মহররমের মিছিলে ভয়াবহ নাশকতার ষড়যন্ত্র যেভাবে রুখে দিলেন ২ নারী

গত ২৬ জুন মুম্বাইয়ের ভায়খলা অঞ্চলে মহরমের মিছিলে ইঁদুর মারার বিষ-ভরা ক্যাপসুল বিতরণের সময়ে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। হাজার হাজার মানুষের ওই মিছিলে নাশকতার ছক বানচাল হয়ে যায় ইহলাম হামিদি ও রুখসার সৈয়দ নামে দুই নারীর তৎপরতায়। এ ঘটনায় পুলিশ যাকে গ্রেফতার করেছে, তিনি পুণের বাসিন্দা ফৈয়াজ প্রেমজি। তার কাছ থেকে ১৪ হাজার ৯০০টি বিষ-ভরা ক্যাপসুল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সেই ক্যাপসুলগুরোতে জিংক ফসফাইড নামে এক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মিলেছে। আপাতত ক্যাপসুলগুলো পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। ওই মিছিলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে হাজির ছিলেন ইহলাম হামিদি ও রুখসার সৈয়দ। এক ব্যক্তি ক্যাপসুল বিতরণ করছেন দেখে তাদের সন্দেহ হয়। তারাই প্রথমে ওই ব্যক্তিকে ধরেন এবং পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় ওই ব্যক্তিকে। তখনই গোটা ঘটনা সামনে আসে। ইহলাম হামিদি ও রুখসার সৈয়দ/ ছবি: বিবিসি কীভাবে সন্দেহ হলো? ২৬ তারিখ মহররমের একটি মিছিল আঞ্জিরবাড়ি অঞ্চল থেকে রহমতবাগ কবরস্থানের দিকে যাচ্ছিল। ওই মিছিলে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ যোগ দিয়েছছিলেন। এই মিছিলে মহরমের নানা আচার-অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছিল।

মহররমের মিছিলে ভয়াবহ নাশকতার ষড়যন্ত্র যেভাবে রুখে দিলেন ২ নারী

গত ২৬ জুন মুম্বাইয়ের ভায়খলা অঞ্চলে মহরমের মিছিলে ইঁদুর মারার বিষ-ভরা ক্যাপসুল বিতরণের সময়ে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। হাজার হাজার মানুষের ওই মিছিলে নাশকতার ছক বানচাল হয়ে যায় ইহলাম হামিদি ও রুখসার সৈয়দ নামে দুই নারীর তৎপরতায়।

এ ঘটনায় পুলিশ যাকে গ্রেফতার করেছে, তিনি পুণের বাসিন্দা ফৈয়াজ প্রেমজি। তার কাছ থেকে ১৪ হাজার ৯০০টি বিষ-ভরা ক্যাপসুল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, সেই ক্যাপসুলগুরোতে জিংক ফসফাইড নামে এক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মিলেছে। আপাতত ক্যাপসুলগুলো পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে।

ওই মিছিলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে হাজির ছিলেন ইহলাম হামিদি ও রুখসার সৈয়দ। এক ব্যক্তি ক্যাপসুল বিতরণ করছেন দেখে তাদের সন্দেহ হয়। তারাই প্রথমে ওই ব্যক্তিকে ধরেন এবং পুলিশকে খবর দেন।

পরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় ওই ব্যক্তিকে। তখনই গোটা ঘটনা সামনে আসে।

india
ইহলাম হামিদি ও রুখসার সৈয়দ/ ছবি: বিবিসি

কীভাবে সন্দেহ হলো?

২৬ তারিখ মহররমের একটি মিছিল আঞ্জিরবাড়ি অঞ্চল থেকে রহমতবাগ কবরস্থানের দিকে যাচ্ছিল। ওই মিছিলে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ যোগ দিয়েছছিলেন।

এই মিছিলে মহরমের নানা আচার-অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছিল। তখনই ঘটনাটি ঘটে। হঠাৎ বিপদের আঁচ পেয়েছিলেন ওই দুই নারী।

তারা দুজনেই শিক্ষিত এবং বহু বছর সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত। ইহলাম হামিদি কফির ব্যবসা করেন। তিনি তার পরিবারের সঙ্গে মুম্বাইয়ের ভায়খলা অঞ্চলে থাকেন এবং বহু বছর ধরেই তিনি মহররমের মিছিলে অংশগ্রহণ করে থাকেন।

অন্যদিকে মুম্বাইয়ের শহরতলী অঞ্চলে বাসিন্দা রুখসার সৈয়দ কসমেটিক দ্রব্যাদি বিক্রি করে থাকেন। দুজনই খুব ভালো বন্ধু।

২৬ জুন মিছিলের সময়ে দুজনকেই মসজিদের কাছে সাধারণ মানুষের সহায়তার জন্য মোতায়েন করা হয়েছিল। সেখানেই ঘটনাটি ঘটে। দুজনের সন্দেহ হওয়াতেই এই নাশকতার চেষ্টা সামনে আসে।

capsule
অভিযুক্তের কাছ থেকে বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত ক্যাপসুল উদ্ধার/ ছবি: বিবিসি

‘সব সমস্যার একমাত্র ওষুধ’

বিবিসি মারাঠির সঙ্গে কথা বলার সময়ে রুখসার সৈয়দ জানান, আমি আর ইহলাম মাঝগাওঁ মসজিদের বাইরে ছিলাম। সেখানেই শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া কিছু মানুষ ক্লান্ত হয়ে জিরিয়ে নেওয়ার জন্য দাঁড়াচ্ছিলেন। তখনই এক ব্যক্তি ওখানে এই ক্যাপসুলগুলো বিতরণ করছিলেন।

‘তিনি দাবি করছিলেন, এটি সব সমস্যার একমাত্র অব্যর্থ ওষুধ।’

রুখসার সৈয়দ বলেন, সেই ক্যাপসুলগুলো মানুষ ‘নিয়াজ-এ-হুসেন’ মনে করে সংগ্রহ করছিলেন। রাতে ঘটনাটি ঘটার কারণে ওই ওষুধের প্যাকেটে কী লেখা ছিল তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না।

তিনি আরও জানান, ইহলাম একটি ক্যাপসুলের প্যাকেট হাতে নিল। সেখানেও পরিষ্কার করে কিছুই লেখা ছিল না। এতেই আমাদের সন্দেহ হয়। যখন আমরা একটি ক্যাপসুল ভেঙে দেখলাম, তখন তার ভেতর থেকে কালো রংয়ের পাউডার বের হলো।

‘আমরা প্যাকেটে লেখা তথ্যগুলো গুগলে সার্চ করে দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোনো উত্তর পেলাম না। তখন আমাদের মনে হলো যে এটা বিপজ্জনক কিছু হতে পারে।’

রুখসার জানান, লোকটি আমাদের সামনেই ছিলেন। কিন্তু তিনি ওখান থেকে সরে যেতে লাগলেন। আমরা তাকে থামাই। তার হাতে নীল রংয়ের একটি বড় ব্যাগ ছিল যাতে প্রচুর এমন ক্যাপসুল ছিল।

আমরা তাকে প্রশ্ন করামাত্র তিনি একটু ঘাবড়ে গেলেন। তার সঙ্গে আরও দুজন লোক ছিল। তাদের হাতেও ক্যাপসুলের ব্যাগ ছিল। আমি তার জামার কলার চেপে ধরি ও তখনই পুলিশে খবর দেই।

আমরা মিছিলে ঘোষণা দিতে বললাম যাতে কেউ এই ক্যাপসুল না খান। তারপরে আমরা স্বেচ্ছাসেবকদের সাহায্যে ওই ক্যাপসুলগুলো জড়ো করি ও পুলিশের হাতে তুলে দেই।

india
অভিযুক্ত ফৈয়াজ নিসার প্রেমজি/ ছবি: বিবিসি

ছুঁড়ে বিলি করছিলেন ক্যাপসুল

ইহলাম হামিদি বলেন, ওই ব্যক্তি ক্যাপসুল ছুঁড়ে ছুঁড়ে বিলি করছিলেন। ওইভাবে তো তবারক বিতরণ করা হয় না। এ কারণে আমার সন্দেহ হয়।

উনি আরও বলেন, তার ছুঁড়ে দেওয়া একটি ক্যাপসুল আমার পায়ের কাছে এসে পড়ে। আমি সেটি খুলে দেখি। প্রথমে দেখে মনে হলো এটি হয়তো কোনো দেশি টোটকা জাতীয় ওষুধ হবে। কিন্তু ওটার তীব্র গন্ধ ছিল, একটা অচেনা গন্ধ।

‘প্যাকেটে কিছু লেখা ছিল। কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন জাগে, মাত্র তিনটি ওষুধে সব রোগ কীভাবে ঠিক হতে পারে, যেমনটা ওই ব্যক্তি দাবি করছিলেন। রুখসারেরও এই বিষয়টায় সন্দেহ হয়।’

তিনি বলেন, ওই লোকটিকে আমরা সামনে দেখতে পেয়েই তাকে থামাই আর ধরে ফেলি। উনি বললেন, আমি কী করেছি? আমরা বললাম, সেটা পুলিশই বলবে।

‘হাত থেকে ব্যাগটি কেড়ে নিলাম। আমরা সবাইকে বলতে থাকি যাতে এই ক্যাপসুল কেউ না খান। এমনকি যদি কেউ নিয়ে থাকেন তবে যেন তা স্বেচ্ছাসেবক ও পুলিশের কাছে জমা করিয়ে দেন। এই ঘটনা প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলেছিল।’

পুলিশের তদন্তে কী জানা গেল?

এ ঘটনায় যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তার নাম ফৈয়াজ নিসার প্রেমজি, বয়স ৩৯। তিনি পুণের বিমান নগরের বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৯, ১১০ ও ১২৩ ধারায় মামলা করা হয়েছে।

মুম্বাই জোন ওয়ানের ডিসিপি জয়ন্ত মীনা বলেন, মহররমের মিছিলের সময়ে ভায়খলা পুলিশ একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে হেফাজতে নিয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ওই ব্যক্তি ক্যাপসুলগুলোকে ব্যথানাশক ওষুধ বলে দাবি করছিলেন। কিন্তু এক ব্যক্তি যখন এটা খাওয়ার পরেই বমি করতে শুরু করেন ও তার শরীর অস্থির হতে থাকে। সেই ব্যক্তি এখন বিপদমুক্ত।

পুলিশ তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ নিয়ে ওই ক্যাপসুলগুলোর বিতরণ থামিয়ে দিয়েছিল।

‘ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির নালিশের ভিত্তিতে ভায়খলা থানা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১২৩ নম্বর ধারায় মামলা নথিভুক্ত করেছে, এই মামলার ভিত্তিতে তদন্ত চলছে,’ জানান ডিসিপি জয়ন্ত মীনা।

পুলিশের বিবৃতি অনুযায়ী, ওই মিছিলকে নিশানা করে বড়সড় নাশকতার ছক কষা হয়েছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, তিনি ৫০ কেজি জিংক ফসফাইড কিনেছিলেন এবং ৩০ হাজার খালি ক্যাপসুলও কিনেছিলেন।

মুম্বাইতে থাকাকালীন তিনি গত ১৫ দিনে এই ক্যাপসুলের ভেতর রাসায়নিক ভরেছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল এটিকে ব্যথার ওষুধ বলে মানুষের মধ্যে বিতরণ করা।

ক্যাপসুল খেয়ে চারজন অসুস্থ

পুলিশ জানিয়েছে, এই ক্যাপসুল খেয়ে চারজনের অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সবাইকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল ও তাদের অবস্থা এখন স্থিতিশীল।

শিবাজিনগরের বাসিন্দা সালমান সৈয়দ ক্যাপসুল খাওয়ার পরেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, মিছিলের সময়ে আমার একটু ক্লান্ত বোধ হচ্ছিল। তাই আমি ওখানে যে ক্যাপসুল বিলি করা হচ্ছিল তার থেকে একটি নেই। সেটি খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই আমার অস্বস্তি শুরু হয় ও আমি বমি করতে শুরু করি। আমার অবস্থা দেখে আশেপাশের কয়েকজন আমাকে হাবিব হাসপাতালে ভর্তি করে দেন।

তার মতোই সৈয়দ আব্বাসও ওই ক্যাপসুল খেয়েই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার কথায়, শোভাযাত্রা চলার সময়ে এক ব্যক্তি একটি ক্যাপসুল আমাকে দিলেন। তিনি বলেছিলেন যে সেটা ভিটামিন সি-এর ক্যাপসুল। এই ওষুধ ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে বয়স্করা সবাই খেতে পারেন।

‘তিনি আমাকে বলেছিলেন, এই ওষুধ খেলে কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আমার শরীর খারাপ হয়ে যায়।’

‘পাশেই আমার গাড়িটা রাখা ছিল, আমি তাতে চেপে বসি। এরপরেই আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। পুলিশ এই ঘটনায় আমার বয়ান রেকর্ড করে নিয়ে গেছে,’ বলেন আব্বাস।

দুই নারীর প্রশংসায় পুলিশ

মিছিল চলাকালে এই ঘটনার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য পুলিশ স্বেচ্ছাসেবী ওই দুই নারীর উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করেছে।

এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সতর্ক থাকা ওই দুই নারী খুব দ্রুততার সঙ্গে পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন, যার ফলে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গিয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে ও তদন্ত চলছে।

অভিযুক্ত ফৈয়াজ প্রেমজিকে গত ২৮ জুন আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাকে দুইদিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠায়। পুলিশ জানার চেষ্টা করছে, এই কাজে তিনি একাই জড়িত ছিলেন নাকি অন্য কেউও এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্ত এই ঘটনা ঘটানোর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে মুম্বাইয়ের একটি হোটেলে উঠেছিলেন।

ওই অভিযুক্তের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করছে পুলিশ। ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণগুলোরও যাচাই প্রক্রিয়া যেমন চলছে, তেমনই তার উদ্দেশ্যও খুঁজে দেখা হচ্ছে।

তার সম্প্রদায়ের মানুষরা পুলিশকে জানিয়েছেন, তাদের সঙ্গেও ওই ব্যক্তির আলাপচারিতা ইদানিং ক্রমেই কমে এসেছিল। যদিও পুলিশ জানিয়েছে, সব দিকই আলাদা আলাদা করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশের বক্তব্য, সব অভিযোগ ও প্রমাণকেই খতিয়ে দেখা চলছে ও বিভিন্ন দিকে তদন্ত চলছে।

ইহলাম হামিদি ও রুখসার সৈয়দের বদৌলতে এই ঘটনা সময় থাকতে সামনে এসেছে। এবার পরবর্তী তদন্তেই স্পষ্ট হবে যে, এই ব্যক্তির আসল উদ্দেশ্য কী ছিল বা এই ষড়যন্ত্রে আরও কেউ শামিল ছিলেন কি না।

সূত্র: বিবিসি বাংলা
কেএএ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow