মিছিলের মাইলেজে চেয়ারম্যানের চেয়ার
দীর্ঘ পনেরো বছর পর ক্ষমতায় এসে বিএনপি সত্যিই একটি ঐতিহাসিক সংস্কার করেছে। এতদিন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অনুগত আমলাদের বসানোর যে পুরোনো, সেকেলে, আমলাতান্ত্রিক রীতি ছিল, সেটিকে তারা সাহসের সঙ্গে ভেঙে দিয়েছে। এবার আর ঘুরপথ নয়। সরাসরি দলের নেতারাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাল ধরছেন। একে বলে স্বচ্ছতা। যাকে বসানো হবে, তাঁর পরিচয় নিয়ে অন্তত কারও বিভ্রান্তি থাকবে না। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটিও কম অর্জন নয়। অনেকটা আমেরিকার রাজনৈতিক নিয়োগব্যবস্থার মতো। পার্থক্য শুধু, সেখানে একে বলে রাজনৈতিক অ্যাপয়েন্টমেন্ট, আর এখানে মনে হচ্ছে একে বলা যেতে পারে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সর্বজনীন কর্মসূচি। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি মো. সালাহউদ্দিন সরকার এখন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক। এতে বিস্ময়ের কী আছে? এতদিন শ্রমিকদের রাজনীতি করেছেন, এবার শ্রমিকদের রাষ্ট্রীয় অভিভাবক। একে বলে কর্মজীবনের স্বাভাবিক পদোন্নতি। জীবনবৃত্তান্তে ধারাবাহিকতা থাকাটাও তো একটি গুণ। বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হক এখন বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আন্তর্জাতিক
দীর্ঘ পনেরো বছর পর ক্ষমতায় এসে বিএনপি সত্যিই একটি ঐতিহাসিক সংস্কার করেছে। এতদিন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অনুগত আমলাদের বসানোর যে পুরোনো, সেকেলে, আমলাতান্ত্রিক রীতি ছিল, সেটিকে তারা সাহসের সঙ্গে ভেঙে দিয়েছে। এবার আর ঘুরপথ নয়। সরাসরি দলের নেতারাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাল ধরছেন। একে বলে স্বচ্ছতা। যাকে বসানো হবে, তাঁর পরিচয় নিয়ে অন্তত কারও বিভ্রান্তি থাকবে না। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এটিও কম অর্জন নয়। অনেকটা আমেরিকার রাজনৈতিক নিয়োগব্যবস্থার মতো। পার্থক্য শুধু, সেখানে একে বলে রাজনৈতিক অ্যাপয়েন্টমেন্ট, আর এখানে মনে হচ্ছে একে বলা যেতে পারে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সর্বজনীন কর্মসূচি।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি মো. সালাহউদ্দিন সরকার এখন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক। এতে বিস্ময়ের কী আছে? এতদিন শ্রমিকদের রাজনীতি করেছেন, এবার শ্রমিকদের রাষ্ট্রীয় অভিভাবক। একে বলে কর্মজীবনের স্বাভাবিক পদোন্নতি। জীবনবৃত্তান্তে ধারাবাহিকতা থাকাটাও তো একটি গুণ।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হক এখন বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আন্তর্জাতিক কূটনীতি থেকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার। পৃথিবী গোল বলেই মানুষ একদিন না একদিন গন্তব্যে পৌঁছে যায়।
কেন্দ্রীয় কমিটির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এবং সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এখন বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান। বন নিয়ে যাঁর এতদিন রাজনৈতিক মমতা ছিল, তিনি এবার গাছেরও অভিভাবক। আশা করা যায়, অন্তত বন আর সংগঠনের মধ্যে দূরত্ব থাকবে না।
শেষ পর্যন্ত মনে হয়, বাংলাদেশের রাজনীতি আসলে নদীর মতো। স্রোত বদলায়, মাঝি বদলায়, নৌকার রং বদলায়, কিন্তু ঘাটের দৃশ্য খুব একটা বদলায় না। এপারের মানুষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওপারের দিকে তাকায়। ওপারে গিয়ে আবার এপারের গল্প করে। শুধু চেয়ারটি নির্বিকার থাকে। সে জানে, ইতিহাসে সবচেয়ে স্থায়ী জিনিস আদর্শ নয়, নীতিও নয়। সবচেয়ে স্থায়ী বস্তুটির নাম সম্ভবত… চেয়ার।
সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী এখন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের চেয়ারম্যান। ধর্ম থেকে নদী। আধ্যাত্মিকতা থেকে নৌপথ। রাজনীতি যে আসলে সব স্রোতকে এক জায়গায় মিলিয়ে দিতে পারে, এটি তারই প্রমাণ। একে হয়তো বলা যায় সর্বধর্ম সমন্বয়ের জলপথ সংস্করণ।
জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি কামরুজ্জামান দুলাল এখন জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব। রংপুরের সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক এখন ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান। রাজনীতিতে এতদিন সংগঠন গড়েছেন, এবার ইস্পাত গড়বেন। রাজনীতি মানুষকে সত্যিই বহুমুখী করে তোলে।
জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান সুরূজ এখন চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান। এতদিন রাজনীতির তিক্ততা সামলেছেন, এবার রাষ্ট্রীয় চিনির মিষ্টতা সামলাবেন। অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা বলেই তো একে।
সহ বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপু এখন জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি জাকির হোসেন সিদ্দিকী এখন তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান। রাজনৈতিক সুতা এতদিন নিখুঁতভাবে বুনেছেন, এবার তাঁতের সুতা বুনবেন। বয়নশিল্পে ধারাবাহিকতার এমন দৃষ্টান্ত বিরল।
বেনজীর আহমেদ টিটো এখন বিসিকের চেয়ারম্যান। মামুন হাসান এখন বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান। শুনে মনে হচ্ছে, রাষ্ট্র ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ সাংগঠনিক সম্মেলনে পরিণত হচ্ছে। শুধু ব্যানারের জায়গায় এখন সাইনবোর্ড, আর মঞ্চের জায়গায় চেয়ারম্যানের কক্ষ।
এই বারোটি নিয়োগের তালিকা পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে হলো, রাষ্ট্র বুঝি অবশেষে মেধার প্রকৃত সংজ্ঞা আবিষ্কার করেছে। এতদিন আমরা ভুল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, পেশাগত অভিজ্ঞতা আর প্রশাসনিক দক্ষতাকেই যোগ্যতা বলে ভেবেছিলাম। অথচ প্রকৃত যোগ্যতা হয়তো ছিল রোদে পুড়ে মিছিল করা, বৃষ্টিতে ভিজে পোস্টার মারা, রাত জেগে কর্মসূচি সফল করা, আর প্রয়োজনে এক মঞ্চে পাঁচটি ক্ষুব্ধ গ্রুপকে একই স্লোগানে রাজি করানো। এই দক্ষতা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখানো হয় না। রাজনৈতিক মাঠই এ দেশের সবচেয়ে বড় বিজনেস স্কুল, সবচেয়ে বড় প্রশাসন একাডেমি এবং সম্ভবত সবচেয়ে সফল মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান।
অনেকে এখনো সরলমনে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নাকি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বসানো উচিত। শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন। বিশেষজ্ঞ হওয়া কি এতই সহজ? একজন প্রকৌশলী সেতু বানাতে পারেন, কিন্তু পাঁচ হাজার কর্মীকে একই সময়ে করতালি দিতে শেখাতে পারেন? একজন অর্থনীতিবিদ বাজেট বোঝেন, কিন্তু তিন ঘণ্টার সভা শেষে সবাইকে এই বিশ্বাসে বাড়ি পাঠাতে পারেন যে সভাটি অত্যন্ত সফল হয়েছে? প্রশাসনেরও তো আলাদা বিজ্ঞান আছে।
প্রবাদে বলে, ‘যার কাজ, তারই সাজে।’ সময় বদলেছে। এখন মনে হয় প্রবাদটিরও আধুনিক সংস্করণ দরকার। ‘যার আস্থা, তারই ব্যবস্থা।’ কারণ রাষ্ট্র চালাতে বিশ্বাসই তো সবচেয়ে বড় মূলধন। হিসাব-নিকাশ পরে শেখা যাবে। কিন্তু আস্থার সার্টিফিকেট সব বিশ্ববিদ্যালয় দেয় না।
একসময় চাকরির আবেদনপত্রে লেখা থাকত শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ। ভবিষ্যতে হয়তো নতুন একটি ঘর যোগ হবে—‘মিছিলে অংশগ্রহণ’। তার নিচে উপঘর থাকবে—‘স্লোগান প্রদানে দক্ষতা’, ‘ব্যানার বহনের অভিজ্ঞতা’, ‘দীর্ঘ রাজনৈতিক বৈঠকে জেগে থাকার সক্ষমতা’, ‘এক কাপ চায়ে চার ঘণ্টা আলোচনা পরিচালনার বিশেষ প্রশিক্ষণ’। এগুলোও তো দক্ষতা। বরং বহু ক্ষেত্রে এগুলোই বাস্তবমুখী শিক্ষা।
রাষ্ট্রেরও লাভ কম নয়। যারা দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছেন, তারা সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পান না। সমালোচনায় ঘুম নষ্ট করেন না। ফাইলের পুরুত্ব দেখে বিচলিত হন না। তাঁরা জানেন, সভা শেষে করতালি কবে দিতে হয়, নীরব থাকতে হয় কবে, আর কখন টেবিলে হাত চাপড়ে বলতে হয়, ‘সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত।’ প্রশাসনে এই অভিজ্ঞতার বাজারমূল্য অমূল্য।
সবচেয়ে মুগ্ধ হওয়ার বিষয় অবশ্য নিয়োগব্যবস্থার সৃজনশীলতা। আগে ভাবতাম মানুষ চাকরি খোঁজে। এখন দেখি, চাকরিও মানুষকে খুঁজে নেয়। যেন দাবার বোর্ডে সব গুটি আগেই সাজানো ছিল। শুধু সময়মতো একজন অদৃশ্য খেলোয়াড় চাল দিলেন, আর সবাই নিজ নিজ ঘরে পৌঁছে গেলেন। দর্শকেরা শুধু করতালি দেওয়ার সুযোগ পেলেন।
একসময় শোনা যেত, ‘মাছের রাজা ইলিশ, চাকরির রাজা বিসিএস।’ এখন মনে হচ্ছে প্রবাদটি জাদুঘরে পাঠানোর সময় হয়েছে। পৃথিবী যখন বদলাচ্ছে, প্রবাদও তো বদলাবে। নতুন প্রজন্ম হয়তো বলবে, চাকরির বাজারে সবচেয়ে মূল্যবান দক্ষতা হলো সঠিক সময়ে সঠিক মঞ্চে উপস্থিত থাকার শিল্প।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনীতির দূরত্বও এখন অনেক কমে গেছে। আগে দুজনের মধ্যে একটা পর্দা ছিল। এখন সেই পর্দাটিও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা বেড়েছে। দর্শকদের আর অনুমান করতে হয় না। নাটকের শুরুতেই সব চরিত্রের পরিচয় ঘোষণা হয়ে যায়।
ভাবছি, ভবিষ্যতে বিসিএস কোচিং সেন্টারগুলোও হয়তো নতুন সিলেবাস চালু করবে। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণ জ্ঞানের পাশাপাশি থাকবে ‘সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনা’, ‘মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিক করতালি গ্রহণ’, ‘মাইক বিকল হলে উচ্চকণ্ঠে বক্তৃতা’, ‘হঠাৎ কর্মসূচি পরিবর্তনের কৌশল’ এবং ‘চেয়ার দর্শন’। কারণ এই দেশে চেয়ার কেবল আসবাব নয়। এটি এক ধরনের দার্শনিক অবস্থান। মানুষ বদলায়, নামফলক বদলায়, পতাকার রং বদলায়, কিন্তু চেয়ার চুপচাপ বসে থাকে। সে জানে, তার প্রকৃত মালিক কেউ নয়। সবাই কেবল সাময়িক ভাড়াটে।
শেষ পর্যন্ত মনে হয়, বাংলাদেশের রাজনীতি আসলে নদীর মতো। স্রোত বদলায়, মাঝি বদলায়, নৌকার রং বদলায়, কিন্তু ঘাটের দৃশ্য খুব একটা বদলায় না। এপারের মানুষ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওপারের দিকে তাকায়। ওপারে গিয়ে আবার এপারের গল্প করে। শুধু চেয়ারটি নির্বিকার থাকে। সে জানে, ইতিহাসে সবচেয়ে স্থায়ী জিনিস আদর্শ নয়, নীতিও নয়। সবচেয়ে স্থায়ী বস্তুটির নাম সম্ভবত… চেয়ার।
লেখক : জ্যেষ্ঠ কলামিস্ট।
এইচআর/এএসএম
What's Your Reaction?