বিশ্ব রাজনীতিতে ‘বামাতঙ্ক’: বর্তমান সংকটের উৎস?
মধ্যযুগের প্রখ্যাত সুফি সাধক, সংগীতজ্ঞ, কবি আমির খসরু মনে করতেন, ‘Every pearl in the royal crown is but a crystallized drop of blood fallen from the tearful eyes of poor peasant” এই নিষ্ঠুর সত্যকেই ভাঙতে চেয়েছিলেন সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী বিপ্লবীরা। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, বরং সাধারণ জনগণকে অধিক সম্পৃক্ত করার এক নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার কথাই চিন্তা করেছিলেন। বিপ্লবের প্রাণপুরুষ ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন বলেছিলেন, “একমাত্র তিনিই ক্ষমতা জয় করবেন, ধরে রাখবেন- যিনি জনগণের উপর বিশ্বাস রাখেন এবং জনগণের কর্মক্ষমতায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।” কিন্তু পারেন নাই তারা সেই স্বপ্ন পূরণ করতে। বহুগুলো কারণে আমাদের কাছে মনে হয়েছে সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে এবং গুটিয়ে যাচ্ছে। তারও কিছু কারণ ছিল। এই ব্যবস্থা অর্থনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো জনগণকে সম্পৃক্ত করার বদলে শক্তহাতে দমন করতে চেষ্টা করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ঠুর সত্যকে অপসারণ করতে গিয়ে নিজেরাই নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছিলেন। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্ট্যালিন বা কম্বোডিয়ার পলপটের মত দমনপীড়নকারীদের হাতে সমাজতন্
মধ্যযুগের প্রখ্যাত সুফি সাধক, সংগীতজ্ঞ, কবি আমির খসরু মনে করতেন, ‘Every pearl in the royal crown is but a crystallized drop of blood fallen from the tearful eyes of poor peasant” এই নিষ্ঠুর সত্যকেই ভাঙতে চেয়েছিলেন সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী বিপ্লবীরা। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, বরং সাধারণ জনগণকে অধিক সম্পৃক্ত করার এক নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার কথাই চিন্তা করেছিলেন। বিপ্লবের প্রাণপুরুষ ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন বলেছিলেন, “একমাত্র তিনিই ক্ষমতা জয় করবেন, ধরে রাখবেন- যিনি জনগণের উপর বিশ্বাস রাখেন এবং জনগণের কর্মক্ষমতায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।”
কিন্তু পারেন নাই তারা সেই স্বপ্ন পূরণ করতে। বহুগুলো কারণে আমাদের কাছে মনে হয়েছে সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে এবং গুটিয়ে যাচ্ছে। তারও কিছু কারণ ছিল। এই ব্যবস্থা অর্থনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো জনগণকে সম্পৃক্ত করার বদলে শক্তহাতে দমন করতে চেষ্টা করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ঠুর সত্যকে অপসারণ করতে গিয়ে নিজেরাই নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছিলেন। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্ট্যালিন বা কম্বোডিয়ার পলপটের মত দমনপীড়নকারীদের হাতে সমাজতন্ত্রের মহত্ত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এ ছাড়াও পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমের ঘেউ ঘেউ বিশ্বের মানুষকে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছিল।
সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপ সমাজতন্ত্রকে পৃথিবী থেকে উৎখাতের জন্য ভয়াবহ সব নীতি অবলম্বন করেছিল। সমাজতন্ত্র তাদের কাছে অ্যালার্জি, তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। তারা সমাজতন্ত্রকে মুছে ফেলতে গোপন অপারেশন, প্রকাশ্য অপারেশন এমনকি যুদ্ধ করতেও দ্বিধা করেনি। ৭০ বছরের শীতল যুদ্ধে দেশে দেশে কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালা হয়েছে ইনসার্জেন্সির পেছনে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে প্রচার-প্রচারণা, থিংক ট্যাংক, রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠনের পেছনে। সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে ধর্মানুভূতি এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আমরা পাগলা, কথার ঠিক নেই, অসংলগ্ন এসব যাই বলি না কেন, প্রকৃতপক্ষে তার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুগভীর চিন্তার প্রতিফলন। লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকানরা সমালোচনার পরও ট্রাম্পকেই প্রয়োজনের সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ভোট দিয়ে দিচ্ছে। বুঝতে কোনোই কষ্ট নেই যে বামাতঙ্কই বর্তমান বিশ্বের অপতৎপরতার পেছনে অন্যতম কারণ।
দক্ষিণ আমেরিকায়, আফ্রিকায়, দূরপ্রাচ্যে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় অগণিত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে শুধু সমাজতন্ত্রকে দাবিয়ে রাখতে গিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের ধন-সম্পদ-শক্তি যত বেড়েছে, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন তত পিছিয়ে পড়েছে। প্রতিটি ছোট-বড় দেশ এবং এসব দেশের প্রতিটি আনাচে কানাচে খোঁজ রেখেছে পশ্চিমারা। প্রশ্ন থাকতে পারে, কেন সমাজতন্ত্রকে উৎখাত করার এই প্রাণপণ চেষ্টা, এত ভয়? এক কথায় উত্তর হল, ধনাঢ্য ও শাসক শ্রেণির ধন সম্পদ ও ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা। সমাজতন্ত্রের কিছু দুর্বলতা, ধর্মের ব্যবহার এবং অশিক্ষিত সমাজের অপবিশ্বাস তুরুপের তাসের মত ব্যবহার করা হয়েছে।
এক সময় কিন্তু সত্যিই মনে হয়েছিল সমাজতন্ত্র চলেই গেল। বিশেষ করে ৯০ দশকের শুরুতে হঠাৎ করেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর। কিন্তু ছাইয়ের নিচে চাপা পড়া আগুন যেমন দাহ্য পদার্থ পেলে আবার দাউ দাউ করে জ¦লে উঠতে পারে, তেমনি কোনো আদর্শও আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। সেই চাপা পড়া আগুনের আভা এখন পরিলক্ষিত হচ্ছে ভিন্ন আঙ্গিকে, ভিন্ন রূপে। অবস্থা এখন ঘুরতে শুরু করেছে। আর সে কারণেই বিশ্ব এখন উত্তপ্ত। সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান যুদ্ধ বামাতঙ্কের পরোক্ষ পরিণতি।
পশ্চিমা জোয়ারে চাপা পড়া একখণ্ড আগুনের নাম ছিল ভ্লাদিমির পুতিন। মনেপ্রাণে সমাজতান্ত্রিক পুতিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া মেনে নিতে পারেননি। এই লৌহমানব ক্ষমতার শীর্ষে উঠে এসে নতুন গণতান্ত্রিক মোড়কে সমাজতন্ত্রের বলয়কে আবার চাঙা করতে অনেকটাই খোলামেলা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পরার পর আর কখনোই যাতে তা মাথা চারা দিতে না পারে সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র তথা ন্যাটো রাশিয়াকে ঘিরে ফেলতে চেষ্টা করে। পুতিন প্রথমে ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে মজবুত করতে পেরেছেন অল্প কয়েক বছরে। ইউক্রেন যখন রাশিয়ার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় এবং ন্যাটোতে যোগদানের সব আয়োজন সেরে ফেলে, তখন পুতিনকে বাধ্য হয়ে ইউক্রেন আক্রমণ করতে হয়। সে যুদ্ধ চলছে।
অন্যদিকে ঘুমিয়েছিল চিন। নোপোলিয়ন বোনাপার্ট, কুইন্সল্যান্ডের প্যাট্রিক ও’ সুলিভান অথবা অলিভার ক্রমওয়েল- কেউ যদি চিনকে ঘুমন্ত দৈত্য নাও বলে থাকেন, তাতে কিছু আসে যায় না। চিন প্রথমে ঘুমন্ত এবং পরে অর্ধনিলীমিত চোখে দেখেছে বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের ঘরগুলো ভেঙে পরতে। কিন্তু দেশটি জানতো অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন না করা গেলে টিকে থাকা যাবে না। তাই ঠান্ডা মাথায় এতকাল সেদিকেই নজর রেখেছিল। বিশেষ করে শি জিনপিং ক্ষমতা গ্রহণের পর চিন শুধু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতিই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কাছাকাছি চলে গিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের হিসাব, ২০৩০ সালে তারা ছাড়িয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে। চিন এখন বিশ্ববাসীর কাছে নতুন বিস্ময়। সামরিক থেকে শুরু করে কৃষি সর্বক্ষেত্রে চিন এখন বিশ্বের জন্য মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজার ব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক সক্ষমতা সবকিছুর ব্যাপক সংস্কার করে চিন এখন আলোচনার কেন্দ্রে। তাই উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র।
যে কোনো দেশের উন্নয়নে জ্বালানি হল শরীরের রঙের মতো প্রয়োজন। পশ্চিমারা বুঝতে পেরেছে চিনের জ্বালানি লাইন বাধাগ্রস্ত করতে হবে। তাই প্রথমে ভেনিজুয়েলায় আক্রমণ করে যা করল তা সবাই জানেন। চিন কপাল ভাজ করে তা দেখলেও বিশেষ কোনো বাক-বিতণ্ডায় জড়ায়নি। চিন ভেনিজুয়েলা থেকে তার মোট প্রয়োজনের ৩ শতাংশ জোগাড় করতো। এখন মাদুরোকে অপসারণ ও বন্দী করে নেওয়ার পর ভেনিজুয়েলার তেল বস্তুত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র নানা ছুতোয় ইরানের দিকে দৃষ্টি দেয়।
ইরান চিনের অন্যতম তেলের উৎস। কিন্তু এবার আর চিন হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেনি। পেছন থেকে ইরানকে সীমিত সহায়তা দিয়েছে বিশেষ করে সাইবার প্রযুক্তি, ইনফরমেশন, নেভিগেশন এসব ব্যাপারে। আর তাতেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে যে ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তাতে ভয়ানক ধাক্কা খেয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে চিন নিজের স্বার্থেই ইরানকে রক্ষায় প্রয়োজনে আরো কয়েক পা এগিয়ে আসবে যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধটি কঠিন করে তুলবে। যে কারণে হুমকি ধামকি দিলেও আর যুদ্ধে নামছে না। কিন্তু ইতোমধ্যেই ইরানের অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছে, যা চিনের তেল সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করবে। যত কথাই বলুক, এটাই যুক্তরাষ্ট্রের অনেরকগুলোর মধ্যে একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল।
এদিকে ইউরোপে চিন ও রাশিয়ার রাজনৈতিক সমর্থক বাড়ছে। সম্প্রতি বুলগেরিয়ায় পুতিন পন্থী জয়ী হয়েছেন। স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেড্রো স্যানচেজের নেতৃত্বে সম্প্রতি বার্সেলোনায় হয়ে গেল সমাজতান্ত্রিক নেতাদের একটি সম্মেলন। বলা যায় বহুকাল পরেই এটা আরেকটা শুরু। সেখানে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া সেঁইবামসহ এক ডজেনেরও বেশি নেতা উপস্থিত ছিলেন।
ইউরোপের দেশগুলো বাস্তবতা বুঝে চিনের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেষ্টা করছে। সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলর, ফরাসি প্রেসিডেন্ট, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সবাই অতি আন্তরিকতার সঙ্গে চিন সফর করেছেন এবং শি’র সঙ্গে আলোচনা করেছেন। বিশে^র অনেক ছোট বড় দেশ যদি চিনের পলিসি ফলো করে এবং নিজেদের দেশে বাস্তবায়ন করতে চায় তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ঠিক এই ভয়েই প্রতিযোগিতা, সংঘাত ও যুক্তরাষ্ট্রের অস্থিরতা তীব্র হয়ে উঠছে। কারণ, আর যাই হোক তারা বিশ্বের কোথাও সমাজতন্ত্র মেনে নিতে রাজি নয়। যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছে। সেটাও বামাতঙ্কের কারণে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আমরা পাগলা, কথার ঠিক নেই, অসংলগ্ন এসব যাই বলি না কেন, প্রকৃতপক্ষে তার পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সুগভীর চিন্তার প্রতিফলন। লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকানরা সমালোচনার পরও ট্রাম্পকেই প্রয়োজনের সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ভোট দিয়ে দিচ্ছে। বুঝতে কোনোই কষ্ট নেই যে বামাতঙ্কই বর্তমান বিশ্বের অপতৎপরতার পেছনে অন্যতম কারণ।
লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
এইচআর/এএসএম
What's Your Reaction?