মহানবীর (সা.) অর্থনৈতিক দর্শন

ইলিয়াস মশহুদ মানবসভ্যতার ইতিহাসে অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষণ এবং অস্থিতিশীলতা দূর করার লক্ষ্যে যুগে যুগে বহু মতবাদের জন্ম হয়েছে। কিন্তু পুঁজিবাদ বা সমাজবাদের মতো মানবরচিত অর্থব্যবস্থাগুলো মানুষকে প্রকৃত মুক্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে; বরং সমাজকে ঠেলে দিয়েছে এক চরম অস্থিরতার দিকে। প্রাক-ইসলামি যুগেও বিশ্ব ছিল এ রকমই অস্থির। আরবে ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতিতে সুদ, ঘুস, লুণ্ঠন ও একচেটিয়া পুঁজিবাদের রাজত্ব চলছিল। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এক যুগান্তকারী ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা করেন। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিশ্বে পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের মতো মানবরচিত অর্থব্যবস্থাগুলো যখন চরম বৈষম্য, শোষণ এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন মহানবীর (সা.) সেই দেড় হাজার বছর আগের অর্থনৈতিক মডেল আজও মানবজাতির মুক্তির দিশারি হতে পারে। মহানবীর (সা.) অর্থনৈতিক বিপ্লব মহানবী (সা.) তৎকালীন আরবের বল্গাহীন ব্যক্তিমালিকানা, কালোবাজারি, একচেটিয়া মজুতদারি এবং শ্রমিকের ওপর নির্মম শোষণের অবসান ঘটিয়ে একটি সুখী-সমৃদ্ধ ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ কায়েম করেন। তিনি বৈধ ও অবৈ

মহানবীর (সা.) অর্থনৈতিক দর্শন

ইলিয়াস মশহুদ

মানবসভ্যতার ইতিহাসে অর্থনৈতিক বৈষম্য, শোষণ এবং অস্থিতিশীলতা দূর করার লক্ষ্যে যুগে যুগে বহু মতবাদের জন্ম হয়েছে। কিন্তু পুঁজিবাদ বা সমাজবাদের মতো মানবরচিত অর্থব্যবস্থাগুলো মানুষকে প্রকৃত মুক্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে; বরং সমাজকে ঠেলে দিয়েছে এক চরম অস্থিরতার দিকে।

প্রাক-ইসলামি যুগেও বিশ্ব ছিল এ রকমই অস্থির। আরবে ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতিতে সুদ, ঘুস, লুণ্ঠন ও একচেটিয়া পুঁজিবাদের রাজত্ব চলছিল। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এক যুগান্তকারী ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা করেন।

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিশ্বে পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের মতো মানবরচিত অর্থব্যবস্থাগুলো যখন চরম বৈষম্য, শোষণ এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার আবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন মহানবীর (সা.) সেই দেড় হাজার বছর আগের অর্থনৈতিক মডেল আজও মানবজাতির মুক্তির দিশারি হতে পারে।

মহানবীর (সা.) অর্থনৈতিক বিপ্লব

মহানবী (সা.) তৎকালীন আরবের বল্গাহীন ব্যক্তিমালিকানা, কালোবাজারি, একচেটিয়া মজুতদারি এবং শ্রমিকের ওপর নির্মম শোষণের অবসান ঘটিয়ে একটি সুখী-সমৃদ্ধ ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ কায়েম করেন। তিনি বৈধ ও অবৈধের সীমারেখা টেনে দিয়ে সম্পদের এমন এক বণ্টন নীতিমালা উপহার দেন, যা একশ্রেণির মানুষের আকাশচুম্বী প্রাসাদ তৈরি করার এবং অপর শ্রেণির না খেয়ে মরার বৈষম্যমূলক পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়।

আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য মহানবী (সা.) সঞ্চয় ও বণ্টনের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করেন। একদিকে তিনি সমাজ থেকে অর্থনৈতিক ব্যাধিগুলো দূর করতে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেন, অন্যদিকে সম্পদ বণ্টন ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রবর্তন করেন।

মহানবীর (সা.) অর্থনৈতিক মূলনীতি

মহানবীর (সা.) এই অর্থব্যবস্থা কোনো মানবমস্তিষ্কের চিন্তাপ্রসূত ছিল না; বরং তা ছিল সম্পূর্ণ আল্লাহপ্রদত্ত এবং মহাগ্রন্থ কোরআনের আলোয় উদ্ভাসিত এক কল্যাণমুখী দর্শন। বৈধ-অবৈধের অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা টেনে তিনি সমাজে এমন এক ইনসাফভিত্তিক বণ্টননীতি প্রতিষ্ঠা করেন, যা একদিকে যেমন ব্যক্তিমালিকানার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, অন্যদিকে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলে সমাজকে জিম্মি করার পথকেও চিরতরে রুদ্ধ করে। শ্রেণিবৈষম্যের বুকে কুঠারাঘাতকারী মহানবীর (সা.) সেই সর্বজনীন অর্থনৈতিক মূলনীতির প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. সামষ্টিক কল্যাণ ও বাধ্যতামূলক বণ্টন (জাকাত ও উশর): সম্পদ যেন কেবল ধনীদের মাঝেই আবর্তিত না হয়, সেজন্য ইসলামে জাকাত ও উশর (কৃষিজাত পণ্যের কর)-এর মতো বাধ্যতামূলক আর্থিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘যাতে সম্পদ তোমাদের মধ্যকার কেবল ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা হাশর: ০৭)

তা ছাড়া জাকাত হচ্ছে ধনীদের সম্পদে অভাবী মানুষের অধিকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) মুয়াজ ইবনে জাবালকে (রা.) যখন ইয়ামেনে গভর্নর হিসেবে পাঠান, তখন তাঁকে অর্থনৈতিক নীতি স্পষ্ট করে দিয়ে বলেন, ‘তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ তাদের সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন, যা তাদের ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করে তাদেরই দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হবে।’ (সহিহ বুখারি: ১৩৯৫)

২. সুদ ও শোষণভিত্তিক অর্থনীতির বিলুপ্তি: পুঁজিবাদের মূল হাতিয়ার সুদ এবং অন্যায় মুনাফাবাজিকে ইসলামে কঠোরভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন আর সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা: ২৭৫)

সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে মহানবী (সা.) বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, ‘জাহেলি যুগের সমস্ত সুদ আজ থেকে রহিত করা হলো এবং সর্বপ্রথম আমি আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ রহিত ঘোষণা করছি।’ (সহিহ মুসলিম: ১২১৮)

৩. কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারি রোধ: ভোক্তা অধিকার রক্ষা এবং বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি ঠেকাতে মহানবী (সা.) মজুতদারি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন। হাদিসে এসেছে, ‘অপরাধী ছাড়া কেউ পণ্য মজুতদারি করে না।’ (সহিহ মুসলিম: ১৬০৫)

মদিনা রাষ্ট্রের অর্থপ্রশাসনের বৈশিষ্ট্যসমূহ

মহানবীর (সা.) অর্থপ্রশাসন ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম সুসংহত ও জণকল্যাণমূলক মডেল। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে মদিনা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের স্বাধীনভাবে ব্যবসা, চাষাবাদ, পশুপালনসহ যে কোনো হালাল পেশা বেছে নেওয়ার অধিকার ছিল।

তবে এটি পুঁজিবাদ বা সমাজবাদের মতো চরমপন্থী ছিল না। এখানে ব্যক্তির উপার্জনের স্বাধীনতা যেমন ছিল, তেমনি সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে উৎপাদন, ভোগ ও সঞ্চয়ের ওপর ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণও ছিল।

প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বায়তুলমালের আমানতদার হিসেবে কাজ করতেন। মহানবী (সা.) কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিকের অর্থনৈতিক অধিকারকে সমান দৃষ্টিতে দেখতেন। মদিনার অমুসলিম নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল। তারা জিজিয়া করের বিনিময়ে এই নিরাপত্তা পেত। মুসলমানদের ওপর যেখানে জাকাত ফরজ ছিল, সেখানে অমুসলিমদের ওপর জিজিয়া ধার্য করা ছিল সমতা ও ইনসাফের পরিচায়ক।

উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও শ্রমের মর্যাদা

মহানবীর (সা.) অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণ উৎপাদনমুখী; কর-নির্ভর নয়। তিনি কৃষিকাজ, পশুপালন, বৃক্ষরোপণ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ভিক্ষাবৃত্তি ও অলসতাকে তিনি কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করে শ্রমের মর্যাদা সমুন্নত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিজের হাতের উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য আর হতে পারে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৬৬)

তিনি সমাজকে উৎপাদনশীল করতে বৃক্ষরোপণ ও কৃষিকাজের প্রতি এতটাই জোর দিয়েছেন যে, পরকালের কঠিন মুহূর্তেও কর্মতৎপর থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘যদি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও তোমাদের কারও হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১২৯৪৫)

মানবরচিত অর্থব্যবস্থা বনাম মহানবীর (সা.) অর্থনীতি

আজকের বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, পুঁজিবাদী ধনীক শ্রেণি দরিদ্রদের শোষণ করছে, অন্যদিকে সাম্যবাদের নামে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মনুষ্যত্ব কেড়ে নিয়ে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। মানবরচিত এই দুই চরমপন্থী ব্যবস্থার বিপরীতে মহানবী (সা.) উপস্থাপিত অর্থব্যবস্থা হলো সম্পূর্ণ মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ।

এই অর্থব্যবস্থাই আধুনিক বিশ্বের অর্থনৈতিক সংকট, শ্রেণিবৈষম্য ও দারিদ্র্য দূর করতে পারে। ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার অন্যায় প্রাচীর ভেঙে সমাজে প্রকৃত শান্তি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করার জন্য মহানবীর (সা.) অর্থব্যবস্থার বাস্তবায়ন শুধু মুসলিম উম্মাহর জন্যই নয়; বরং বিশ্বমানবতার মুক্তির জন্য অতীব জরুরি।

ওএফএফ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow