মাদারীপুরে ঐতিহ্যবাহী পালকি আজ বিলুপ্তির পথে

হুন হুনা হুন হুনরে... এমন মধুর আওয়াজ আজ অতীত। এখন আর তেমন একটা চোখে পড়ে না পালকি করে বউ আনার দৃশ্য। একটা সময় বউ আনার প্রধান বহক ছিল এই ঐতিহ্যবাহী পালকি। কালের বিবর্তনে আজ তা হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে এখনো শখের বশে মাদারীপুরে দুই একটা বিয়েতে পালকি দেখা যায়। তবে তা হয়তো এক সময় হারিয়ে যাবে। মাদারীপুর শহরের কুলপদ্বী, বকুলতলাসহ বেশ কিছু এলাকায় এক সময় জমজমাট ছিল পালকি। কারো প্রয়োজন হলেই এসব এলাকা থেকে পালকি ভাড়া করে আনা হতো। পেশা হিসেবেও অনেক পুরুষ বেছে নিতেন পালকির বেহারা বা কাহারের কাজ। দুই একজন ছাড়া সবাই অনেক আগেই অন্য পেশায় চলে গেছেন। বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক অপরিহার্য অংশ ছিল এই পালকি। এক সময় ধনী ব্যক্তিরা এই পালকিতে করে যাতায়াত করতো। বিশেষ করে নারীরা এই পালকি করে বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। ধীরে ধীরে সেই ব্যবহার করতে লাগলো। এরপর বিয়ের প্রধান বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হতো পালকি। এই ঐতিহ্যবাহী পালকি ছাড়া বিয়ের দিন বউকে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে আসাই ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু আজ সেই পালকির কদর নেই। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ তা হারিয়ে যেতে বসেছে। আরও পড়ুন জুমার পর জিলাপি ও বিকেলে ফুটবল, শৈশবের উচ্ছ্বা

মাদারীপুরে ঐতিহ্যবাহী পালকি আজ বিলুপ্তির পথে

হুন হুনা হুন হুনরে... এমন মধুর আওয়াজ আজ অতীত। এখন আর তেমন একটা চোখে পড়ে না পালকি করে বউ আনার দৃশ্য। একটা সময় বউ আনার প্রধান বহক ছিল এই ঐতিহ্যবাহী পালকি। কালের বিবর্তনে আজ তা হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে এখনো শখের বশে মাদারীপুরে দুই একটা বিয়েতে পালকি দেখা যায়। তবে তা হয়তো এক সময় হারিয়ে যাবে।

মাদারীপুর শহরের কুলপদ্বী, বকুলতলাসহ বেশ কিছু এলাকায় এক সময় জমজমাট ছিল পালকি। কারো প্রয়োজন হলেই এসব এলাকা থেকে পালকি ভাড়া করে আনা হতো। পেশা হিসেবেও অনেক পুরুষ বেছে নিতেন পালকির বেহারা বা কাহারের কাজ। দুই একজন ছাড়া সবাই অনেক আগেই অন্য পেশায় চলে গেছেন।

বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক অপরিহার্য অংশ ছিল এই পালকি। এক সময় ধনী ব্যক্তিরা এই পালকিতে করে যাতায়াত করতো। বিশেষ করে নারীরা এই পালকি করে বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। ধীরে ধীরে সেই ব্যবহার করতে লাগলো। এরপর বিয়ের প্রধান বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হতো পালকি। এই ঐতিহ্যবাহী পালকি ছাড়া বিয়ের দিন বউকে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে আসাই ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু আজ সেই পালকির কদর নেই। আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ তা হারিয়ে যেতে বসেছে।

মূলত কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হতো পালকি। পালকির দুই পাশে দরজায় রঙিন কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। পালকির গায়ে পাখি, পুতুল, লতাপাতাসহ আকর্ষণীয় কারুকার্য নকশা করানো থাকত। ভেতরে বর-কনে বসতেন কিংবা বউ একাই। এরপর চার থেকে ছয়জন বলিষ্ঠ বেহারা কাঁধে তুলে একসঙ্গে তাল মিলিয়ে ছন্দময় গান গেয়ে পালকি নিয়ে ছুটতেন। আর তার পাশ দিয়ে বর-কনের আত্মীয়-স্বজনরা দল বেধে হেঁটে বাড়ি ফিরতেন। গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে যখন কোনো পালকি যেন আশপাশের লোকজন কৌতূহলী হয়ে দেখতেন। ছন্দময় এক পথ পাড়ি দিয়ে নতুন বউ নিয়ে পালকি পৌঁছাত বরের বাড়ি। কিন্তু আজ সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না।

তবে মাদারীপুরে অনেকেই শখের বশে এখন পালকি নিয়ে নতুন বউ আনেন। এটা শুধুই শখের বশে। সেই ছবি-ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় সাড়া ফেলে। অনেকে আবার নিজেদের বাড়ির ঐতিহ্য ধরে রাখতে পালকিতে নতুন বউ বাড়িতে আনেন। সম্প্রতি মাদারীপুর শহরের ২ নং শকুনি এলাকার আসাদ শিকদার মেয়ের বিয়েতে পালকি ভাড়া করে আনেন। কিছুটা পথ পালকিতে চড়ে পরে প্রাইভেটকারে করে শ্বশুরবাড়ি যায় কনে। এই দৃশ্য দেখার জন্যও অনেকেই ভিড় করেন।

শহরের শকুনি এলাকার আসাদ শিকদার বলেন, ‘আমার অনেক শখ ছিল ছেলে-মেয়েদের বিয়েতে বাংলার ঐতিহ্য পালকি বাহক হিসেবে ব্যবহার করবো। সেই চিন্তা থেকেই আমার মেয়ের বিয়েতে পালকি ভাড়া করে এনেছিলাম। পালকি দেখেতে অনেকেই ভিড় করেছিলেন। ব্যাপারটি আমার খুব ভালো লেগেছে। আসলে এক সময় এই পালকি আমাদের থেকে হয়তো হারিয়ে যাবে। কারণ এখন আর তেমন একটা পালকি চোখে পডে না।’

বকুলতলা এলাকার পালকির মালিক মো. কালাম হোসেন বলেন, ‘শখের বশে এখনো দুটি পালকি রেখেছি। মাঝেমধ্যে বিয়েশাদিতে ভাড়া পাই। তা দিয়েই আমাদের চলতে হয়। বাপদাদার এই পেশা ছেড়েছে প্রায় সবাই। তবে আমার মতো দুই একজন হয়তো আছে এই পেশায় শুধু মায়া কিংবা শখের বশে। তাও হয়তো এক সময় হারিয়ে যাবে।’

মাদারীপুরের ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাস বলেন, ‘বহু বছর আগে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল পালকি। এরপর ধীরে ধীরে তা বিয়েবাড়ির বর-কনে আনার প্রধান বাহক হয়ে ওঠে। কিন্তু কালের বিবর্তনে তাও আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। পালকি শুধু একটা প্রজন্মের স্মৃতি নয়, এটি আমাদের লোক ঐতিহ্যের এক মূল্যবান দলিল। যা যুগ যুগ ধরে ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।’

মাদারীপুরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তারুণ্য পরিবারের সোহাগ হাসান বলেন, ‘আমি ছোটবেলায় দেখতাম বিয়ে হলেই পালকি নিয়ে আসা হতো। বর কনের বাড়ি থেকে কনেকে পালকিতে করে বাড়ি নিয়ে যেতেন। এখন আর পালকি তেমন একটা দেখা যায় না। তবে মাদারীপুরে এখনো পালকির ঐতিহ্যটা চোখে পড়ে। অনেকেই শখ করে বিয়েতে পালকি নিয়ে আসেন। তবে আমাদের এই গ্রামবাংলার প্রাচীন ও পুরোনো বাহন পালকি সংরক্ষণ করতে হবে। তা না হলে এ ঐতিহ্যময় পালকি শুধু জাদুঘর আর বইয়ের পাতায় ইতিহাস হয়েই থাকবে।’

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow