মাথার ওপর ‘মৃত্যু ফাঁদ’, ঝুঁকিতে কয়েকশ পরিবার

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি আবাসিক এলাকার ওপর দিয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের হাই-ভোল্টেজ লাইন নির্মাণ করায় ঝুঁকিতে রয়েছে কয়েকশ পরিবার। স্বল্প উচ্চতায় থাকা অরক্ষিত ৩৩ কেভি লাইনের ‘ফ্ল্যাশিংয়ের’ (তীব্র বৈদ্যুতিক বিস্ফোরণ বা স্পার্ক) কারণে এলাকায় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের কেশরাব গ্রামের ওপর দিয়ে কাঞ্চন পূর্বাচল পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই হাই ভোল্টেজ লাইনটি টানা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত রুট ব্যবহার না করে তৎকালীন সময়ে প্রভাবশালী মহলের ইচ্ছায়, জনগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অবৈধভাবে জনবসতির ওপর দিয়ে এই লাইন নির্মাণ করা হয়। লাইনটি চালু হওয়ার পর থেকে শতাধিক দুর্ঘটনায় গ্রামের সাধারণ মানুষের বাড়িঘরের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পুড়ে যাওয়া, বসতবাড়িতে আগুন লাগা, হাই ভোল্টেজ কারেন্টের শর্ট সার্কিটে খামারের গরু ও পুকুরের মাছ মরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। ‘বিদ্যুৎ লাইনটি নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা মানা হয়নি। পুরো লাইনে

মাথার ওপর ‘মৃত্যু ফাঁদ’, ঝুঁকিতে কয়েকশ পরিবার

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি আবাসিক এলাকার ওপর দিয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের হাই-ভোল্টেজ লাইন নির্মাণ করায় ঝুঁকিতে রয়েছে কয়েকশ পরিবার। স্বল্প উচ্চতায় থাকা অরক্ষিত ৩৩ কেভি লাইনের ‘ফ্ল্যাশিংয়ের’ (তীব্র বৈদ্যুতিক বিস্ফোরণ বা স্পার্ক) কারণে এলাকায় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের কেশরাব গ্রামের ওপর দিয়ে কাঞ্চন পূর্বাচল পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই হাই ভোল্টেজ লাইনটি টানা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত রুট ব্যবহার না করে তৎকালীন সময়ে প্রভাবশালী মহলের ইচ্ছায়, জনগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অবৈধভাবে জনবসতির ওপর দিয়ে এই লাইন নির্মাণ করা হয়।

লাইনটি চালু হওয়ার পর থেকে শতাধিক দুর্ঘটনায় গ্রামের সাধারণ মানুষের বাড়িঘরের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পুড়ে যাওয়া, বসতবাড়িতে আগুন লাগা, হাই ভোল্টেজ কারেন্টের শর্ট সার্কিটে খামারের গরু ও পুকুরের মাছ মরে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।

‘বিদ্যুৎ লাইনটি নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা মানা হয়নি। পুরো লাইনের কোথাও কোনো পোলেই গ্রাউন্ডিং করা হয়নি। হাই-ভোল্টেজ শর্টসার্কিট কারেন্ট গ্রাউন্ডিং হওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। লাইনে কোনো নিউট্রাল তার বা স্কাই ওয়্যারও নেই। ফলে হাই-ভোল্টেজ শর্টসার্কিটের আগুন বা ফ্ল্যাশিংয়ের কারণে মানুষ, পশুপাখি এবং বাড়িঘরের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে’

সম্প্রতি এই লাইনের ফ্ল্যাশিংয়ের কারণে দগ্ধ হয়েছেন আরিফ নামের এক স্থানীয় দোকানদার। শরীরের বড় অংশ পুড়ে যাওয়া আরিফ বলেন, ‘এখানে প্রায়ই স্পার্কিং হয়, আগুন লাগে। ঈদের আগের দিন সকালে খুঁটির তার থেকে আগুন ছিটকে আমার শরীরের ওপর পড়ে। কোনোমতে পাঞ্জাবি খুলে দৌড়ে বাঁচলেও শরীর পুড়ে গেছে। বারবার অভিযোগ করলেও কোম্পানি কোনো সমাধান করেনি।’

সরেজমিনে কেশরাব গ্রামে গিয়ে এলাকাবাসীর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের উচ্চ ভোল্টেজ লাইনের সংযোগ পোলের নিচেই পল্লী বিদ্যুতের আরেকটি সরবরাহ লাইন ও ট্রান্সফরমার রয়েছে। ওই লাইনের নিচ দিয়ে পাকা সড়ক ধরে প্রতিদিন কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ চলাচল।

‘এখানে প্রায়ই স্পার্কিং হয়, আগুন লাগে। ঈদের আগের দিন সকালে খুঁটির তার থেকে আগুন ছিটকে আমার শরীরের ওপর পড়ে। কোনোমতে পাঞ্জাবি খুলে দৌড়ে বাঁচলেও শরীর পুড়ে গেছে। বারবার অভিযোগ করলেও কোম্পানি কোনো সমাধান করেনি’

এলাকাবাসীর দাবি, বিদ্যুৎ লাইনটি নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা মানা হয়নি। পুরো লাইনের কোথাও কোনো পোলেই গ্রাউন্ডিং করা হয়নি। হাই-ভোল্টেজ শর্টসার্কিট কারেন্ট গ্রাউন্ডিং হওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। লাইনে কোনো নিউট্রাল তার বা স্কাই ওয়্যারও নেই। ফলে হাই-ভোল্টেজ শর্টসার্কিটের আগুন বা ফ্ল্যাশিংয়ের কারণে মানুষ, পশুপাখি এবং বাড়িঘরের বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেনাবাহিনীর সদস্যরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে লাইনটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা দেখতে পেয়েছিলেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে লাইনটি ঝুঁকিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও কোম্পানি তা বাস্তবায়ন করেনি।

মাথার ওপর ‘মৃত্যু ফাঁদ’, ঝুঁকিতে কয়েকশ পরিবার

স্থানীয় বাসিন্দা নুর হোসেন সিদ্দিকী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার বাড়ির আইপিএস, সাবমার্সিবল মোটর, ফ্রিজ, মিটারসহ ঘরের প্রায় সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পুড়ে গেছে। নতুন করে টাকা খরচ করে ঠিক করলেও কিছুদিন পরপর আবার নষ্ট হয়ে যায়।’

‘আমি কিস্তিতে এক লাখ ৩৮ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনেছিলাম। বিদ্যুতের ফায়ারিংয়ের কারণে গরুটি মারা যায়। কোম্পানির মালিকপক্ষের প্রতিনিধিকে জানালে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দেয়। বাকি টাকা পরে দেওয়ার কথা বললেও আর দেয়নি’

কেশরাব এলাকার নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি কিস্তিতে এক লাখ ৩৮ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কিনেছিলাম। বিদ্যুতের ফায়ারিংয়ের কারণে গরুটি মারা যায়। কোম্পানির মালিকপক্ষের প্রতিনিধিকে জানালে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দেয়। বাকি টাকা পরে দেওয়ার কথা বললেও আর দেয়নি।’

কেশরাব ও দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুর রশিদ। তিনি জাগো ‍নিউজকে বলেন, ‘একটু বাতাস হলেই তারে আগুন জ্বলে ওঠে। সকালে মক্তব ও স্কুলের শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে থাকে। একবার দুজন শিক্ষার্থী ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। মসজিদের ডিজিটাল ঘড়ি, আইপিএস, ফ্যান ও মাইক নষ্ট হয়ে গেছে।’

পেশায় একজন রিকশাচালক ও মৎস্যচাষি আল-আমিন। স্বল্প উচ্চতায় উচ্চ ভোল্টেজের তারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তিনিও। তিনি বলেন, ‘আমি রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। ভাড়ায় পুকুর নিয়ে মাছ চাষ করি। বিদ্যুতের ফায়ারিংয়ের কারণে বিক্রির উপযোগী মাছ মারা গেছে। একবার নয়, কয়েকবার এমন হয়েছে। এখন আমি ঋণের বোঝায় জর্জরিত।’

এ বিষয়ে কাঞ্চন পূর্বাচল পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেডের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইউসুফ মাহমুদ প্রিন্স জাগো নিউজকে বলেন, ‘এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য দিপু ভূঁইয়ার নির্দেশনা এবং পল্লী বিদ্যুতের জিএমের পরামর্শে লাইনটি ঝুঁকিমুক্ত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

তবে লাইনটি কেন নিয়ম মেনে করা হয়নি বা অপসারণ করা হবে কি-না, সে বিষয়ে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, ‘একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের কাজটি করেছে। গতবছর আমি নিজে ভিজিট করে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এটি সমাধান করতে বলেছিলাম। এক বছর পরে এটি আবার একটা নতুন করে দুর্ঘটনা ঘটেছে। এরইমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষকে তলব করা হয়েছে। আমরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবো।’

এসআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow