মিশিগানে বাংলাদেশি-আমেরিকান ফ্যাস্টিভ্যালে ঐতিহ্যের অনন্য উৎসব

হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করলেও প্রবাসীদের হৃদয়ের গভীরে লাল-সবুজের টান সবসময়ই অমলিন। জন্মভূমি থেকে দূরে থেকেও বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর আবেগকে বুকে ধারণ করে প্রবাসী বাংলাদেশি-আমেরিকানরা আবারও মিলিত হলেন এক বর্ণিল উৎসবে। ‘জন্মভূমির স্পর্শ, হৃদয়ের বাসভূমে’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ওয়ারেন সিটির সিটি স্কয়ারে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব মিশিগান (বাম) আয়োজিত ১৭তম বাংলাদেশ–আমেরিকান ফেস্টিভ্যাল। আরও পড়ুন মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগে ১-২ দিনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দুই দিনব্যাপী এই উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশি পরিচয়, ঐক্য, সম্প্রীতি এবং বহুসাংস্কৃতিক আমেরিকায় প্রবাসীদের ক্রমবর্ধমান সাফল্যের এক অনন্য উদযাপন। গত ২৫ ও ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে মিশিগানের পাশাপাশি নিউইয়র্ক, ওহাইও, ইন্ডিয়ানা, ইলিনয় এবং কানাডার টরেন্টোসহ বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো বাংলাদেশি পরিবার অংশ নেয়। নিউইয়র্কের পর মিশিগানেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস সবচেয়ে বেশি। ফলে প্রতি বছরের মতো এবারও উৎসব প

মিশিগানে বাংলাদেশি-আমেরিকান ফ্যাস্টিভ্যালে ঐতিহ্যের অনন্য উৎসব

হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করলেও প্রবাসীদের হৃদয়ের গভীরে লাল-সবুজের টান সবসময়ই অমলিন। জন্মভূমি থেকে দূরে থেকেও বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর আবেগকে বুকে ধারণ করে প্রবাসী বাংলাদেশি-আমেরিকানরা আবারও মিলিত হলেন এক বর্ণিল উৎসবে।

‘জন্মভূমির স্পর্শ, হৃদয়ের বাসভূমে’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ওয়ারেন সিটির সিটি স্কয়ারে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব মিশিগান (বাম) আয়োজিত ১৭তম বাংলাদেশ–আমেরিকান ফেস্টিভ্যাল।

দুই দিনব্যাপী এই উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশি পরিচয়, ঐক্য, সম্প্রীতি এবং বহুসাংস্কৃতিক আমেরিকায় প্রবাসীদের ক্রমবর্ধমান সাফল্যের এক অনন্য উদযাপন।

jagonews24

গত ২৫ ও ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে মিশিগানের পাশাপাশি নিউইয়র্ক, ওহাইও, ইন্ডিয়ানা, ইলিনয় এবং কানাডার টরেন্টোসহ বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো বাংলাদেশি পরিবার অংশ নেয়। নিউইয়র্কের পর মিশিগানেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস সবচেয়ে বেশি। ফলে প্রতি বছরের মতো এবারও উৎসব প্রাঙ্গণ পরিণত হয়েছিল প্রবাসী বাঙালিদের এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায়; যেখানে খোলা আকাশের নিচে ফুটে উঠেছিল নস্টালজিয়া, সংস্কৃতি, আনন্দ আর শেকড়ের টান।

উৎসবজুড়ে ছিল গ্রামীণ বাংলার আবহ। দেশীয় খাবারের সুগন্ধ, রঙিন শাড়ি, থ্রি-পিস, হস্তশিল্প, গহনা, শিশুদের খেলনা এবং বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০টিরও বেশি স্টল দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর ছিল দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত। সন্ধ্যা ঘনানোর সঙ্গে সঙ্গে খাবারের স্টলগুলোতে দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা যায়। আয়োজকদের চমৎকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পার্কিং, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং ভ্রাম্যমাণ টয়লেটের সুব্যবস্থা দর্শনার্থীদের প্রশংসা কুড়ায়।

jagonews24

উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল এর মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বাংলা লোকসংস্কৃতি থেকে শুরু করে আধুনিক সংগীত এবং পাশ্চাত্য ঘরানার সংমিশ্রণ-সবকিছুই যেন এক মঞ্চে মিলেমিশে এক অপূর্ব আবহ সৃষ্টি করে। গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী কলসি নৃত্য, লোকজ পরিবেশনা এবং শিশু-কিশোরদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় শেকড়ের কাছে। দুই দিনজুড়ে মঞ্চে পরিবেশিত হয় নৃত্য, সংগীত ও কমিউনিটি সাংস্কৃতিক আয়োজন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন সুমন কবির ও শারমিন তানিম।

প্রথম দিনের সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাউলশিল্পী কালা মিয়া ও জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী রেশমি মির্জার পরিবেশনায় ছড়িয়ে পড়ে বাংলার মাটির সুর। দ্বিতীয় দিনের মূল আকর্ষণ ছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী দিলশাদ নাহার কনা এবং তরুণ প্রজন্মের শিল্পী মুজা ও অনিক রাজ। কনা মঞ্চে উঠতেই হাজারো দর্শকের করতালি ও উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো সিটি স্কয়ার। একের পর এক জনপ্রিয় গান পরিবেশন করে তিনি উৎসবকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যান। পরে মুজার প্রাণবন্ত পরিবেশনা এবং মঞ্চ থেকে নেমে দর্শকদের মাঝে গিয়ে গান গাওয়া উৎসবকে এক আনন্দঘন মিলনোৎসবে পরিণত করে। এছাড়া স্থানীয় শিল্পী ও ব্যান্ডগুলোর পরিবেশনাও দর্শকদের দারুণভাবে মুগ্ধ করে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব মিশিগান (বাম) দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছে। প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের কাছে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে শেকড়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে সংগঠনটির ভূমিকা প্রশংসিত। প্রতি বছরের এই উৎসব এখন প্রবাসীদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ ও তা প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

jagonews24

আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিবিদ ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তা দেন মিশিগানের সেক্রটারি অব স্টেট জোসলিন বেনসন।

সশরীরে উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন মিশিগান স্টেটের লেফটেন্যান্ট গভর্নর গার্লিন গিলক্রিস্ট, ওয়ারেন সিটির মেয়র লরি স্টোনসহ একাধিক সিটি কাউন্সিলর ও জনপ্রতিনিধি। তারা বাংলাদেশি–আমেরিকান কমিউনিটির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

তাদের বক্তব্যে উঠে আসে ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, জনসেবা এবং উদ্যোক্তা খাতে প্রবাসীদের অর্জিত সাফল্য, যা আজ মিশিগানের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে বহুসাংস্কৃতিক আমেরিকাকে সমৃদ্ধ করতে বাংলাদেশি–আমেরিকানদের ইতিবাচক ভূমিকার প্রশংসা করে তারা বলেন, এ ধরনের উৎসব বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন আরও শক্তিশালী করে।

উৎসবজুড়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে অংশ নেন নানা বয়সের অভিবাসীরা। প্রবীণদের আবেগঘন উপস্থিতি, শিশুদের হাসি ও তরুণদের অংশগ্রহণ পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তোলে। আয়োজনের বাড়তি আকর্ষণ ছিল আকর্ষণীয় র‍্যাফেল ড্র।

এছাড়া, উৎসবের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে দেশের জনপ্রিয় গণমাধ্যম ডিবিসি টেলিভিশন ও জাগোনিউজ২৪.কমসহ অন্যান্য গণমাধ্যমকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

jagonews24

উৎসবের সমাপনীতে ‘বাম’-এর সভাপতি জাবেদ চৌধুরী বলেন, ‘‘১৭তম বাংলাদেশ–আমেরিকান ফেস্টিভ্যাল সফল করতে যারা নিরলস পরিশ্রম করেছেন-সংগঠনের নেতা-কর্মী, স্পন্সর, ভেন্ডর, গণমাধ্যমকর্মী, মূলধারার রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন কমিউনিটির প্রতিনিধি এবং হাজারো দর্শনার্থীদের প্রতি আমরা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। তাদের ভালোবাসাই আমাদের আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের সংস্কৃতি তুলে ধরতে অনুপ্রাণিত করবে।”

দুই দিনের আয়োজন শেষ হলেও এর স্মৃতি রয়ে গেছে হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশির হৃদয়ে। বাংলা গানের সুর, খাবারের সুবাস, রঙিন পোশাক ও প্রাণখোলা আড্ডায় ওয়ারেন সিটির সিটি স্কয়ার যেন রূপ নিয়েছিল এক খণ্ড বাংলাদেশে। ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক না কেন, সংস্কৃতি ও শেকড়ের প্রতি ভালোবাসাই প্রবাসী বাংলাদেশিদের আসল পরিচয়-এই উৎসব যেন সেটিই আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিলো।

এমআরএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow