মনিরুলের বক্তব্য হীন মানসিকতা ও বর্ণবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ: নাহিদ

জাতীয় সংসদে জামায়াতের নারী এমপিদের পোশাকের প্রতি ইঙ্গিত করে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর দেওয়া বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন সংসদের বিরোধীদলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম। সংসদে নাহিদ দাবি করেন, এমপি মনিরুল বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীকে কটাক্ষ এবং নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন। এ ধরনের বক্তব্যকে ‘অমার্জনীয় অপরাধ’ ও ‘বর্ণবাদী আচরণ’ আখ্যা দিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন নাহিদ। রোববার (১৪ জুন) সংসদ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যের একপর্যায়ে এমপি মনিরুল হক চৌধুরী বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীর প্রসঙ্গ টেনে দুই যুগেরও আগের একটি ঘটনার অবতারণা করেন। তিনি জানান, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সরকারের মন্ত্রী হলে তিনি কুমিল্লার সব এমপিদের সস্ত্রীক নিজ বাসায় আমন্ত্রণ জানান। সেখানে জামায়াতের তৎকালীন এমপি সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের স্ত্রীকে নিয়ে উপস্থিত হন। সেখানেই মনিরুল হক স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন কি না, তা জানতে চান তাহেরের কাছে। তখন তাহের নিজের স্ত্রীকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। কিন্তু পোশাকের কারণে তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না। সংসদে মনিরুল হক চৌধুর

মনিরুলের বক্তব্য হীন মানসিকতা ও বর্ণবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ: নাহিদ

জাতীয় সংসদে জামায়াতের নারী এমপিদের পোশাকের প্রতি ইঙ্গিত করে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর দেওয়া বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন সংসদের বিরোধীদলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম।

সংসদে নাহিদ দাবি করেন, এমপি মনিরুল বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীকে কটাক্ষ এবং নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন। এ ধরনের বক্তব্যকে ‘অমার্জনীয় অপরাধ’ ও ‘বর্ণবাদী আচরণ’ আখ্যা দিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন নাহিদ।

রোববার (১৪ জুন) সংসদ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যের একপর্যায়ে এমপি মনিরুল হক চৌধুরী বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীর প্রসঙ্গ টেনে দুই যুগেরও আগের একটি ঘটনার অবতারণা করেন।

তিনি জানান, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সরকারের মন্ত্রী হলে তিনি কুমিল্লার সব এমপিদের সস্ত্রীক নিজ বাসায় আমন্ত্রণ জানান। সেখানে জামায়াতের তৎকালীন এমপি সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের স্ত্রীকে নিয়ে উপস্থিত হন। সেখানেই মনিরুল হক স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন কি না, তা জানতে চান তাহেরের কাছে। তখন তাহের নিজের স্ত্রীকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। কিন্তু পোশাকের কারণে তার মুখ দেখা যাচ্ছিল না।

সংসদে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, সেদিন কয়েকজন বউ (স্ত্রী) নিয়ে যাননি। কিন্তু তাহের ভাই বউ নিয়ে গেছেন। ঢোকার পর দেখি, একটা কিছু হাঁটতেছে। আমি তখন তাহের ভাইকে বললাম ‘ভাবি কই’? (হাত দিয়ে দেখিয়ে) উনি বললেন ‘ওই যে’। আমি বললাম- ‘(যেহেতু মুখ দেখা যাচ্ছে না) আপনি যে বদলিয়ে আনেননি কেমনে বুঝবো’? 

এসময় তিনি সংসদে জামায়াতের নারী এমপিদের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, আমাদের হাউজেও আমাদের বোনেরা এসেছেন এমপি হয়ে, আপনি (স্পিকার) অভিনন্দন জানিয়েছেন, আমিও অভিনন্দন জানাতে চাই। উনারা মেধাবী, লেখাপড়া জানা। কিন্তু বুঝলাম না তো, কারা আপনারা?

এসময় তিনি নিজ দলের নারী এমপিদের দিকে দেখিয়ে বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা এদিকে দেখতে পারেন। আমরা ওইদিকে তাকালে কি আছে বুঝবো না, এটি ঠিক না তো।’

এসময় জামায়াতের এমপিরা এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। পরে ডেপুটি স্পিকার বক্তব্যের ওই অংশটুকু এক্সপাঞ্জ করেন।

এরপর স্পিকারের কাছে দুই মিনিট সময় চেয়ে নিয়ে মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্য নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলেন বিরোধীদলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম।

তিনি বলেন, মনিরুল হক চৌধুরী বিভিন্ন সময় সংসদে সূক্ষ্ম রসবোধ ও ইতিহাস চেতনা নিয়ে বক্তব্য দিলেও আজকের বক্তব্যে তিনি সমস্ত সংসদীয় রীতিনীতি এবং সাংবিধানিক অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করেছেন। তিনি প্রথমত বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীকে নিয়ে ব্যক্তিগত ইতিহাসের দোহাই দিয়ে কটাক্ষ করেছেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, দ্বিতীয়ত, তিনি বিরোধী দলের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক নিয়ে কথা বলে তাদের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হরণ করেছেন। এ ধরনের বক্তব্য হীন মানসিকতা ও বর্ণবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ। ভবিষ্যতে কোনো সংসদ সদস্য যেন সংসদে দাঁড়িয়ে এমন বক্তব্য না দেন সে বিষয়ে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

জবাবে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল জানান, মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যের সেই বিতর্কিত ও সংসদীয় রীতিনীতি বহির্ভূত অংশটুকু ইতোমধ্যে এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে ডেপুটি স্পিকার সংসদে উপস্থিত সব সংসদ সদস্যের উদ্দেশে একটি রুলিং জারি করে বলেন, সংসদে বসে কেউ কারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে পারবেন না এবং সবাইকে সংসদের মর্যাদা ও নিজস্ব ডিগনিটি বজায় রাখতে হবে। এরপর স্পিকার মনিরুল হক চৌধুরীকে ৩০২ ধারায় একটি নোটিশ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তা বিবেচনা করার আশ্বাস দেন।

ঠিক এই সময়ে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য এবং পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি স্পিকারের কাছে দুই মিনিট সময় চেয়ে মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যের পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করেন।

মন্ত্রী যুক্তি দেখান যে, সংসদে পক্ষ-বিপক্ষে অনেক সময় হাসি-ঠাট্টা ও রসাত্মক আলোচনা হয়েই থাকে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি দুদিন আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রীর দেওয়া বিয়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সেখানে যদি এক্সপাঞ্জ করার মতো কিছু না ঘটে, তবে মনিরুল হক চৌধুরীর এই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি দাবি করেন, মনিরুল হক চৌধুরী নির্দিষ্ট করে কাউকে আঘাত করে কোনো কথা বলেননি।

এসময় স্পিকার সরাসরি মন্ত্রীকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, সংসদের সভাপতি বা স্পিকারের আসন থেকে যখন একবার এক্সপাঞ্জ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তখন সেটা নিয়ে নতুন করে জাস্টিফাই করার কোনো সুযোগ নেই। স্পিকার তাকে অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলতে অথবা নিজের আসনে বসে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিলে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি স্পিকারের কাছে এক মিনিট সময় চেয়ে কথা বলেন। চিফ হুইপ যুক্তি দেন যে, সংসদে প্রতিটি সদস্যের নিজস্ব অধিকার রয়েছে। ২৭৪ বিধি অনুযায়ী কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা নাম উল্লেখ করে কথা বলা হলে, তার ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দেওয়ার অধিকার থাকে। যেহেতু মনিরুল হক চৌধুরীর নাম জড়িয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাই চিফ হুইপ স্পিকারের কাছে অনুরোধ জানান যেন মনিরুল হক চৌধুরীকে তার নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য মাইক দেওয়া হয়।

চিফ হুইপের এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং জানান যে, তিনি যথাসময়ে মনিরুল হক চৌধুরীকে কথা বলার সুযোগ দেবেন। 

এমওএস/এমকেআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow