বাংলাদেশের আর্থিক খাত সাম্প্রতিক সময়ে যে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তার প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং রেজিলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ এ আনীত সংশোধনীগুলো নিয়ে জনমনে তীব্র আশঙ্কা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এমন বিধান সংযোজন করা হয়েছে যাতে একীভূত ইসলামী ব্যাংকগুলোর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ পুনরায় পূর্বতন পরিচালকদের/শেয়ারহোল্ডারদের কাছে ফেরত যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাই এসব সংযোজন নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও আশঙ্কা থাকা অস্বাভাবিক নয়।
অনেকে আবার এই পরিবর্তনকে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীদের পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তবে এই সহজ ন্যারেটিভ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিদ্যমান সমস্যার গভীরতা ও জটিলতাকে পুরোপুরি প্রকাশ করে না। কারণ বর্তমান সমস্যা আরও অনেক গভীর ও জটিল।
প্রকৃতপক্ষে গত পনেরো বছর একাধিক ব্যাংকে নিয়মহীন ও স্বেচ্ছাচারী ঋণ বিতর রণের মাধ্যমে শুধুমাত্র মালিক তথা শারেহল্ডার্সদের কর্তৃক সরবরাহকৃত ব্যাংকের মূলধনই নয়, এমনকি গ্রাহকদের ডিপোজিট অপসারণের মতো গুরুতর অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। কয়েক লক্ষ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের যে চিত্র সময়ে সময়ে প্রকাশ পেয়েছে, তা কেবল এক বা একাধিক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
বরং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার এমন এক কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে, যা রাজনৈতিক মদদে রাষ্ট্র যন্ত্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘঠিত হয়েছে। সভ্য দুনিয়ার যা কল্পনার অতীত সেরকম সেচ্ছাচারি ব্যবস্থায় ওইসব ব্যাংক থেকে চরম অনিয়মের মাধ্যমে লক্ষ কোটি টাকা দেশে ও বিদেশে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। লুটপাটকারীদের একছত্র নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব এতটা প্রকট ছিল যে কেন্দ্রিয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা সহ উল্লেখিত ব্যাংকের অভ্যন্তরিন ব্যবস্থাপনা সেই লুটপাটে কিঞ্চিত পরিমান প্রতিবন্ধকতা তৈরী করতে পারেনি বরঞ্চ সহায়ক ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এমন এক প্রেক্ষাপটে যদি কোনো আইন এমনভাবে প্রণয়ন করার হয়, যাতে ব্যর্থ ব্যাংকগুলোর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ওইসব স্বার্থান্বেষী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে ফেরৎ যায়, তবে তা স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতা নিশ্চিত করণের বিষয়ে রাষ্ট্র কতটা আন্তরিক সেব্যাপারে জনমনে প্রশ্ন ও গুরুতর উদ্বেগ তৈরী হয়। তবে এটাও সত্য যে এই সংশোধনী বিশেষ করে ধারা ১৮(ক) - কে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রণীত বলে চিত্রায়িত করা বিশ্লেষণগতভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। এর পেছনে আরও বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা আছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গঠন ও পরিচালনের প্রচেষ্টা মূলত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের নিরপরাধ ও অবুঝ জনগণকে সংবিধান কর্তৃক প্রদত্ত সুরক্ষাকে পাশ কাটিয়ে একটি জোরপূর্বক একত্রীকরণের জ্বলন্ত উদাহরণ। যা কার্যত একাধিক দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংকের জাতীয়করণের সমতুল্য। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ তখন নিঃসন্দেহে আবশ্যক ছিল, এছাড়া ঔ ব্যাংকগুলোর পদ্ধতিগত পতন ঘটতে পারত। কিন্তু এই একত্রীকরণের প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের গুরুতর সীমাবদ্ধতায় কিছু নিরপরাধ জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে। একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো সহ আরো কয়েকটা ব্যাংক বাস্তবে দেউলিয়া অবস্থায় আছে। এই সব ব্যাংকের নিট সম্পদমূল্য (Net Wealth / মালিকদের সম্পদ) বিনিয়োগকৃত সম্পদের গুণগত মান বিবেচনায় নিলে নেতিবাচক, অর্থাৎ এসব ব্যাংকের আদায়যোগ্য সম্পদের তুলনায় দায় অনেক বেশি।
এই একীভূত প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র কার্যত প্রায় ১.৪২ লক্ষ কোটি টাকার আমানত দায় নিজের ওপর নিয়েছে যা প্রায় ৭৫ লাখ গ্রাহকের সাথে সম্পর্কিত ।
অন্যদিকে এইসব একিভূত ব্যাংকের প্রায় ১.৯৩ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ বা বিনিয়োগের একটি বড় অংশ (কিছু ক্ষেত্রে ৭০% থেকে ৯৫% পর্যন্ত) আদায়যোগ্য নয়, বর্তমান মান বিবেচনায় মন্দ ঋণে শ্রেনীমানযোগ্য। এই ভারসাম্যহীনতা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে একীভূত ব্যাংকগুলো শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি পুরোপুরিভাবে অনুপস্থিত ছিল। এসব প্রদত্ত ঋণ বা বিনিয়োগেরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুনরুদ্ধার ছাড়া রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত আমানত দায় (১.৪২ লক্ষ কোটি টাকা) শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ঘাড়েই বর্তাবে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে ওইসব সমস্যাসংকুল ব্যাংক গুলোকে প্রায় ৩৫-৩৬ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দিয়েছে। ভবিষ্যতে এই সহায়তা আরো লক্ষ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
কিন্তু এই অর্থ কোথা থেকে আসবে? একীভূত ব্যাংক (সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক) ও সমস্যাগ্রস্ত অন্য অন্য ব্যাংকগুলোকে টাকা তৈরি করে তথা Money Circulation এর মাধ্যমে এই অতিরিক্ত ১ লক্ষ কোটি টাকা নির্বাহ করা হতে পারে বলে জনমনে আশঙ্কা আছে, যা সরাসরি মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়াবে। এতে সাধারণ জনগণ বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনধারণের মানের উপর অসহনীয় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং জনগণের উপর একপ্রকার অদৃশ্য করের বোঝা তৈরী হবে। ব্যর্থ ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে প্রতিবছর বাজেটের বড় অংশ উন্নয়ন খাত থেকে স্থানান্তরিত হয়ে মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য বাজেট সহায়তার নামে এই সব ব্যাংকের প্রদান করার প্রয়োজন হবে। এবং তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এটি এমন এক চক্র তৈরি করবে, যেখানে রাষ্ট্র বারংবার প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি খাতের লোকসান পূরণ কল্পে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ থেকে অনবরত মূলধনি ঘাটতি সহায়তার নামে অর্থ সংস্থান করতে বাধ্য হবে। কিন্তু দু ভাগ্য জনকভাবে মূল সমস্যার প্রকৃত সমাধান হবে না। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি ভীত যেমন আরও ভঙ্গুর হওয়ার আশঙ্কা থাকবে, তেমনি আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা অনবরত আরো দুর্বল হবে, ফলশ্রুতিতে ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর গ্রাহকদের আস্থা কমে যাবে।
এই প্রেক্ষাপটে মালিকানা ফেরতের বিধান রেখে যে ধারা সংযোজন করা হয়েছে, যেখানে প্রথমত, এ যাবৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ঋণ/নগদ সহায়তার (Liquidity Support) ৭.৫% অগ্রিম এবং পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে বাকী ৯২.৫% পরিশোধের শর্ত রাখা হয়েছে। যদিও এই সংশোধনীর মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর মালিকানায় পূর্বতন পরিচালক ও শেয়ারধারীদের ফেরত আসার পথ সুগম করবে, তবে এ সংশোধনী হয়ত কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং একটি নীতিগত কৌশলের ব্যবস্থা, যার লক্ষ্য হতে পারে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের আর্থিক বোঝা কমানো, ও বেসরকারি খাতে ঝুঁকি পুনর্বণ্টন করা। এতে ধীরে ধীরে ওইসব একীভূত ব্যাংকগলোর পুনঃ বেসরকারীকরণের পথ খোলা থাকবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলায় এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে প্রথমে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে এবং পরে সুযোগমতো রাষ্ট্র মালিকানা থেকে বেরিয়ে আসে। যেমনটা বিগত বৈশ্বিক মন্দার সময় ইউরোপ ও আমেরিকা হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দা কালে ইউএসএ সরকার কর্তৃক সিটি গ্রুপ, ব্যাংক অব আমেরিকা, জেপি মরগান চেজ, ইংল্যান্ড সরকার কর্তৃক রয়াল ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড, লয়েড ব্যাংকিং গ্রুপ, জার্মান সরকার কর্তৃক কমার্স ব্যাংক, ফ্রান্স সরকার কর্তৃক বি এন পি পরিবার্স সহ আরও একাধিক ব্যাংকে বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সমস্যাগ্রস্ত/ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ সহায়তা কর্মসূচির (TARD) আওতায় সেসব দেশের সরকার মূলধন সরবরাহ করে।
এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশেও হয়ত একই ধরনের বাস্তববাদী পথ খোঁজার প্রচেষ্টা হতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিতে (এ এম সি) দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ স্থানান্তরের মাধ্যমে বিদ্যমান দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা উন্নয়নের প্রচেষ্টা গ্রহণ কারার বিধান সংযোজন করে আর্থিক সেক্টরের সংস্কারের বিধান রাখা যেতে পারত। বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাচারী আচরণ, গুরুতর অনিয়ম ও প্রতিষ্ঠানকে ব্যর্থতার জন্য দীর্ঘকালীন এরকম অনিয়ম সংঘতি হয়েছে, এবং ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্র ও জনগণ এহন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, ক্ষতিপূরণ আদায় ও প্রকৃত সাজা প্রদান করার কার্যকরী বিধান Bank Resolution Ordinance এ সংযোজন অপরিহার্য।
সবশেষে বলা যায় সংশোধনী সংক্রান্ত বিতর্ককে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার মূল কারণ আড়াল হয়ে যেতে পারে। বরং এখন প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক এবং টেকসই নীতিগত কাঠামো যা ব্যাংকিং খাতের গভীরতর দুর্বলতাগুলোকে সমাধান করতে সক্ষম হবে। না হয় ওইসব ব্যাংকের মালিকানা বদলালেও, বা এই রাষ্ট্রীয়করণের পর রাষ্ট্র কর্তৃক প্রতিবছর হাজারো কোটি টাকা মূলধনি ঘাটতি পূরণে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিদ্যমান সমস্যা ও সংকটের চক্র থেকে মুক্তি মিলবে না। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে এমন কোনো ব্যবস্থার যেন বন্দোবস্ত না হয়, যার মাধ্যমে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পুনরায় পুনর্বাসিত হয়ে জবাবদিহিতা ব্যতিরেক জনগণের অর্থ পুনরায় লোপাট করতে পারে।
আইসিএবির, এক্স ভাইস প্রেসিডেন্ট
সাবেক পরিচালক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
সাবেক পরিচালক, বিটিসিএল
ম্যানেজিং পার্টনার, মাহামুদ সবুজ অ্যান্ড কোং, চার্টার্ড একাউন্টেন্ট।