বৃষ্টিঝরা শ্রাবণ বাঙালির এক শোক অধ্যায় 

জীবনের শেষ দিনগুলোয় অসুখে ভুগছিলেন কবি। সারা জীবন চিকিৎসকের কাঁচি থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছেন, এবার বুঝি আর তা সম্ভব নয়। হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি চলছেই। কিন্তু কিছুতে কিছু হচ্ছে না। শান্তিনিকেতনে ছিলেন তখন। এরই মধ্যে অবনীন্দ্রনাথ বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। সেগুলো পড়ে দারুণ আনন্দ পেলেন কবি। বললেন, আরও লিখতে। অবন ঠাকুর রাণী চন্দকে গল্প বলে যান, রাণী চন্দ সে গল্প শুনে লিখে ফেলেন। তারই কিছু আবার দেওয়া হলো রবীন্দ্রনাথকে। তিনি পড়লেন, হাসলেন এবং কাঁদলেন। রাণী চন্দ এই প্রথম এমন করে রবিঠাকুরের চোখ থেকে জল পড়তে দেখলেন। রাণী চন্দ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয়ভাজন, শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী ও চিত্রশিল্পী এবং রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সচিব অনিল চন্দের স্ত্রী। চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের কথাই বললেন। রবীন্দ্রনাথের তাতে মত নেই। তিনি বললেন, ‘মানুষকে তো মরতেই হবে একদিন। একভাবে না একভাবে এই শরীরের শেষ হতে হবে তো, তা এমনি করেই হোক না শেষ। মিথ্যে এটাকে কাটাকুটি ছেঁড়াছিঁড়ি করার কী প্রয়োজন?’ রবীন্দ্রনাথের শেষের দিনগুলো বললে প্রথমেই আসবে ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস। তখন রবীন্দ্রনাথের কিডনির সমস্যা প্রকট আকার ধারণ কর

বৃষ্টিঝরা শ্রাবণ বাঙালির এক শোক অধ্যায় 

জীবনের শেষ দিনগুলোয় অসুখে ভুগছিলেন কবি। সারা জীবন চিকিৎসকের কাঁচি থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছেন, এবার বুঝি আর তা সম্ভব নয়। হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি চলছেই। কিন্তু কিছুতে কিছু হচ্ছে না। শান্তিনিকেতনে ছিলেন তখন। এরই মধ্যে অবনীন্দ্রনাথ বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। সেগুলো পড়ে দারুণ আনন্দ পেলেন কবি। বললেন, আরও লিখতে। অবন ঠাকুর রাণী চন্দকে গল্প বলে যান, রাণী চন্দ সে গল্প শুনে লিখে ফেলেন। তারই কিছু আবার দেওয়া হলো রবীন্দ্রনাথকে। তিনি পড়লেন, হাসলেন এবং কাঁদলেন। রাণী চন্দ এই প্রথম এমন করে রবিঠাকুরের চোখ থেকে জল পড়তে দেখলেন।

রাণী চন্দ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয়ভাজন, শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী ও চিত্রশিল্পী এবং রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সচিব অনিল চন্দের স্ত্রী। চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের কথাই বললেন। রবীন্দ্রনাথের তাতে মত নেই। তিনি বললেন, ‘মানুষকে তো মরতেই হবে একদিন। একভাবে না একভাবে এই শরীরের শেষ হতে হবে তো, তা এমনি করেই হোক না শেষ। মিথ্যে এটাকে কাটাকুটি ছেঁড়াছিঁড়ি করার কী প্রয়োজন?’

রবীন্দ্রনাথের শেষের দিনগুলো বললে প্রথমেই আসবে ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস। তখন রবীন্দ্রনাথের কিডনির সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু সেই যাত্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। 

১৯৪০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শান্তিনিকেতন থেকে কালিম্পংয়ে পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর কাছে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কালিম্পংয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে রবীন্দ্রনাথ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসা দিতে ছুটে আসেন দার্জিলিংয়ের সিভিল সার্জন। রক্তপরীক্ষার পর দেখা গেল প্রস্টেট গ্ল্যান্ডে সমস্যা। দ্রুতই অস্ত্রোপচার করতে হবে। কলকাতা থেকে চিকিৎসক নিয়ে কালিম্পংয়ে গেলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ। রবীন্দ্রনাথকে কলকাতায় আনা হলো অজ্ঞান অবস্থায়। এ সময় প্রায় এক মাস শয্যাশায়ী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। একটু সুস্থ হয়েই রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন ফিরে যেতে ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে ১৮ নভেম্বর শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেন। 

শান্তিনিকেতনে উদয়ন বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, নার্স রাখা হলো। তখন তার শারীরিক অবস্থাও ভালো নয়। রবীন্দ্রনাথ নিজ হাতে লিখতে পারতেন না বলে শ্রুতিলিখনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সচিব অনিলকুমার চন্দের স্ত্রী ও রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা রাণী চন্দকে দিয়ে লেখাতেন। এসময় রবীন্দ্রনাথ বেশ কয়েকটি কবিতার সৃষ্টি করেছিলেন।

এরই মধ্যে রবীন্দ্রনাথের প্রস্টেট গ্ল্যান্ডের সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করল। কয়েকদিনের মাথায় তার সুস্থ হওয়া নিয়ে সবাই সন্দিহান হয়ে উঠলেন। কারণ কিছুতেই রোগের উপশম হচ্ছে না। হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি, কবিরাজি কোন ধরনের ওষুধেই কাজ হচ্ছে না। অপারেশনে একটি ভরসা ছিল কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অপারেশনের বিষয়ে ঘোর আপত্তি।

১৯১৬ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ চিকিৎসা করছিলেন প্রখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক স্যার নীলরতন সরকার। বলে রাখা ভালো স্যার নীলরতনও চাননি রবীন্দ্রনাথের এই বয়সে অপারেশন হোক। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ অপারেশন পরবর্তী ধকল নিতে পারবেন না বলেই তার ধারনা। তাই তিনি ঔষধ চালিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মত দিয়েছিলেন। হঠাৎ স্ত্রী মারা যাওয়ায় গিরিডিতে চলে যান তিনি। 

দেখা যাক, আরও কিছুদিন দেখা যাক এই ভেবে আরও কিছুকাল কাটল। এই সুস্থ তো এই অসুস্থ এই অবস্থা তখন রবীন্দ্রনাথের। ১৬ জুলাই রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য শান্তিনিকেতনে আসেন ডা. বিধানচন্দ্র রায়, ডা. ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডা. ইন্দুভূষণ বসু। আলোচনার এক পর্যায়ে বিধানচন্দ্র রায় রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন, 'আপনি আগের থেকে একটু ভালো আছেন। সে কারণে অপারেশনটা করিয়ে নিতে পারলে ভালো হবে, আর আপনিও সুস্থ বোধ করবেন।’ সবাই অপারেশনের পক্ষে মত দিলে রবীন্দ্রনাথ সবার অনুরোধে রাজি হলেন। এরপরই সিদ্ধান্ত হলো রবীন্দ্রনাথের অপারেশন করা হবে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে।

১৩৪৮ সনের ৯ শ্রাবণ (ইংরাজি ২৫ জুলাই, ১৯৪১ সাল) ভোরবেলাতেই পোশাক পরে তৈরি রবীন্দ্রনাথ। বসে আছেন শান্তিনিকেতনের উদয়নের পুবদিকের জানালার কাছে। শান্তিনিকেতনের শেষ ভোরকে যেন শেষবেলার ইন্দ্রিয় দিয়ে শুষে নিচ্ছেন। শান্তিনিকেতনের সঙ্গে সত্তর বৎসরের স্মৃতি জড়িত; কবি কি বুঝতে পেরেছিলেন এ-ই তার শেষ যাত্রা? সকাল থেকে শান্তিনিকেতনের আশ্রমিকদের মনে ‘অতলবিরহ’। অসুস্থ গুরুদেব যাবেন কলকাতায়। চিকিৎসার জন্য। সকাল থেকেই তারা ভিড় জমাচ্ছিলেন শান্তিনিকেতনের ‘উদয়ন’ ভবনের সামনে। কণ্ঠে গান- ‘এ দিন আজি কোন্‌ ঘরে গো খুলে দিল দ্বার/আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হল কার...’ গাইতে গাইতে তারা উদয়নের ফটক পেরিয়ে কবির জানালার নিচে এসে দাঁড়াল। 

কবি জানালার পাশে বসে ছেলেমেয়েদের ভালোবাসা গ্রহণ করলেন। এরা একদিনও অসুস্থ গুরুদেবের কাছে আসতে পারেনি। তাদের নিরুচ্চার প্রার্থনায় কবি অশ্রুভেজা হয়ে উঠলেন। কেন এত রক্তমাংসের আবেগ হচ্ছে তার, বুঝতে পারছেন না। শান্তিনিকেতন ছেড়ে যেতে তার মন চাইছে না। মনে হচ্ছে এই-ই শেষ যাত্রা। স্বপ্নের পৃথিবীতে আর ফেরা হবে না। কত স্মৃতি মনে ভিড় করছে। কেউ তার ভেতরটা পড়ে দেখছে না! কর্মকর্তারা তাকে সুস্থ করার নামে কেন আশ্রমের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে?

ক্রমে সময় হয়ে এল। বুকটা ব্যথায় টনটন করছে কবির। অসুস্থ কবিকে ইজিচেয়ারে করে নামিয়ে আনা হলো নিচে। উদয়ন প্রাঙ্গণে তিনি একটু অপেক্ষা করলেন। কালো দীঘল টানা টানা চোখে কালো রোদ চশমা। আশপাশ থেকে সেই দৃশ্য দেখে শান্তিদেব ঘোষ একা একাই ফুঁপিয়ে উঠলেন। তার মনে হলো- বিদায়বেলার বেদনা তাকে কাঁদাচ্ছে। সেই কান্না আড়াল করার জন্যই গুরুদেব কালো চশমা পরেছেন। 

রবীন্দ্রনাথকে তোলা হলো গাড়িতে। আশ্রমিকরা গেয়ে উঠলেন- ‘আমাদের শান্তিনিকেতন আমাদের সব হতে আপন...’। উদয়নের সামনে আশ্রমিকরা সব জোড়হাতে দাঁড়িয়ে। রাস্তার দু’পাশে মানুষ তাকে প্রণতি জানাচ্ছে। আশ্রমের ভেতর দিয়ে চললো গুরুদেবের গাড়ি। অনেক দিন ঘর থেকে বেরোননি। গালের নিচে হাত দিয়ে চশমা চোখে আধশোয়া অবস্থায় কবি সব দেখতে দেখতে চলেছেন। ছাতিমতলা, আম্রকুঞ্জ পার হতে হতে কবির শুকনো গালে গড়িয়ে পড়ল অশ্রুধারা। জীবনে প্রিয়জন-বিচ্ছেদের এত শোক পেয়েছেন, সহ্য করার ক্ষমতা ছিল তার অসম্ভব। কিন্তু আশ্রম পার হতে হতে রবীন্দ্রনাথ মনে মনে কাতর হয়ে পড়লেন। দূরদর্শী মানুষটি কি আর তার ভাগ্যলিপি পড়তে পারেননি? বুঝেছিলেন, আশ্রমে আর ফেরা হবে না কোনো দিন। আশ্রমের প্রতিটি গাছপালাও যেন বিচ্ছেদ-কাতর।

গুরুদেবকে নিয়ে শান্তিনিকেতনের মেঠোপথ ধরে গাড়ি এগিয়ে গেল বোলপুর স্টেশনে। গাড়ি আশ্রম পেরিয়ে রাস্তায় পৌঁছতে দেখা গেল দু’পাশে গ্রামের মানুষ নীরব শ্রদ্ধা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। জোড়হাত কপালে ঠেকিয়ে তারা রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে প্রণাম জানাচ্ছেন। খুব ধীরে ধীরে গাড়ি চলেছে। যাতে কবির শরীরে কোনও ঝাঁকুনি না লাগে। অসুস্থ রবীন্দ্রনাথের কলকাতায় যাওয়ার খবরে উদ্বিগ্ন মানুষেরা নিজেরা খেটে রাস্তার খানাখন্দগুলো ভরাট করেছেন। সাধারণ মানুষের কাছে দেবতার সম্মান পেয়েছেন তিনি। খ্যাতির বদলে এই প্রীতিকেই রবীন্দ্রনাথ বরাবর বেশি মূল্য দিয়েছেন। তার অন্তরে যে তোলপাড় চলছিল, বাইরে থেকে কিছুই বোঝার উপায় নেই।

গাড়ি পৌঁছে গেল স্টেশনে। তৎকালীন ইআইআর রেলের কর্তা নিবারণ চন্দ্র ঘোষ ব্যবস্থা করে রেখেছেন বিশেষ সেলুন কারের। তাতে আছে পড়ার ঘর, বসার ঘর, দুটো শোবার ঘর, সেক্রেটারি ঘর, রান্নাঘর আর দুটো বাথরুম। স্ট্রেচারে বয়ে নিয়ে গিয়ে সেই সেলুন কারে তোলা হল কবিকে। পাকুর প্যাসেঞ্জার ট্রেনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে সেই সেলুন কার। নির্দিষ্ট সময় হাওড়ার জন্য ছাড়ল ট্রেন। শ্রাবণের শান্তিনিকেতন-বোলপুর ছেড়ে কবি চলে গেলেন কলকাতার দিকে। প্রথমে কিছুক্ষণ বসবার ঘরে চেয়ারে বসে জানলা দিয়ে পিছনে চলে যাওয়া বোলপুরের দিকে তাকিয়ে রইলেন গুরুদেব। একটু পরেই শোবার ঘরে শুইয়ে দেওয়া হলো তাকে। এভাবেই কবি হাওড়ায় পৌঁছলেন। কে জানত, এই তার শেষ যাওয়া? শান্তিনিকেতনে আর কোনোদিন ফিরবেন না তিনি।

তার আসার খবর গোপন রাখা হয়েছিল। স্টেশনে ফলে ভিড় হয়নি। নিউ থিয়েটার্স-এর বাস কথা মতো এসে হাজির। কবিকে নিয়ে বাস এবার ঢুকে পড়ল মহানগরে। জোড়াসাঁকোর দিকে একটু একটু করে এগিয়ে চলেছেন শয্যাশায়ী রবীন্দ্রনাথ। আনা হলো জোড়াসাঁকো বাড়িতে। 

রবীন্দ্রনাথ নিজে, ডাক্তার নীলরতন সরকার, কবিরাজ বিমলানন্দ তর্কতীর্থ ছিলেন অপারেশনের বিপক্ষে, কিন্তু ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়, ডাক্তার ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, ডাক্তার ইন্দুভূষণ বসু, ছিলেন অপারেশনের পক্ষে। শেষপর্যন্ত অপারেশনপন্থিরা জয়ী। 

২৬ জুলাই সকালটা বেশ আনন্দেই কাটল রবীন্দ্রনাথের। ৮০ বছরের কাকাকে দেখতে এলেন ৭০ বছর বয়সী ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কাকা আর ভাইপো মেতে উঠলেন ছোটবেলার নানা গল্পে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রবীন্দ্রনাথকে গ্লুকোজ ইনজেকশন দেওয়া হয়। ব্যথা অনুভব করে রবীন্দ্রনাথ বললেন, 'দ্বিতীয়া, গেল সব জ্বলিয়া'। সন্ধ্যার দিকেই হঠাৎ ভীষণ কাঁপুনি উঠল রবীন্দ্রনাথের। আধাঘণ্টা পর ঘুমিয়ে গেলেন তিনি। 

২৭ জুলাই সকালে রাণী চন্দকে দিয়ে শ্রুতিলেখনের মাধ্যমে ‘প্রথম দিনের সূর্য’ কবিতাটি লেখালেন রবীন্দ্রনাথ। এরপর রাণী চন্দের হাত থেকে খাতা নিয়ে নিজেই সংশোধন করলেন। রসিকতাও বাদ গেল না। উপস্থিত সবার উদ্দেশে বললেন, ‘ডাক্তাররা বড় বিপদে পড়েছে। কতভাবে রক্ত নিচ্ছে, পরীক্ষা করছে কিন্তু কোনো রোগই পাচ্ছে না তাতে। এ তো বড় বিপদ ডাক্তারদের। রোগী আছে, রোগ নেই।’

সেদিন ছিলো ২৯শে জুলাই। রবীন্দ্রনাথ আজও জানেন না আগামীকাল অপারেশানের দিন ঠিক হয়েছে। তার মন ভালো নেই বারবার বলছেন‚ এটা চুকে গেলেই বাঁচি। রোজই গ্লুকোজ ইঞ্জেকশন দেওয়া হচ্ছে। হঠাৎ বললেন রবীন্দ্রনাথ, সেই বড় খোঁচার ভূমিকাস্বরূপ এই ছোট ছোট খোঁচাগুলো আর কতদিন চালাবে? রবীন্দ্রনাথ শুনলেন‚ অস্ত্রোপচারের সময় তাকে অজ্ঞান করা হবে না। লোকাল অ্যানাসথেটিক দিয়ে তাকে অসাড় করা হবে। শুনে বললেন, আমাকে ঠিক করে বুঝিয়ে দাও ব্যাপারটা কী রকম হবে‚ আমার কতদূর লাগবে।

সেইদিনই সন্ধেবেলা অর্থাৎ অপারেশনের আগের দিন আরও একটি কবিতা মনে মনে রচনা করে মুখে বলে গেলেন রবীন্দ্রনাথ‚ লিখে নেবার জন্য---

দুঃখের আঁধার রাত্রি 
বারে বারে এসেছে আমার দ্বারে ‚
একমাত্র অস্ত্র তার দেখেছিনু
কষ্টের বিকৃত ভান্‚ ত্রাসের বিকট ভঙ্গি যত 
অন্ধকারে ছলনার ভূমিকা তাহার।
যতবার ভয়ের মুখোশ তার করেছি বিশ্বাস
ততবার হয়েছে অনর্থ পরাজয়
এই হার জিত খেলা- জীবনের মিথ্যা এ কুহক্‚
শিশুকাল হতে বিজড়িত পদে পদে 
এই বিভীষিকা 
দুঃখের পরিহাসে ভরা!
ভয়ের বিচিত্র চলচ্ছবি---
মৃত্যুর নিপুণ শিল্প বিকীর্ণ আঁধারে।

৩০ জুলাই ঠিক হয়েছিল তার দেহে অস্ত্রোপচার হবে। কিন্তু সেটা তাকে জানতে দেওয়া হয়নি। তিনি ছেলে রথীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কবে অপারেশন হবে’। রথীন্দ্রনাথ বললেন, ‘কাল-পরশু’। অস্ত্রোপচার হবে কবির অনিচ্ছাসত্ত্বেও কলকাতার ডাক্তারদের অনুরোধে। দুপুরে অস্ত্রোপচার হবে সকাল সাড়ে ন’টায় তিনি ঘুমে আচ্ছন্নতার মধ্যেই রাণী চন্দকে বললেন লিখে নিতে--- 
‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি বিচিত্র ছলনাজালে, হে ছলনাময়ী 
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুন হাতে 
সরল জীবনে’।

অপারেশনের সমস্ত কিছুই প্রস্তুত দুপুরবেলা। রবীন্দ্রনাথ ডাকলেন রাণী চন্দকে। বললেন, ‘লিখে নে আরও তিনটে লাইন, সকালবেলার কবিতাটির সাথে জুড়ে দিস’। রবীন্দ্রনাথ বলে গেলেন, লিখে নিলেন সেবিকা রাণ চন্দ- ‘অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে 
সে পায় তোমার হাতে 
শান্তির অক্ষয় অধিকার’। 

এ তিনটি লাইনই রবিঠাকুরের সর্বশেষ রচনা! ডা. ললিত এলেন একটু পরে। বললেন, ‘আজকের দিনটা ভালো আছে। আজই সেরে ফেলি, কী বলেন?’ হকচকিয়ে গেলেন কবি। বললেন, ‘আজই!’ তারপর বললেন, ‘তা ভালো। এ রকম হঠাৎ হয়ে যাওয়াই ভালো!’

বেলা ১১টায় স্ট্রেচারে করে অপারেশন-টেবিলে আনা হলো গুরুদেবকে। লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে অপারেশন করা হচ্ছে। ১১টা ২০ মিনিটের দিকে শেষ হলো অস্ত্রোপচার। ভারী আবহাওয়া উড়িয়ে দেওয়ার জন্য কবি রসিকতা করলেন, ‘খুব মজা, না?’

শরীরে যথেষ্ট যন্ত্রণা হয়েছিল অপারেশনের সময়। কিন্তু তা বুঝতে দেননি কবি। সেদিন ঘুমালেন। পরদিন ৩১ জুলাই যন্ত্রণা বাড়ল। গায়ের তাপ বাড়ছে। নিঃসাড় হয়ে আছেন। ১লা আগস্ট কথা বলছেন না কবি। অল্প অল্প জল আর ফলের রস খাওয়ানো হচ্ছে তাকে। চিকিৎসকেরা শঙ্কিত। ২রা আগস্ট কিছু খেতে চাইলেন না, কিন্তু বললেন, ‘আহ! আমাকে জ্বালাসনে তোরা’। 
 
৩রা আগস্টও শরীরের কোনো উন্নতি নেই। ৪ঠা আগস্ট সকালে চার আউন্সের মতো কফি খেলেন। জ্বর বাড়ল। ৫ই আগস্ট অপারেশনের পরে ধীরে ধীরে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, জ্ঞান নেই তার। সকলেই যখন বুঝতে পারছে কী ঘটতে চলেছে, তখনই গিরিডি থেকে খবর দিয়ে আনানো হয় কবির সুহৃদ ও বিশিষ্ট চিকিৎসক নীলরতন সরকারকে। ডা. বিধান রায়কে নিয়ে তিনি এসে নাড়ি দেখলেন, পরম মমতায় কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন, তারপরে উঠে দাঁড়ালেন। হেঁটে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে ডা. সরকারের দুচোখে ছিল জল!
 
৬ আগস্ট শ্রাবণ পূর্ণিমার রাত। বাড়িতে উৎসুক মানুষের ভিড়। হিক্কা উঠছিল গুরুদেবের। পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী ডাকছিলেন, ‘বাবা মশায়!’ একটু সাড়া দিলেন কবি। রাত ১২টার দিকে আরও অবনতি হলো কবির শরীরের। চারিদিকে চাঁদের আলোয় থইথই করছে। প্রতিমাদেবী বারান্দায় দাঁড়িয়ে টের পাচ্ছেন কোমল জোছনায় কার যেন কান্না লেগে আছে। উঠানে নিঝুম হয়ে আছে ডাক্তারের গাড়ি। বাবামশায়ের ঘরে আলো জ্বলছে। লোকজন পা-টিপে টিপে যাতায়াত করছে। খবর আসতে পারে যখন-তখন রবীন্দ্রনাথ চলে গিয়েছেন। মর্ত্যলোকের লীলা সাঙ্গ হয়েছে তার। ভরা শ্রাবণ আজ বৃষ্টি লুকিয়েছে। মানুষের চোখের জলে তাই বুঝি মাটি ভিজবে এবার। একা একা অঝোরে কাঁদছিলেন প্রতিমাদেবী। একসময় সুধাকান্ত ও রাণীচন্দ এসে তাকে বললেন, ‘চলুন একবার’। 

রবীন্দ্রনাথের ঘরের দিকে ধীরে ধীরে পা বাড়ালেন প্রতিমা। বাবামশায়ের কানের কাছে গিয়ে ডাকলেন একবার, ‘বাবামশাই, আমি...’ আর বলতে পারলেন না। বাবামশাইও কোনো উত্তর দিলেন না আর। 
বাবামশায়ের পাশে নিকট আত্মীয়েরা ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছেন। রাত বারোটার পরেই কবি যেন অনন্তের দিকে যাত্রা শুরু করলেন। রাণী চন্দ গুরুদেবের পায়ের কাছে বসে দেখলেন, রবীন্দ্রনাথের পূর্বমুখী শিয়রের ওপাশের আকাশে শান্ত, স্নিগ্ধ পূর্ণিমার চাঁদ। জোছনার চন্দন ঝরে পড়ছে বিশ্বকবির অনন্তলোকগামী দুই ডানায়, ওই কবি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছেন। রাণী চন্দ থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। 

৭ আগস্ট ছিল ২২শে শ্রাবণ! ভোর চারটে থেকে নিকট আত্মীয়, বন্ধু-পরিজন, প্রিয়জন দলে দলে আসতে লাগলেন। ঠাকুর বাড়ির বাইরে সকাল থেকে কবির অগণিত ভক্তের ভিড়, তারা সবাই একবারের জন্যে গুরুদেবকে দেখতে চান, তাদের প্রবল জনস্রোতে ঠাকুর বাড়ির মূল প্রবেশদ্বার ভেঙে পড়েছে। সকাল সাতটায় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় কবির শেষশয্যার পাশে বসে উপাসনা করলেন। মেয়েরা গাইছে কবির রচিত ব্রহ্মসংগীত। 

গুরুদেবের পায়ে প্রতিমাদেবী অঞ্জলি ভরে চাঁপাফুল দিয়ে গেলেন। গুরুদেবের পায়ের হাত রেখে রাণীরা টের পেলেন ক্রমশ উষ্ণতা কমে আসছে। কবিকে সকাল ন’টার দিকে অক্সিজেন দেওয়া হলো। নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে থাকল কবির। শেষবারের মতো দেখে গেলেন বিধান রায় ও ললিত বন্দ্যোপাধ্যায়। খুলে দেওয়া হলো অক্সিজেনের নল। ধীরে ধীরে কমে এল পায়ের উষ্ণতা, তারপরে একসময়ে থেমে গেল হৃদয়ের স্পন্দন। 

দুপুর ১২:১০ মিনিটে কবি সম্পূর্ণ চলে গেলেন। ১৯৪১ সালে সেটাই ছিল ২২শে শ্রাবণ! রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রস্থান! রবীন্দ্রনাথের ঠোঁটে একটু একটু করে জল দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কানের কাছে বলা হচ্ছে আজীবন তাঁর প্রাণের মন্ত্র– ‘শান্তম্‚ শিবম্‚ অদ্বৈতম’। কবির পায়ে হাত রেখে বলা হচ্ছে উপনিষদের মন্ত্র- তমসো মা জ্যোতির্গময়।

স্নান করিয়ে গুরুদেবকে সাজিয়ে দেওয়া হল অনন্তকালের মৃত্যুহীন মহাজীবনের জন্য। নন্দলাল বসু গুরুদেবের শেষযাত্রার পালঙ্ক নির্মাণ করলেন, সহযোগীকে আবেগাপ্লুত ধরা গলায় বললেন, ‘যা আজ রাজার রাজা নগর পরিক্রমা করে চিরবিদায় নেবেন, বেনারসি চাদর নিয়ে আয়!’ লাল বেনারসি কাপড়ে সোনালি বুটি দেওয়া চাদর পাতা হলো পালঙ্কে। সহস্র জুঁই, বেলের মালায় ঢাকা পড়ল সেই রাজপালঙ্ক। গুরুদেবকে সাদা বেনারসি জোড় পরানো হলো, সাথে গরদের পাঞ্জাবি, কোঁচানো ধুতি, গলায় রজনীগন্ধার গোড়ের মালা, কপালে চন্দন। তার চারপাশে শতসহস্র শ্বেতপদ্ম ও রজনীগন্ধা। তার হাত দুটি বুকের কাছে ছিল, সেখানে দেওয়া হলো একটি শ্বেতপদ্ম কোরক। ঠিক যেন ঈশ্বর শুয়ে রয়েছেন নিদ্রামগ্ন হয়ে। 

শত সহস্র মানুষের কাঁধে চেপে শুরু হলো অন্তিম যাত্রা। শ্রাবণের শরীরে হাত রাখল চির বিষাদ! কবি চললেন চিরবিদায়ের পথে। পরনে তার সাদা বেনারসি জোড়, কপালে চন্দনের তিলক। আজানুলম্বিত বেনারসি উত্তরীয় ঝুলছে গলায়। গোড়ে ফুলের মালায় আর ফুলে আচ্ছাদিত তার নারায়ণীতনু। কী অপূর্ব সুন্দর দেখাচ্ছে গুরুদেবকে! অনন্ত তার সামনের পথ। 

আকাশবাণীতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণের যাত্রা বিবরণ, আবৃত্তি, নজরুলের স্বরচিত কবিতা-গান (ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে), এন্ডরুজের রেকর্ড করা ভাষণ, প্রধান ধর্মযাজকের শোক নিবেদন। সমকালীন কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত লেখেন- ‘মরণের হাতে লীলাকমল তুমি,/ চলেছ আজ, জনস্রোতের তরঙ্গে তরঙ্গে,/ সদ্য ছেঁড়া সহস্রদল পদ্মের মতোই ভেসে/ শোকের বার দরিয়ায়।’

শেষমুহূর্ত উপস্থিত হওয়ার আগেই জোড়াসাঁকোতে হাজির হাজারে হাজারে মানুষ। একদিকে যখন ভেঙে পড়েছেন তার আত্মীয়, বন্ধু, ঘনিষ্ঠরা, তেমনই বাইরে তখন আবেগে উদ্বেল সাধারণ মানুষ। সাহিত্যিক ও বিশ্বভারতীর গ্রন্থনবিভাগের অধ্যক্ষ রামকুমার মুখোপাধ্যায় অবশ্য বলছিলেন- কবি নিজে এই ভাবে নিজের শেষটা চাননি। কবির ইচ্ছা ছিল কোনো জয়ধ্বনি ছাড়া সাধারণভাবে শান্তিনিকেতনে প্রকৃতির কোলেই তিনি যেন মিশে যেতে পারেন। তার সেই শেষ ইচ্ছাটা আর রাখা যায়নি। 

কলেজ স্ট্রিট, কর্নওয়ালিস হয়ে নিমতলা শ্মশানঘাটে বিকেল ৫টা ৪০ মিনিট। ‘ঘোর বৃষ্টি জোর নামল ঝমঝম, আর সেই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে চলে গেলো একদল শান্ত নিঃশব্দ গম্ভীর মন্থর চিনে, প্রত্যেকের মাথা নিচু, প্রত্যেকের হাতে ফুল, প্রত্যেকের খালি পা।’ অসুস্থতাবশত রথীন্দ্রকে ফিরিয়ে আনা হয়, মুখাগ্নি করেন সুবীরেন্দ্রনাথ। ‘রাত্রি ৯টা নাগাদ নেমে এসেছে ধরিত্রীমাতার অশ্রুস্বরূপ বৃষ্টিধারা।’ ৮ আগস্ট সন্ধ্যায় চিতাভস্ম আনা হয় শান্তিনিকেতনে। চীনভবন বাঁয়ে রেখে রান্নাঘর পেরিয়ে আশ্রমের ভিতর দিয়ে সোজা পথ উত্তরায়ণে, পুরো পথের দুধারে আশ্রমের ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক। সচল যাত্রায় পুরোভাগে সুরেনদা, বুকের কাছে দু হাতে ধরা কাঁসার কলসিটি। 

আজও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম, দর্শন এবং চিন্তা আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। গুরুদেব চিরকাল আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। ২২শে শ্রাবণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবসে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল এই দিনে, কিন্তু তার সৃষ্টি আজও আমাদের মাঝে জীবন্ত। তার গান, কবিতা, নাটক, গল্প, প্রবন্ধ সবকিছুতেই তিনি চিরভাস্বর হয়ে আছেন, থাকবেন। 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow