ভুটানের দর্শন: পশ্চিমা মডেলের ফাঁদে বাংলাদেশ
পশ্চিমা মাপকাঠিতে ভুটান হয়তো দরিদ্র হতে পারে; কিন্তু ভুটানের নিজস্ব সংজ্ঞায় তারাই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র। বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি আমেরিকায় যখন লাখ লাখ গৃহহীন মানুষ রাস্তায় ধুঁকে মরে, অর্থের অভাবে চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে প্রাণ হারায়, তখন দুই বিলিয়ন ডলারেরও কম জিডিপির দেশ ভুটান বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে বলতে পারে—‘আমাদের দেশে কোনো নাগরিক চিকিৎসার অভাবে মারা যায় না।’ একজন নাগরিকের সাধারণ চিকিৎসা পরামর্শ থেকে শুরু করে জটিল অস্ত্রোপচার পর্যন্ত সবকিছুর দায়িত্ব নেয় রাষ্ট্র। সীমিত সম্পদ সততা ও সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে তারা এটি সম্ভব করেছে। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং এটিই তাদের সুখ। পশ্চিমা বিশ্বকে উচ্চকণ্ঠে ভুটান বলতে পেরেছে, ‘তোমাদের মতো করে আমরা সুখী হতে চাই না।’ ভুটানের এই দর্শনের বিপরীতে আমরা আজ এমন এক অদ্ভুত আত্মপ্রবঞ্চনার যুগে বাস করছি, যেখানে কংক্রিটের আকাশচুম্বী ইমারত আর জিডিপির ঊর্ধ্বমুখী রেখাকেই উন্নয়নের চূড়ান্ত মাপকাঠি ধরা হয়। কিন্তু একটু নিভৃতে ভাবুন তো—কবে আপনি নিশ্চিন্তে বিশুদ্ধ বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিয়েছেন? কবে কোনো নদীর ধারে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছ জল দেখে মুগ্ধ হ
পশ্চিমা মাপকাঠিতে ভুটান হয়তো দরিদ্র হতে পারে; কিন্তু ভুটানের নিজস্ব সংজ্ঞায় তারাই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র। বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি আমেরিকায় যখন লাখ লাখ গৃহহীন মানুষ রাস্তায় ধুঁকে মরে, অর্থের অভাবে চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে প্রাণ হারায়, তখন দুই বিলিয়ন ডলারেরও কম জিডিপির দেশ ভুটান বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে বলতে পারে—‘আমাদের দেশে কোনো নাগরিক চিকিৎসার অভাবে মারা যায় না।’ একজন নাগরিকের সাধারণ চিকিৎসা পরামর্শ থেকে শুরু করে জটিল অস্ত্রোপচার পর্যন্ত সবকিছুর দায়িত্ব নেয় রাষ্ট্র। সীমিত সম্পদ সততা ও সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে তারা এটি সম্ভব করেছে। এটিই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং এটিই তাদের সুখ। পশ্চিমা বিশ্বকে উচ্চকণ্ঠে ভুটান বলতে পেরেছে, ‘তোমাদের মতো করে আমরা সুখী হতে চাই না।’
ভুটানের এই দর্শনের বিপরীতে আমরা আজ এমন এক অদ্ভুত আত্মপ্রবঞ্চনার যুগে বাস করছি, যেখানে কংক্রিটের আকাশচুম্বী ইমারত আর জিডিপির ঊর্ধ্বমুখী রেখাকেই উন্নয়নের চূড়ান্ত মাপকাঠি ধরা হয়। কিন্তু একটু নিভৃতে ভাবুন তো—কবে আপনি নিশ্চিন্তে বিশুদ্ধ বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিয়েছেন? কবে কোনো নদীর ধারে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছ জল দেখে মুগ্ধ হয়েছেন? কবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গর্ববোধ করেছেন, কিংবা অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচের কথা ভেবে আতঙ্কিত হননি? অথচ গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত চোখে পড়ে উন্নয়নের চোখধাঁধানো গল্প। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—একটি দেশের উন্নয়ন আসলে মাপা হয় কীসে? বিলিয়ন ডলারের মেগাপ্রকল্পে, নাকি নাগরিকের সুস্থ ও নিরাপদ জীবনে? যদি প্রথমটিই হয়, তবে দখল হয়ে যাওয়া মৃতপ্রায় নদী, শহরের বিষাক্ত বাতাস, বেকারত্ব-নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা আর সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠা চিকিৎসাব্যয়ের হিসাব উন্নয়নের কোন পরিসংখ্যানে লেখা থাকবে?
উন্নয়নের যে মরীচিকার পেছনে আমরা আজ ছুটছি, তা পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া ভোগবাদী ‘জলবায়ু ঔপনিবেশিকতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনার বিমানের ডানায় এবং লেজে যদি আগুন ধরে যায়, তবে সেই বিমানের প্রচণ্ড গতি নিয়ে আপনি কী করবেন? তখন আপনার ধ্বংস অনিবার্য! পশ্চিমা বিশ্বের অপরিকল্পিত শিল্পায়ন আর কার্বন নিঃসরণ আজ বিশ্বকে এমনই এক জ্বলন্ত বিমানে পরিণত করেছে। যে প্রযুক্তি ও ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দম্ভে পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা হচ্ছে, তা কখনোই শুভ হতে পারে না। ঋণের ফাঁদ আর প্রবৃদ্ধির এই ইঁদুর দৌড়ে সজ্ঞানে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রাণপ্রকৃতিকে নিলামে তুলছি। একবিংশ শতাব্দীর এই ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো—আমরা কি অন্যের ধার করা এই ধ্বংসাত্মক মডেলে নিজেদের বিলীন করব, নাকি এ দেশের মাটি, মানুষ ও ভূ-প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই টেকসই নিজস্ব পথ তৈরি করব?
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ মাইকেল টোডারো ও স্টিফেন স্মিথ দেখিয়েছেন, উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নয়; বরং তা নির্ভর করে কোনো দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবসম্পদের ওপর। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় বহুবার প্রমাণিত হয়েছে, বৈশ্বিক মুক্তবাজার অর্থনীতি ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যকার আয়ের ব্যবধান ঐতিহাসিক মাত্রায় বাড়িয়েছে। জলবায়ু গবেষণাসংস্থা ‘জার্মানওয়াচ’-এর সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের শিল্পায়নের স্বার্থে গত দুই শতাব্দী ধরে বায়ুমণ্ডলে যে বিপুল কার্বন ছেড়েছে, তার ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাংলাদেশ প্রথম সারির ভুক্তভোগী। তা সত্ত্বেও আমাদের নীতিনির্ধারকেরা পশ্চিমা ‘ঋণ-ভিত্তিক প্রকল্প’ মডেলের ঘোর থেকে বের হতে পারছেন না।
উন্নয়নের এই পশ্চিমা ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার বাস্তবসম্মত দৃষ্টান্ত হিসেবেই আমরা শুরুতে ভুটানের কথা বলেছিলাম। ১৯৭০-এর দশকে তাদের দূরদর্শী চতুর্থ রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক জিডিপির চেয়ে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ বা জাতীয় সুখকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তখন পশ্চিমা ভোগবাদী অর্থনীতিবিদরা তা হেসে উড়িয়ে দিলেও জলবায়ু বিপর্যয় ও সামাজিক অবক্ষয়ের এই যুগে এসে তার দর্শনটি সবচেয়ে আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
একটি দেশের গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয় তার সংবিধানের পবিত্রতা ও নেতৃত্বের নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে। ভুটানের সংবিধানে দেশের অন্তত ৬০ শতাংশ ভূমি চিরকাল বনাঞ্চল রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ৭২ শতাংশ। ফলে ভুটান শুধু কার্বন নিউট্রাল নয়, বিশ্বের অন্যতম ‘কার্বন নেগেটিভ’ দেশ। সমগ্র দেশের সব জাতীয় উদ্যান এবং অভয়ারণ্য পরস্পরের সাথে ‘বায়োলজিক্যাল করিডোর’ বা প্রাকৃতিক পথের মাধ্যমে সংযুক্ত রয়েছে। ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে দেশ ও প্রকৃতির প্রতি এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কারণে ভুটানের রূপরেখাকে এই পৃথিবীর আদর্শ মডেল বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না।
ভুটানের এমন দায়বদ্ধতার বিপরীতে বাংলাদেশের চিত্র চরম হতাশাজনক। সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের চমৎকার বিধান থাকলেও দুর্নীতি ও সদিচ্ছার অভাবে সুন্দরবনসহ দেশের বনভূমি ও নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়; আর ঢাকা পরিণত হয়েছে শীর্ষ দূষিত শহরের প্রতিশব্দে। ভুটানের দর্শন আমাদের শেখায়—পরিবেশই স্বাস্থ্যের মূলভিত্তি। একটি দেশ মূলত বাঁচে তার তিনটি প্রকৃত সম্পদ: মাটির উর্বরতা, পানি ও বাতাসের বিশুদ্ধতার ওপর। এগুলোকে ধ্বংস বা বিষাক্ত করে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশে ক্যান্সার, ফুসফুসের রোগ ও কিডনি জটিলতার বিরাট অংশ আসছে পরিবেশের এই ভয়াবহ দূষণ থেকে। হাজার কোটি টাকা খরচ করে হাসপাতাল বানালেও নদীর মৃত্যু, পাহাড় কাটা এবং পরিবেশবিনাশী কার্যক্রম বন্ধ না করলে কোনো চিকিৎসাব্যবস্থাই তা সামাল দিতে পারবে না।
‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ বা পশ্চিমাদের প্রেসক্রিপশন অন্ধভাবে মেনে বাংলাদেশের প্রকৃত ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব নয়। পশ্চিমা পুঁজিবাদী মডেল মূলত আমাদের ভোগ করতে এবং প্রকৃতি ধ্বংস করে জিডিপি বাড়াতে শেখায়। তাদের এই শোষণের নির্মম চিত্র দেখা যায় আফ্রিকায়; সেখানে হীরা, স্বর্ণ ও কোবাল্টের লোভে পশ্চিমারা একদিকে স্থানীয়দের হত্যা করে শিশুদের দাসে পরিণত করছে, অন্যদিকে চটকদার বিজ্ঞাপনে সেই রক্তমাখা সম্পদকে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তিপণ্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিশ্ববাজারে বিক্রি করছে। এই ভোগবাদী ভণ্ডামির আরও ভয়ংকর রূপটি হলো—সাধারণ আফ্রিকান মানুষের জীবনের কোনো মূল্য না থাকলেও এ অঞ্চলের বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণীর চামড়া দিয়ে তৈরি দেড় লাখ ডলার মূল্যের বিলাসবহুল ব্যাগ ব্যবহার করাকে তারা আধুনিকতা বলে প্রচার করে। তাই বাংলাদেশকে আজ ভাবতে হবে, তার প্রকৃত সুখ কোথায়? ক্যাসিনোতে গিয়ে বিলিয়ন ডলার ওড়ানো, সিন্থেটিকের পোশাক পরা আর রাতভর নৈতিক অবক্ষয়মূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার নাম কোনোভাবেই আমাদের সুখ হতে পারে না।
আমাদের সুখের সংজ্ঞা সম্পূর্ণ ভিন্ন। শীতের রাতে একান্নবর্তী পরিবারের সঙ্গে বসে পিঠা খাওয়া, গ্রামের বোনা সুতির জামা গায়ে জড়ানো আর নদীর ধারে বসে বিশুদ্ধ বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার মধ্যেই আমাদের শাশ্বত সুখ নিহিত। এই সুখের জন্য আমাদের প্রয়োজন নিজস্ব একটি ‘বেঙ্গল ডেল্টা মডেল’, যা আমাদের মাটি, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সুতরাং অন্ধ পশ্চিমা অনুকরণ ছেড়ে নিজেদের মাটির শক্তিকে জাগিয়ে তোলার এখনই সময়। সীমিত সম্পদের নিকট-প্রতিবেশী ভুটান যদি পারে, তবে বিপুল যুবশক্তি ও সম্ভাবনার দেশ হয়ে আমরা কেন পারব না? একাত্তরে রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা কেনা এই জাতির সম্ভাবনা অপরিসীম; ঘাটতি কেবল সৎ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের। রাজনৈতিক অহংকার, আমলাতান্ত্রিক বৃত্ত ও ব্যক্তিগত লোভের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের এই বিপন্ন বদ্বীপকে বাঁচাতে হবে। প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে নিজস্ব মডেল দাঁড় করাতে পারলে, বাংলাদেশও অচিরেই বিশ্বের বুকে একটি মানবিক, সুশৃঙ্খল ও টেকসই রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তা; পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (এনইউবি) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান।
What's Your Reaction?