বিয়ের নামে ২ মাসের কন্যাসন্তান বিক্রি, নিয়ে যাবে ৮ বছর হলেই!
সীমার বয়স এখন মাত্র ১৮ বছর। তবে এই অল্প বয়সের মধ্যেই তিনি চার সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। তার কোলজুড়ে থাকা সবচেয়ে ছোট সন্তানটি নবজাতক, আর বড়টির বয়স মাত্র চার বছর। আফগানিস্তানের বাদঘিস প্রদেশের একটি মাটির ঘরে সন্তানদের নিয়ে বাস করেন সীমা। জীবনের গল্প বলতে গিয়ে তিনি জানান, ‘তালেবান ক্ষমতায় আসার সময় আমি ষষ্ঠ শ্রেণি পাস করে সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু এর দুই মাস পরেই বাবা আমাকে চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ দিতে থাকেন। বাবার মারধরের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত আমি বাধ্য হই।’ আরও পড়ুন বেঁচে থাকার জন্য সন্তান বিক্রি, কেন এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন আফগানরা? মাত্র ১৩ বছর বয়সে বধূ সেজে এই বাড়িতে এসেছিলেন সীমা। এখানেই জন্ম নিয়েছে তার চার সন্তান, যার মধ্যে একজন নিউমোনিয়ায় ভুগে এক বছর বয়সে মারা গেছে। পানি আনা, গরু চরানো থেকে শুরু করে নান রুটি বানানো—সব কাজ একাই করতে হয় সীমাকে। আর কাজ করার সময় মায়ের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে তার কোলের শিশুরা। বাড়ছে শিশু মায়ের সংখ্যা সীমার এই গল্প এখন আর আফগানিস্তানে কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। দেশটির উত্তরাঞ্চলের একটি সরকারি হাসপাতালের স্বাস
সীমার বয়স এখন মাত্র ১৮ বছর। তবে এই অল্প বয়সের মধ্যেই তিনি চার সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। তার কোলজুড়ে থাকা সবচেয়ে ছোট সন্তানটি নবজাতক, আর বড়টির বয়স মাত্র চার বছর। আফগানিস্তানের বাদঘিস প্রদেশের একটি মাটির ঘরে সন্তানদের নিয়ে বাস করেন সীমা।
জীবনের গল্প বলতে গিয়ে তিনি জানান, ‘তালেবান ক্ষমতায় আসার সময় আমি ষষ্ঠ শ্রেণি পাস করে সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু এর দুই মাস পরেই বাবা আমাকে চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ দিতে থাকেন। বাবার মারধরের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত আমি বাধ্য হই।’
মাত্র ১৩ বছর বয়সে বধূ সেজে এই বাড়িতে এসেছিলেন সীমা। এখানেই জন্ম নিয়েছে তার চার সন্তান, যার মধ্যে একজন নিউমোনিয়ায় ভুগে এক বছর বয়সে মারা গেছে। পানি আনা, গরু চরানো থেকে শুরু করে নান রুটি বানানো—সব কাজ একাই করতে হয় সীমাকে। আর কাজ করার সময় মায়ের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে তার কোলের শিশুরা।
বাড়ছে শিশু মায়ের সংখ্যা
সীমার এই গল্প এখন আর আফগানিস্তানে কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। দেশটির উত্তরাঞ্চলের একটি সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই সেখানে ৪২ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকা সন্তানের জন্ম দিয়েছে।
এদের মধ্যে ছয়জন দ্বিতীয়বারের মতো মা হয়েছে। পাঁচজনের ছিল জরায়ুর বাইরে বিপজ্জনক গর্ভধারণ (একটোপিক প্রেগন্যান্সি), যা মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। ১৮ জনের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে এবং দুই কিশোরী মা প্রসববেদনা সহ্য করতে না পেরে মারা গেছে।

সংকটের মধ্যেও কৃষিতে ভরসা আফগান নারীরা
তালেবান সরকারের নীতি এবং তীব্র মানবিক সংকটের কারণে আফগানিস্তানে বাল্যবিয়ে এখন মহামারির রূপ নিয়েছে। পরিবারের ঋণ শোধ করতে কিংবা দুমুঠো খাবারের জোগাড় করতে বাবা-মা তাদের কন্যাসন্তানদের বিক্রি করে দিচ্ছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ ও ‘জান টাইমস’ পশ্চিম আফগানিস্তানের এমন আরও তিনটি পরিবারের সন্ধান পেয়েছে, যারা ঋণমুক্ত হতে নয় বছরের কম বয়সী কন্যাসন্তানদের বিয়ের নামে বিক্রি করে দিয়েছে। এর মধ্যে একটি শিশুকে মাত্র দুই মাস বয়সে বাগদান করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, মেয়েদের বয়স সাত থেকে নয় বছর হলেই তাদের স্বামীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
তালেবান আমলে অন্ধকার ভবিষ্যৎ
দক্ষিণ এশিয়ায় সামগ্রিকভাবে বাল্যবিয়ে কমলেও আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। শবনম নামে এক ধাত্রী বলেন, ‘নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিশু মায়েদের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। আগে মাসে হয়তো দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক গর্ভবতী আসত, যারা ছিল মূলত অশিক্ষিত পরিবারের। কিন্তু এখন শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব পরিবারই অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছে।’
শবনম ২০২৪ সালের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করেন। ১৩ বছরের একটি মেয়ে গর্ভপাতের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ নিয়ে তার কাছে এসেছিল। শাবনম যখন মেয়েটির মায়ের কাছে জানতে চাইলেন, কেন তিনি ৩০ বছর বয়সী এক পুরুষের সঙ্গে ১৩ বছরের মেয়ের বিয়ে দিলেন? মা জবাবে বলেছিলেন, ‘বাকি সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখতে আমাকে আমার একটা সন্তানকে কোরবানি দিতে হয়েছে।’
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় অফিসের (OCHA) জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রতি এক লাখ জীবিত শিশু জন্মদানের বিপরীতে মাতৃমৃত্যুর হার ৬০০ জন। অথচ প্রতিবেশী ইরানে এই সংখ্যা ১৬ এবং পাকিস্তানে ১৫৫।
তালেবান ক্ষমতায় আসার পর ষষ্ঠ শ্রেণির ওপরে মেয়েদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করায় ২২ লাখের বেশি আফগান কিশোরী বিদ্যালয় থেকে ছিটকে পড়েছে। একটি মানবাধিকার সংস্থার জরিপ বলছে, স্কুল বন্ধ হওয়ার পর প্রায় ৭০ শতাংশ মেয়ে জোরপূর্বক বিয়ের শিকার হয়েছে।
কন্যাসন্তানই যখন ঋণ পরিশোধের মাধ্যম
আফগানিস্তানের বর্তমান আইন অনুযায়ী বিয়ের কোনো সর্বনিম্ন বয়সসীমা নেই। এদিকে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশটির ৮০ শতাংশের বেশি পরিবার ঋণে জর্জরিত। আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে শত শত স্বাস্থ্য ক্লিনিক। এই চরম দারিদ্র্যের শিকার হয়ে অভিভাবকেরা তাদের কন্যাসন্তানদের শৈশবকেই বিক্রি করে দিচ্ছেন।
৫৭ বছর বয়সী গোলনার তার এক বছর বয়সী নাতনিকে কোলে নিয়ে কাঁদছিলেন। দেনাদারদের হাত থেকে বাঁচতে শিশুটির বাবা পালিয়ে যাওয়ার পর ঋণের টাকা শোধ করতে নাতনিকে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
গোলনার বলেন, ‘ওর বয়স আট বছর হলেই ওরা এসে নিয়ে যাবে। অগ্রিম এক লাখ আফগানি দিয়েছে, নিয়ে যাওয়ার সময় আরও এক লাখ দেবে। ঋণের দায়ে আমরা টাকাটা সরাসরি মহাজনকে দিয়ে দিয়েছি।’
৪৪ বছর বয়সী সাবজাও তাঁর সাত বছরের মেয়েকে বিক্রি করেছিলেন চার বছর আগে, যখন শিশুটির বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। ঋণের বোঝা ও অসুস্থ স্বামীর মুখে খাবার তুলে দিতে তিন লাখ আফগানির বিনিময়ে এই চুক্তি হয়। আগামী বছরই মেয়েটিকে নিয়ে যাবে পাত্রপক্ষ।
কান্নায় ভেঙে পড়ে সাবজা বলেন, ‘যখন ভাবি আর মাত্র একটা বছর পর আমার বুক থেকে মেয়েটাকে কেড়ে নেওয়া হবে, তখন মনে হয় আকাশটা আমার মাথার ওপর ভেঙে পড়ছে।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
কেএএ/
What's Your Reaction?



