ভারতের লাল গ্রামে ঘরে ঘরে কার্ল মার্ক্স-হো চি মিন

তামিলনাড়ুর মাদুরাই শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ছোট্ট এক গ্রাম ভান্নিভেলাম্পট্টি। তবে এটি শুধু একটি সাধারণ গ্রাম নয়, বরং যেন জীবন্ত এক রাজনৈতিক ইতিহাস। এখানে কার্ল মার্ক্স, লেনিন কিংবা হো চি মিন কেবল বইয়ের পাতার বিপ্লবী নন, তারা যেন এই গ্রামেরই পরিচিত মুখ, রক্তমাংসের প্রতিবেশী। গত পাঁচ দশক ধরে গ্রামের মানুষ তাদের সন্তানদের নাম রাখছেন বিশ্বখ্যাত সব বিপ্লবী নেতাদের নামে। এই গ্রামে সাম্যবাদ শুধু রাজনৈতিক দর্শন নয়, বরং মানুষের জীবনযাপন, চিন্তা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এই ব্যতিক্রমী প্রথার সূচনা হয় ১৯৬০-এর দশকে। বিশেষ করে ১৯৬৮ সালের কিঝভেনমানি গণহত্যা ও ভূমি অধিকারের আন্দোলন স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সেই আন্দোলনের প্রভাব থেকেই গ্রামবাসীরা প্রচলিত দেব-দেবীর নামের বদলে রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত নেতাদের নামে সন্তানদের নাম রাখা শুরু করেন। গ্রামের বাসিন্দা মহেশ্বরী ও মুথুলক্ষ্মীর ভাষ্য, সন্তানদের মধ্যে আদর্শিক চেতনা, মানবিকতা ও সহানুভূতির বোধ গড়ে তুলতেই তারা আলেইদা, রণদিভে, মার্ক্সিয়া কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো ভিন্নধর্মী নাম বেছে নেন। এখানে নাম শুধু পরিচয়ের অ

ভারতের লাল গ্রামে ঘরে ঘরে কার্ল মার্ক্স-হো চি মিন

তামিলনাড়ুর মাদুরাই শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ছোট্ট এক গ্রাম ভান্নিভেলাম্পট্টি। তবে এটি শুধু একটি সাধারণ গ্রাম নয়, বরং যেন জীবন্ত এক রাজনৈতিক ইতিহাস। এখানে কার্ল মার্ক্স, লেনিন কিংবা হো চি মিন কেবল বইয়ের পাতার বিপ্লবী নন, তারা যেন এই গ্রামেরই পরিচিত মুখ, রক্তমাংসের প্রতিবেশী। গত পাঁচ দশক ধরে গ্রামের মানুষ তাদের সন্তানদের নাম রাখছেন বিশ্বখ্যাত সব বিপ্লবী নেতাদের নামে। এই গ্রামে সাম্যবাদ শুধু রাজনৈতিক দর্শন নয়, বরং মানুষের জীবনযাপন, চিন্তা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

এই ব্যতিক্রমী প্রথার সূচনা হয় ১৯৬০-এর দশকে। বিশেষ করে ১৯৬৮ সালের কিঝভেনমানি গণহত্যা ও ভূমি অধিকারের আন্দোলন স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সেই আন্দোলনের প্রভাব থেকেই গ্রামবাসীরা প্রচলিত দেব-দেবীর নামের বদলে রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত নেতাদের নামে সন্তানদের নাম রাখা শুরু করেন।

গ্রামের বাসিন্দা মহেশ্বরী ও মুথুলক্ষ্মীর ভাষ্য, সন্তানদের মধ্যে আদর্শিক চেতনা, মানবিকতা ও সহানুভূতির বোধ গড়ে তুলতেই তারা আলেইদা, রণদিভে, মার্ক্সিয়া কিংবা ভেনেজুয়েলার মতো ভিন্নধর্মী নাম বেছে নেন। এখানে নাম শুধু পরিচয়ের অংশ নয়, বরং একটি বিশ্বাস ও রাজনৈতিক দর্শনের প্রতীক।

ভান্নিভেলাম্পট্টির প্রায় প্রতিটি ঘরই লাল রঙে রাঙানো, দেয়ালে শোভা পায় কাস্তে-হাতুড়ির প্রতীক। 

ছোটবেলা থেকেই শিশুদের নিয়ে যাওয়া হয় রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে, যেখানে তারা আদর্শ ও সংগ্রামের গল্প শুনে বড় হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে নির্বাচনী রাজনীতিতে সমাজতান্ত্রিক প্রভাব কম-বেশি হলেও, এই গ্রামের প্রায় তিন হাজার মানুষ এখনো তাদের আদর্শিক অবস্থানে অটল। ভান্নিভেলাম্পট্টিতে সাম্যবাদ শুধু একটি রাজনৈতিক মতবাদ নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক জীবনদর্শন।

এর ফলে ভান্নিভেলাম্পট্টি যেন এক জীবন্ত রাজনৈতিক সংগ্রহশালায় পরিণত হয়েছে। এখানে কোনো শিশু বড় হতে হতে শুধু নিজের নামই শেখে না, বরং সেই নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংগ্রাম, ইতিহাস ও আদর্শ সম্পর্কেও সচেতন হয়ে ওঠে। সামাজিক অবিচার কিংবা বৈষম্যের বিরুদ্ধে এই গ্রামের মানুষরাই সবচেয়ে আগে প্রতিবাদে সোচ্চার হন। পূর্বপুরুষদের ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে তারা এখন গর্বের সঙ্গে ধারণ করছেন আধুনিক বৈপ্লবিক চেতনার পরিচয়।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ব্যতিক্রমী প্রথা যেন প্রমাণ করে; নাম শুধু পরিচয়ের মাধ্যম নয়, এটি হতে পারে প্রতিবাদের ভাষা, বিশ্বাসের প্রতীকও। তাই ভান্নিভেলাম্পট্টি আজও তার লাল পতাকা উঁচিয়ে বিশ্বের সামনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow