেজ রেফারিদের, যাদের মধ্যে আছেন মাইকেল অলিভার ও অ্যান্থনি টেলর। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও এফএ কাপে খেলানোর সূত্রে তারা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড পান। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে জুড়বে বিশ্বকাপ খেলানোর টাকা।
সেমিফাইনাল বা ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনাকারীরা বোনাসসহ মোটে ছয় অঙ্কের (এক লাখ ডলারের বেশি) আয় করতে পারেন।
কেন রেফারিদের এত পারিশ্রমিক দেওয়া হয়?
আধুনিক ফুটবলে রেফারিদের দায়িত্ব ও চাপ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। খেলোয়াড়দের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি তাদের নিয়মের পরিবর্তন, ভিএআর প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শারীরিক ফিটনেস—সবকিছুতেই দক্ষ হতে হয়।
ফিফা নির্বাচনের আগে কঠোর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। ফিটনেস পরীক্ষা, ক্লাসরুম প্রশিক্ষণ, ভিডিও বিশ্লেষণ এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স রিভিউয়ের মাধ্যমে রেফারিদের নির্বাচন করা হয়।
টুর্নামেন্ট চলাকালীন তারা সপ্তাহজুড়ে ক্যাম্পে থাকেন এবং বিভিন্ন শহরে নিয়মিত যাতায়াত করেন। কার্যত তারা পুরো সময়টাই ফিফার পূর্ণকালীন কর্মচারীর মতো দায়িত্ব পালন করেন।
এবার ফিফা রেফারিং উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। আধুনিক প্রযুক্তি, আধা-স্বয়ংক্রিয় অফসাইড সিস্টেম, উন্নত ভিএআর প্রোটোকল এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে এই বিশ্বকাপে।
অনেক রেফারির জন্য আর্থিক লাভের চেয়ে বড় বিষয় হলো বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের সম্মান। কারণ খুব অল্প সংখ্যক রেফারিই এই টুর্নামেন্টে সুযোগ পান, যা তাদের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ অর্জন হিসেবে মনে করেন।
বিশ্বকাপ কোটি কোটি দর্শকের সামনে অনুষ্ঠিত হবে, ফলে রেফারিদের সিদ্ধান্ত আবারও বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। তাদের একেকটি সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণেও প্রভাব ফেলতে পারে—আনতে পারে ইতিহাস, বিতর্ক কিংবা নতুন অধ্যায়।