মাসের পর মাস ধরে পানির সংকটে ভুগছে মিরপুর-১১

মাসের পর মাস পানির সংকটে ভুগছে রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বাসিন্দারা। পানির অভাবে খাওয়া-দাওয়া, রান্নাবান্না, গোসল, কাপড়-চোপড় ধোয়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ করতে পারছেন না তারা। কোনো কোনো বাড়ির লোকজন পাঁচ থেকে সাত দিন পর পানি পেলেও তা ১০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পানির অভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকে। অনেকে বাসা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন। এদিকে লাইনের পানি না পেয়ে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ওয়াসার গাড়ির পানি কিনতে হচ্ছে লোকজনকে। ওয়াসার এই পানিও আবার চাহিদা ও সময় মতো সরকার নির্ধারিত মূল্যে পাওয়া যায় না। ওয়াসার গাড়িচালক ও সহকারীদের গাড়িপ্রতি অতিরিক্ত ২০০-৪০০ টাকা দিলেই কেবল পানি পান এলাকাবাসী। অতিরিক্ত টাকা না দিলে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও এলাকাবাসী পানি পান না। পানির সমস্যার বিষয়টি ওয়াসাকে প্রতিনিয়ত জানিয়েও সুরাহা পাচ্ছে না এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, ওয়াসার কর্মীরা হয়তো ইচ্ছে করেই পানির সংকট দূর না করে তা জিইয়ে রেখেছেন। কেননা এতে তিন ধরনের লাভ হচ্ছে তাদের। প্রথমত পানির সংকট থাকার ফলে ওয়াসার গাড়ির পানি বিক্রি বেড়েছে কয়েক গুণ। এতে তাদের রাজস্

মাসের পর মাস ধরে পানির সংকটে ভুগছে মিরপুর-১১

মাসের পর মাস পানির সংকটে ভুগছে রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের বাসিন্দারা। পানির অভাবে খাওয়া-দাওয়া, রান্নাবান্না, গোসল, কাপড়-চোপড় ধোয়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ করতে পারছেন না তারা। কোনো কোনো বাড়ির লোকজন পাঁচ থেকে সাত দিন পর পানি পেলেও তা ১০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। পানির অভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকে। অনেকে বাসা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন।

এদিকে লাইনের পানি না পেয়ে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ওয়াসার গাড়ির পানি কিনতে হচ্ছে লোকজনকে। ওয়াসার এই পানিও আবার চাহিদা ও সময় মতো সরকার নির্ধারিত মূল্যে পাওয়া যায় না। ওয়াসার গাড়িচালক ও সহকারীদের গাড়িপ্রতি অতিরিক্ত ২০০-৪০০ টাকা দিলেই কেবল পানি পান এলাকাবাসী। অতিরিক্ত টাকা না দিলে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও এলাকাবাসী পানি পান না।

পানির সমস্যার বিষয়টি ওয়াসাকে প্রতিনিয়ত জানিয়েও সুরাহা পাচ্ছে না এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ, ওয়াসার কর্মীরা হয়তো ইচ্ছে করেই পানির সংকট দূর না করে তা জিইয়ে রেখেছেন। কেননা এতে তিন ধরনের লাভ হচ্ছে তাদের।

প্রথমত পানির সংকট থাকার ফলে ওয়াসার গাড়ির পানি বিক্রি বেড়েছে কয়েক গুণ। এতে তাদের রাজস্ব আয় বেড়েছে। দ্বিতীয়ত গাড়ির পানি সাধারণত বাড়িগুলোর নিচতলায় রিজার্ভ ট্যাংকিতে ঢালা হয়। এরপর তা মোটরের সাহায্যে বাড়ির ওপরের ট্যাংকিতে তোলা হয়। পানি ওপরে তোলার সময় মিটার ঘুরতে থাকে। এতে মাস শেষে ওয়াসার এই কেনা পানিও মাসিক বিলে যুক্ত হয়। এতে দ্বৈত বিলের সম্মুখীন হচ্ছেন ওয়াসার গ্রাহকরা। তৃতীয়ত গাড়ির পানি বিক্রিতে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে রাতারাতি ‘আঙুল ফুলে কলা গাছ’ হচ্ছেন ওয়াসা কর্মীরা।

সরেজমিনে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে গিয়ে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

মাসের পর মাস ধরে পানির সংকটে ভুগছে মিরপুর-১১মিরপুরের-১১ নম্বর সেকশনে ওয়াসার লাইনে পানি নেই। তাই কুয়া থেকে পানি নিচ্ছে লোকজন, ছবি: জাগো নিউজ

প্রায় ১৮ বছর ধরে ওই এলাকায় বসবাস করেন পারভীন আক্তার। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) তার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তরকারি কেটে বসে আছেন। কিন্তু বাসায় পানি নেই, গ্যাসও নেই।

পারভীন জানান, দেড় যুগ ধরে মিরপুরে থাকলেও আগে কখনো এমন সংকটে পড়েননি। পানির অভাবে আড়াই থেকে তিন মাস ধরে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

পারভীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘পাঁচ থেকে সাত দিন পর পানি আসে। এলেও আধা ঘণ্টার বেশি থাকে না। অনেক সময় ১০ মিনিটের মধ্যেই পানি শেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে ৮০০ টাকা দিয়ে এক গাড়ি পানি কিনতে হয়। কিন্তু সাততলা ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে সেই পানি ভাগ করে দিলে দুই-চার বালতির বেশি কারও ভাগে পড়ে না।’

তার ভাষ্য, ‘পাশের বাসা থেকে অল্প পানি এনে বাচ্চাদের হাত-মুখ ধুইয়ে মাদরাসায় পাঠাতে হয়েছে। লাইনে পানি না থাকায় খাবার পানিও পাওয়া যাচ্ছে না। ঠিকমতো গোসল করতে না পারায় বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা উম্মে সালমা জাগো নিউজকে বলেন, ‘পানির সংকটে পুরো এলাকার মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন। আমরা নিজেরা অসুস্থ হচ্ছি, বাচ্চারাও অসুস্থ হচ্ছে। বাসনপত্র ধোয়া যায় না, ঘরবাড়ি নোংরা হয়ে থাকে। মুরব্বিরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। অনেক সময় তিন দিন পর গোসল করতে হয়।’

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি কোথাও কোনো সমস্যা থাকে, তাহলে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিক। যেভাবেই হোক আমাদের নিয়মিত পানির ব্যবস্থা করে দিক।’

মাসের পর মাস ধরে পানির সংকটে ভুগছে মিরপুর-১১ওয়াসার কাছ থেকে পানি না পেয়ে অনেকে বাড়িতে নলকূপ বসানোর চেষ্টা করছেন, ছবি: জাগো নিউজ

নতুন রাস্তা নির্মাণের পর থেকে সমস্যা তীব্র

১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ২ ও ৩ নম্বর লেনের বেশির ভাগ বাসিন্দা ওয়াসার পানি পাচ্ছেন না চার মাসের বেশি সময় ধরে। এই দুটি লেনে নতুন সড়ক নির্মাণের পর থেকে এ সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা। অথচ এই দুটি লেনের সামনে থাকা বিহারি ক্যাম্পের লোকজন অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে নিয়মিত পানি পাচ্ছেন বলে তারা অভিযোগ করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সারাদিনে মাত্র ১৫ মিনিট পানি পাওয়া যায়। ওই সামান্য পানিতে কিছুই হয় না। পানির অভাবে খুবই কষ্টে আছি।’

আরেক বাসিন্দা আবু সায়েম বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের লোকজন নতুন রাস্তা বানানোর পর গত ২০ মার্চ থেকে পানির সমস্যা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে সিটি করপোরেশন ও ওয়াসা কেউ দায় নিতে চাচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘মাঝখানে চার-পাঁচদিন পানি এসেছিল। কিন্তু এখন আবার সমস্যা। দুটি রোডের বেশির ভাগ বাসার লোকজনই পানি পাচ্ছেন না। বাকিরা পানি পেলেও খুব কম পাচ্ছেন।’

মাসের পর মাস ধরে পানির সংকটে ভুগছে মিরপুর-১১ওয়াসার এই এক গাড়ি পানির দাম ৬০০ টাকা হলেও সেই দামে কেউ কিনতে পারে না, ছবি: জাগো নিউজ

টাকা বেশি দিলেই মেলে গাড়ির পানি

ওয়াসার লাইনের পানি না পেয়ে লোকজনকে বাধ্য হয়ে গাড়ির পানি কিনতে হচ্ছে। এজন্য ওয়াসার মডস জোনের নির্ধারিত নম্বরে সকালে ফোন দিয়ে সিরিয়াল দিতে হয়। ছোট গাড়ির পানির সরকার নির্ধারিত মূল্য ৪০০ টাকা, বড় গাড়ির মূল্য ৬০০ টাকা। কিন্তু এই দামে পানি কখনোই পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। এছাড়া পানির চাহিদা দিয়ে তা সময় মতো পাওয়া যায় না। ছোট গাড়ির পানির জন্য ৬০০-৭০০ টাকা ও বড় গাড়ির জন্য ৮০০-১০০০ টাকা করে দিতে হচ্ছে।

পারভীন আক্তার বলেন, ‘আজ সকালে অর্ডার দিলে আজই পানি পাওয়া যায় না। দুদিন অপেক্ষা করতে হয়। ওয়াসার নম্বরে সাত-আট, এমনকি ১০ বার ফোন করেও পানি পাওয়া যায় না। এক গাড়ি দিলে আরেক গাড়ি দেয় না। কিন্তু ২০০ টাকা বাড়িয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে পানি দিয়ে যায়। না দিলে বলে সিরিয়াল আছে। এটা তো এক ধরনের দুর্নীতি।’

আরেক বাসিন্দা উম্মে সালমা বলেন, ‘অফিসে বা কাগজে এক গাড়ি পানির দাম ৬০০ টাকা বলা হয়। কিন্তু বাসায় এসে এক হাজার টাকা চাওয়া হয়। এমনিতেই পানি নেই, তার ওপর বেশি টাকা দিয়ে পানি কিনতে হচ্ছে। এতে আমাদের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।’

ওয়াসার লাইনের পানি না পেয়ে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকার পানি কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মিরপুর-১১ নম্বরের আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম

তিনি বলেন, ‘পানি না থাকায় বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না, অফিসগামী মানুষ সময়মতো অফিসে যেতে পারে না। পুরো এলাকার লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।’

মাসের পর মাস ধরে পানির সংকটে ভুগছে মিরপুর-১১মিরপুরে মডস-১০-এর কার্যালয়, ছবি: জাগো নিউজ

অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টি জানে না ওয়াসা!

পানির গাড়িতে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াসার মডস জোন-১০ এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাইন বিল্লাহ আলমগীর জাগো নিউজকে বলেন, ট্যাংকারের গায়ে বড় অক্ষরে পানির নির্ধারিত মূল্য লেখা থাকে। ৬০০, ৪০০ বা ৩০০ টাকা-যে মূল্য লেখা আছে, সেটিই পরিশোধ করার কথা। ৮০০ বা ৯০০ টাকা নেওয়ার বিষয়টি তার জানা নেই।

তিনি বলেন, ‘কেউ যদি নিজের সুবিধার জন্য সিরিয়ালের আগে পানি পাওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে থাকেন, সেটি ব্যক্তিগত বিষয়। অফিসের নির্ধারিত মূল্যের বাইরে কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই।’

মোস্তাইন বিল্লাহ আরও জানান, ট্যাংকারের পানির জন্য ওয়াসার অভিযোগ কেন্দ্র বা ১৬১৬২ হটলাইনে যোগাযোগ করা যাবে। অভিযোগের ভিত্তিতে সিরিয়াল অনুযায়ী পানি সরবরাহ করা হয়।

মাসের পর মাস ধরে পানির সংকটে ভুগছে মিরপুর-১১বাসায় ওয়াসার পানি নেই। তাই দূর থেকে এক বোতল পানি নিয়ে আসছেন এক ব্যক্তি, ছবি: জাগো নিউজ

পানির কোনো সংকট নেই, দাবি ওয়াসার

মিরপুরের-১১ নম্বর সেকশনে পানির সংকটের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ওয়াসার মডস জোন-১০ এর নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. আসাদুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মিরপুরে এখন পানির কোনো সংকট নেই। ২০-২২ দিন আগে পানির সংকট থাকলেও এখন নেই।’

একাধিক বাসিন্দা জাগো নিউজের কাছে পানির সংকটের কথা জানিয়েছেন বলে জানালে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমার কাছে পানির সংকটের কোনো রেকর্ড নেই। তাদের অভিযোগ দিতে বলেন।’

ওয়াসায় অভিযোগ জানিয়েও কাজ হয়নি

নির্বাহী প্রকৌশলীর দাবি সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের একাধিক বাসিন্দা। তারা বলছেন, তারা ওয়াসার হটলাইন বা হেল্পলাইন নম্বর ১৬১৬২-তে প্রতিনিয়ত অভিযোগ করে পানির সমস্যার বিষয়টি জানান। হেল্পলাইনের কর্মরত ব্যক্তিরা তাদের জানান, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠাবেন। এছাড়া মিরপুরে মডস জোন-১০ এর কার্যালয়ে গিয়েও অভিযোগ জানিয়েছেন।

মিরপুর-১১ নম্বরের বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘মাসে অনেক টাকার বিল দিই। কিন্তু সেই অনুযায়ী পানি পাই না। ওয়াসায় বহুবার গিয়ে অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।’

রফিক অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও নাগরিক সুবিধা পাচ্ছি না। সরকারের উচিত মাঠপর্যায়ে এসে কোথায় কী সমস্যা, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।’

আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম বলেন, দুই মাস ধরে তারা ভয়াবহ পানি সংকটে রয়েছেন। বিষয়টি ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-১০ এর নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যকেও অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো সমাধান হয়নি।

এমএমএআর/ এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow