মহীয়সী নারী জুবাইদার সমাজসেবা
ইসলামের ইতিহাসে জুবাইদা বিনতে জাফর মানুষের কল্যাণে তার অবদানের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদের স্ত্রী। কিন্তু তার পরিচয় শুধু একজন খলিফার স্ত্রী হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী, মানবিক ও সমাজসেবায় নিবেদিতপ্রাণ নারী, যিনি নিজের প্রভাব ও সম্পদকে মানুষের উপকারে ব্যবহার করেছিলেন। নহরে জুবাইদা বা জুবাইদা কূপ খনন জুবাইদা বিনতে জাফরের অমর কীর্তি। তিনি তার জীবনে বেশ কয়েকবার হজ করেছেন। পঞ্চমবার হজের সফরে গিয়ে তিনি লক্ষ করেন, মক্কা ও আশপাশের অঞ্চলে পানির ভয়াবহ সংকট চলছে। মরুভূমির এই অঞ্চলে পানি বরাবরই ছিল মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। হজে আগত অসংখ্য মানুষ জমজম কূপ থেকে পানি সংগ্রহ করছে। ফলে কূপের পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। মানুষের কষ্ট তার হৃদয়কে নাড়া দেয়। সাধারণত জনসাধারণের দুর্ভোগ ক্ষমতাবান মানুষদের চোখেই পড়ে না অথবা চোখে পড়লেও তারা উদাসীন থাকেন। কিন্তু জুবাইদা ছিলেন ভিন্ন ধরনের মানুষ। তিনি মানুষের সংকট ও কষ্ট উপলব্ধি করেছিলেনে এবং তা সমাধানের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, জমজম কূপ পুনরায় খনন করতে হবে এবং আরাফাতের ময়দানেও একটি নতুন
ইসলামের ইতিহাসে জুবাইদা বিনতে জাফর মানুষের কল্যাণে তার অবদানের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদের স্ত্রী। কিন্তু তার পরিচয় শুধু একজন খলিফার স্ত্রী হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী, মানবিক ও সমাজসেবায় নিবেদিতপ্রাণ নারী, যিনি নিজের প্রভাব ও সম্পদকে মানুষের উপকারে ব্যবহার করেছিলেন।
নহরে জুবাইদা বা জুবাইদা কূপ খনন জুবাইদা বিনতে জাফরের অমর কীর্তি। তিনি তার জীবনে বেশ কয়েকবার হজ করেছেন। পঞ্চমবার হজের সফরে গিয়ে তিনি লক্ষ করেন, মক্কা ও আশপাশের অঞ্চলে পানির ভয়াবহ সংকট চলছে। মরুভূমির এই অঞ্চলে পানি বরাবরই ছিল মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। হজে আগত অসংখ্য মানুষ জমজম কূপ থেকে পানি সংগ্রহ করছে। ফলে কূপের পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। মানুষের কষ্ট তার হৃদয়কে নাড়া দেয়।
সাধারণত জনসাধারণের দুর্ভোগ ক্ষমতাবান মানুষদের চোখেই পড়ে না অথবা চোখে পড়লেও তারা উদাসীন থাকেন। কিন্তু জুবাইদা ছিলেন ভিন্ন ধরনের মানুষ। তিনি মানুষের সংকট ও কষ্ট উপলব্ধি করেছিলেনে এবং তা সমাধানের উদ্যোগও নিয়েছিলেন।
তিনি সিদ্ধান্ত নেন, জমজম কূপ পুনরায় খনন করতে হবে এবং আরাফাতের ময়দানেও একটি নতুন কূপ নির্মাণ করতে হবে। এই কাজে তিনি প্রায় ২ মিলিয়ন দিনার ব্যয় করার ঘোষণা দেন। বর্তমান সময়ের হিসাব অনুযায়ী যার পরিমাণ কল্পনাতীত। তখনকার অনেক প্রকৌশলী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি তাকে সতর্ক করেছিলেন। তাদের মনে হয়েছিল, পানি সমস্যার সমাধানে এত বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়তো প্রয়োজন নেই। কিন্তু জুবাইদার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অন্যরকম। তিনি মনে করতেন, মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণে বিপুর অর্থ ব্যয় করাও অপচয় নয়।
ইঞ্জিনিয়ারদের সংশয়ের জবাবে তিনি বলেছিলেন, কোদালের প্রতিটি আঘাতে যদি এক দিনার করেও ব্যয় হয়, তবুও আমি চাই—কূপ খননের কাজ থেমে না থাকুক।
এই একটি বাক্যে তার দৃঢ়তা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বুঝতেন, মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য অর্থের হিসাব করা যায় না। পানি শুধু একটি প্রয়োজনীয় উপকরণ নয়; মরুভূমির মানুষের কাছে তা জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্ন। তাই তিনি ব্যয়ের দিকে তাকাননি, বরং মানুষের প্রয়োজনের দিকে তাকিয়েছিলেন।
তার উদ্যোগে আরাফাতের ময়দানে যে কূপ খনন করা হয়েছিল, তাই নহরে জুবাইদা বা জুবাইদার কূপ নামে খ্যাত হয়ে আছে। হজের সময় আরাফাতের ময়দানে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। সেখানে পানির ব্যবস্থা করা নিঃসন্দেহে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কল্যাণকর একটি কাজ। ঐতিহাসিক ইবনে কাসির (রহ.) তার গ্রন্থে এই অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। জুবাইদার কাজ শুধু ওই সংকটের সাময়িক কোনো সমাধান ছিল না; বরং তা শত শত বছর মানুষের উপকারে এসেছিল।
কুফা থেকে মক্কা পর্যন্ত প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ মরুভূমির পথে হজযাত্রীদের জন্য একটি সুব্যবস্থাপূর্ণ রাস্তাও নির্মাণ করা হয় জুবাইদার উদ্যোগে। মরুভূমির দুর্গম পথ দিয়ে হজের জন্য ভ্রমণ করা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও বিপজ্জনক। পানির অভাব, বিশ্রামের অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু মানুষ দুর্ভোগে পড়ত। জুবাইদা এই সমস্যাগুলো উপলব্ধি করেছিলেন।
তাই তিনি একটি রাস্তা নির্মাণ করে তার আশপাশে বিভিন্ন স্থানে কূপ খনন, জলাশয় তৈরি এবং মুসাফিরদের জন্য সরাইখানা নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। এর ফলে হজযাত্রা মানুষের জন্য অনেক সহজ ও নিরাপদ হয়ে ওঠে। আজকের দিনে আমরা মহাসড়ক, বিশ্রামাগার বা সার্ভিস সেন্টারকে একটি উন্নত সভ্যতার অংশ মনে করি। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে জুবাইদার এই উদ্যোগ ছিল অসাধারণ দূরদর্শিতার পরিচয়।
বিখ্যাত পর্যটক ইবনু বতুতা তার সফরনামায় জুবাইদার এই অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। তিনি লিখেছেন, মক্কা থেকে বাগদাদ পর্যন্ত এই রাস্তার প্রতিটি জলাশয়, পুল বা কূপ মূলত তার অবদানের ফল। তার উদ্বেগ ও আন্তরিকতা না থাকলে এসব কিছুই হতো না।
জুবাইদা বিনতে জাফরের জীবন আমাদের শেখায়, সমাজসেবা শুধু পুরুষের দায়িত্ব নয়; নারীরাও সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীরা সমাজের সক্রিয় অংশ ছিল। তারা শিক্ষা, চিকিৎসা, দান-সদকা, যুদ্ধক্ষেত্রে সেবা এবং জনকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করত। তারা নিজেদেরকে সমাজের দায়বদ্ধ সদস্য হিসেবে ভাবত। ফলে মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল।
জুবাইদা যদি শুধু রাজপ্রাসাদের বিলাসিতার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতেন, তাহলে হয়তো ইতিহাসে তার নাম এভাবে উজ্জ্বল হয়ে থাকত না। কিন্তু তিনি মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্ট হিসেবে অনুভব করেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, ক্ষমতা ও সম্পদের প্রকৃত মর্যাদা তখনই আসে, যখন তা মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হয়।
ওএফএফ
What's Your Reaction?