মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অতিরিক্ত শাস্তি ও যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ এবং শিক্ষার্থী ব্যবস্থাপনা আরও জবাবদিহিমূলক করতে ২১ দফা সংস্কার প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন ইসলামি স্কলার শায়খ মুসা আল হাফিজ।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) নিজের ফেসবুক পোস্টে প্রকাশিত এক দীর্ঘ লেখায় তিনি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার আলোকে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।
পোস্টে তিনি বলেন, মাদ্রাসায় অতিশাস্তি, যৌন নিপীড়নসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে নীতিমালা, প্রশাসনিক কাঠামো, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, শিশু সুরক্ষা, জবাবদিহিতা ও অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় সমন্বিত পরিবর্তনের আহ্বান জানান তিনি।
শিশু সুরক্ষা ও জিরো টলারেন্স নীতির প্রস্তাব
মুসা আল হাফিজ প্রস্তাব করেন, কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ‘চার্টার অব ট্রাস্ট অ্যান্ড চাইল্ড রাইটস’ প্রণয়ন করতে হবে। এটি শিক্ষার্থীর জীবন, মর্যাদা, মানসিক বিকাশ ও মানবিক সম্মান রক্ষার ইইসলামি নীতির ভিত্তিতে তৈরি হবে। পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করার কথা বলেন তিনি।
শিক্ষক নিবন্ধন ও পেশাগত মানদণ্ড
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, সব শিক্ষকের জন্য কেন্দ্রীয় শিক্ষক নিবন্ধন, ইউনিক পরিচয়পত্র, ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই, আখলাকি সনদ, পেশাগত লাইসেন্স এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর লাইসেন্স নবায়নের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। গুরুতর অসদাচরণে দোষী ব্যক্তিদের জন্য কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা রেজিস্ট্রি গঠনেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে শিক্ষক, মুহতামিম, নাজিম ও আবাসিক দায়িত্বশীলদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রফেশনাল কোড অব কন্ডাক্ট প্রণয়ন এবং শিশু সুরক্ষা, নৈতিকতা, শিক্ষাদান পদ্ধতি, মনোবিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তদারকি, গবেষণা ও মান নিয়ন্ত্রণ
তিনি প্রস্তাব করেন, আলেম, আইনজ্ঞ, শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও অভিভাবক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে লাজনাতুল হিসবাহ গঠন করতে হবে। এ কমিটি নৈতিক তদারকি, ঝুঁকি মূল্যায়ন, নীতিপালন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
এ ছাড়া স্বাধীন কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স অ্যান্ড ইনস্পেকশন অথরিটি, কেন্দ্রীয় রিসার্চ, পলিসি অ্যান্ড কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, নিয়মিত পরিদর্শন, কমপ্লায়েন্স অডিট এবং জাতীয় পর্যায়ের মাদ্রাসা ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমএমআইএস) চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ নিষ্পত্তি ও আইনি ব্যবস্থা
পোস্টে বলা হয়েছে, প্রতিটি মাদ্রাসায় বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্বাধীন ও গোপনীয় অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অভিযোগকারী যেন প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই অভিযোগ জানাতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া গুরুতর অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, অভিযোগ প্রমাণিত হলে শিক্ষকতা থেকে অপসারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় আইনে ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ট্রমা কাউন্সেলিং, শিক্ষা অব্যাহত রাখার সহায়তা এবং আইনগত সহযোগিতাও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পুনর্বহাল এবং মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
আবাসিক ব্যবস্থা ও সামাজিক অংশগ্রহণ
প্রস্তাবনায় মাদ্রাসার আবাসিক ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকরা যাতে সপরিবারে আবাসিকে থাকতে পারেন, সে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অবিবাহিত শিক্ষকদের বিয়ে সহজ করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অভিভাবক পরিষদ, সাবেক শিক্ষার্থী, স্থানীয় আলেম ও সমাজের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে শুরাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত জবাবদিহি প্রতিবেদন এবং মহিলা ও হিফজ মাদ্রাসার জন্য পৃথক পরিচালনা ও শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
অপপ্রচার মোকাবিলায় পৃথক কর্মনীতি
মুসা আল হাফিজ তার প্রস্তাবনায় অভিযোগ, গুজব ও অপপ্রচার মোকাবিলায় পৃথক কর্মনীতিও তুলে ধরেছেন। এতে অভিযোগ যাচাই ছাড়া কাউকে দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা না করা, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মিডিয়া ট্রায়াল নিরুৎসাহিত করা এবং অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয়ের অধিকার সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও প্রস্তাব করেন, গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন, গুজব ও বিকৃত তথ্য মোকাবিলায় দ্রুত ফ্যাক্টচেকিং ব্যবস্থা চালু, বোর্ডের অধীনে শক্তিশালী জনসংযোগ ও ফ্যাক্টচেক ইউনিট গঠন এবং প্রয়োজন হলে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
২১ দফা প্রস্তাবের মূল বিষয়
মুসা আল হাফিজের প্রস্তাবনায় যেসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
চার্টার অব ট্রাস্ট অ্যান্ড চাইল্ড রাইটস প্রণয়ন।
শিশু নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি।
কেন্দ্রীয় শিক্ষক নিবন্ধন, লাইসেন্স ও ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই।
বাধ্যতামূলক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও আচরণবিধি।
স্বাধীন তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।
গবেষণা ও পাঠ্যক্রম উন্নয়নে কেন্দ্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
শিশু সুরক্ষা নীতিমালা ও নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
জাতীয় হেল্পলাইন ও মাদ্রাসা সাপোর্ট সেন্টার।
সমন্বিত তথ্যব্যবস্থাপনা (এমএমআইএস)।
আবাসিক ব্যবস্থার সংস্কার ও সামাজিক জবাবদিহিতা।
জাতীয় পর্যায়ে মাদ্রাসা নিরাপত্তা ও সুশাসন বিষয়ক একটি পর্যবেক্ষণ সংস্থা গঠন।