ব্যর্থ পরিকল্পনা, তলিয়ে যাচ্ছে হাওরবাসীর ভাগ্য
বৃষ্টির শব্দ কখনো কবিতার মতো লাগে, কখনো সান্ত্বনার মতো। কিন্তু সুনামগঞ্জের হাওরে এখন সেই বৃষ্টি মৃত্যুঘণ্টার মতো শোনায়। আকাশ থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি ফোঁটা যেন কৃষকের বুকের ভেতর আঘাত করছে। চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে ধান, আর সেই সঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছে একেকটি পরিবারের সারা বছরের ভাতের নিশ্চয়তা, ঋণ শোধের আশা, সন্তানের স্কুলের খরচ, বেঁচে থাকার ন্যূনতম ভরসা। হাওরের বুকজুড়ে এখন একটাই দৃশ্য; মানুষ পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছে, আবার সেই ধানই পানিতে পচে যাচ্ছে। এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি। যেন কৃষক নিজের কবর নিজেই খুঁড়ছে, শুধু সময়টা একটু পেছনে ঠেলে দেওয়ার জন্য। হাঁটু থেকে বুকসমান পানিতে নেমে, বজ্রপাতের ঝলকানির মধ্যে, ঝড়ো বাতাসের তীব্রতায় দুলতে দুলতে ধান কাটছে মানুষ। এই দৃশ্য কোনো দুর্যোগের নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। কৃষকরা বলছেন, কাটলেও সর্বনাশ, না কাটলেও সর্বনাশ। ধান কাটার পর রোদ নেই, খলায় পড়ে পচে যাচ্ছে, অঙ্কুর গজাচ্ছে। আর জমিতে রেখে দিলে জলাবদ্ধতায় ডুবে যাচ্ছে। এই দুই বিপদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কৃষক যেন এক নিষ্ঠুর খেলার পুতুল, যার ভাগ্য নির্ধারণ করছে আবহাওয়া নয়, বরং অব্যবস্থাপনা। প্রশ্নটা এখ
বৃষ্টির শব্দ কখনো কবিতার মতো লাগে, কখনো সান্ত্বনার মতো। কিন্তু সুনামগঞ্জের হাওরে এখন সেই বৃষ্টি মৃত্যুঘণ্টার মতো শোনায়। আকাশ থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি ফোঁটা যেন কৃষকের বুকের ভেতর আঘাত করছে। চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে ধান, আর সেই সঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছে একেকটি পরিবারের সারা বছরের ভাতের নিশ্চয়তা, ঋণ শোধের আশা, সন্তানের স্কুলের খরচ, বেঁচে থাকার ন্যূনতম ভরসা। হাওরের বুকজুড়ে এখন একটাই দৃশ্য; মানুষ পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছে, আবার সেই ধানই পানিতে পচে যাচ্ছে। এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি। যেন কৃষক নিজের কবর নিজেই খুঁড়ছে, শুধু সময়টা একটু পেছনে ঠেলে দেওয়ার জন্য। হাঁটু থেকে বুকসমান পানিতে নেমে, বজ্রপাতের ঝলকানির মধ্যে, ঝড়ো বাতাসের তীব্রতায় দুলতে দুলতে ধান কাটছে মানুষ। এই দৃশ্য কোনো দুর্যোগের নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
কৃষকরা বলছেন, কাটলেও সর্বনাশ, না কাটলেও সর্বনাশ। ধান কাটার পর রোদ নেই, খলায় পড়ে পচে যাচ্ছে, অঙ্কুর গজাচ্ছে। আর জমিতে রেখে দিলে জলাবদ্ধতায় ডুবে যাচ্ছে। এই দুই বিপদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কৃষক যেন এক নিষ্ঠুর খেলার পুতুল, যার ভাগ্য নির্ধারণ করছে আবহাওয়া নয়, বরং অব্যবস্থাপনা।
প্রশ্নটা এখানে বৃষ্টি নয়। বৃষ্টি এই অঞ্চলের চিরচেনা বাস্তবতা। প্রশ্নটা হলো, এই বৃষ্টিকে সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি কোথায়? বছরের পর বছর ধরে হাওরাঞ্চলের জন্য বরাদ্দ, প্রকল্প, বাঁধ নির্মাণ, স্লুইসগেট- এসব কি কেবল কাগজে-কলমে ছিল? বাস্তবে কেন সেগুলো আজ কৃষকের জন্য “মরণফাঁদ” হয়ে উঠছে? নলুয়ার হাওর থেকে দেখার হাওর, বাওন বিল থেকে টাঙ্গুয়ার বিস্তীর্ণ জলরাশি- সবখানেই একই অভিযোগ। পানি বের হওয়ার পথ নেই। কোথাও স্লুইসগেট বন্ধ, কোথাও অপরিকল্পিত বাঁধ পানি আটকে রেখেছে, কোথাও আবার অসমাপ্ত প্রকল্প ফেলে রাখা হয়েছে সময়মতো কাজ শেষ না করেই। যেন পুরো ব্যবস্থাটা একটি অদৃশ্য অবহেলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা ভেঙে পড়তে পড়তেই আজকের এই বিপর্যয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো এই বিপর্যয় হঠাৎ নয়। এটি পূর্বনির্ধারিত ছিল। প্রতিবছর একই সময়ে একই সমস্যা, একই অভিযোগ, একই কান্না; তবুও কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। বরং প্রতি বছর নতুন করে বরাদ্দ, নতুন প্রকল্প, নতুন প্রতিশ্রুতি। যেন দুর্যোগ নয়, এটি একটি পুনরাবৃত্ত ব্যবসা; যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষক, আর লাভবান হয় অদৃশ্য কিছু গোষ্ঠী। যখন শোনা যায়, শত শত কোটি টাকার বাঁধ প্রকল্পে মনিটরিং নেই, কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে, সময়মতো কাজ শেষ হয়নি, তখন আর এটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা যায় না। এটি স্পষ্টতই মানবসৃষ্ট সংকট। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা আর দায়হীনতার সম্মিলিত ফল।
সরকারি হিসাব বলছে একরকম, মাঠের বাস্তবতা বলছে অন্যরকম। কোথাও বলা হচ্ছে কয়েক হাজার হেক্টর ক্ষতি, আবার স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ তার বহু গুণ বেশি। এই সংখ্যার খেলাটাও কম উদ্বেগজনক নয়। কারণ, ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আড়াল করা মানে কৃষকের বাস্তব দুর্দশাকে অস্বীকার করা। আরও বিস্ময়কর হলো, যখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয় “অতিবৃষ্টির কারণেই জলাবদ্ধতা”- তখন প্রশ্ন জাগে, তাহলে এতদিন ধরে বাঁধ, স্লুইসগেট, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য যে অর্থ ব্যয় হলো, তার কাজ কী ছিল? যদি একটানা দুই-তিন দিনের বৃষ্টিতেই পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তাহলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা কোথায়?
আমাদের ভাবতে হবে, হাওরের পানির সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে কৃষকের আস্থা, রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস, ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সেই ক্ষতি কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়বে না। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার শহরের উঁচু দালানে নয়, তার গ্রামের মাটিতে। সেই মাটির মানুষ যদি বারবার এভাবে হারিয়ে যায়, তাহলে উন্নয়নের সব গল্পই ফাঁপা হয়ে পড়ে। সুনামগঞ্জের হাওরে আজ যে কান্না শোনা যাচ্ছে, সেটি কেবল কৃষকের নয়; এটি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার প্রতিধ্বনি।
হাওরের কৃষক কোনো বিলাসিতা চান না। তারা শুধু চান তাদের ফসল নিরাপদে ঘরে তুলতে। কিন্তু সেই মৌলিক নিশ্চয়তাটুকুও তারা পাচ্ছেন না। বরং এখন তাদের সন্তানরাও নেমে পড়ছে পানিতে- স্কুলের বই ছেড়ে হাতে নিচ্ছে কাঁচি। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি একটি সামাজিক বিপর্যয়। এই অবস্থায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। ঘটনাস্থলে গিয়ে “দেখে যাওয়া”, “পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা”, “ক্ষতির হিসাব তৈরি করা”- এই শব্দগুলো এখন কৃষকের কাছে নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া কিছু নয়। কারণ, যখন ধান পানির নিচে ডুবে যায়, তখন কোনো পরিদর্শন তাকে ফিরিয়ে আনতে পারে না।
হাওরের কৃষকরা আজ যে প্রশ্ন করছে, সেটি শুধু তাদের নয়- এটি পুরো দেশের প্রশ্ন: এই বিপর্যয়ের দায় কে নেবে? প্রকৃতি, নাকি পরিকল্পনাহীনতা? বৃষ্টি, নাকি দুর্নীতি? যদি সত্যিই দায় নির্ধারণ করা হয়, তাহলে দেখতে হবে, কেন সময়মতো বাঁধের কাজ শেষ হয়নি, কেন পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ ছিল, কেন স্লুইসগেটগুলো কার্যকর ছিল না, কেন কৃষকদের আগাম সতর্কতা দেওয়া হয়নি, কেন বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এই “কেন”-গুলোর উত্তর খুঁজলেই বেরিয়ে আসবে আসল চিত্র।
আমাদের ভাবতে হবে, হাওরের পানির সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে কৃষকের আস্থা, রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস, ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সেই ক্ষতি কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়বে না। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার শহরের উঁচু দালানে নয়, তার গ্রামের মাটিতে। সেই মাটির মানুষ যদি বারবার এভাবে হারিয়ে যায়, তাহলে উন্নয়নের সব গল্পই ফাঁপা হয়ে পড়ে। সুনামগঞ্জের হাওরে আজ যে কান্না শোনা যাচ্ছে, সেটি কেবল কৃষকের নয়; এটি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার প্রতিধ্বনি। এই প্রতিধ্বনি যদি এখনো কারও কানে না পৌঁছায়, তাহলে আগামী বছর আবার একই দৃশ্য দেখা যাবে; ডুববে ধান, কাঁদবে মানুষ, আর দায় এড়াবে দায়িত্বশীলরা। প্রশ্নটা তাই এখনই- আমরা কি এই চক্র ভাঙতে চাই, নাকি এটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শিখে গেছি?
লেখক: ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েট অ্যান্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর।
এইচআর/এমএস
What's Your Reaction?