মুসলিম নন, তবু কেন মহররম পালন করেন হুসাইনি ব্রাহ্মণরা?

মহররম মাস এলেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শোক, স্মরণ আর আত্মত্যাগের নানা আয়োজন দেখা যায়। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণে শিয়া মুসলমানরা আশুরা পালন করেন গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে। তবে অনেকেরই অজানা, এই শোকানুষ্ঠানে অংশ নেন এমন কিছু মানুষও আছেন, যারা মুসলিম নন। ভারতের একটি বিশেষ হিন্দু ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় ‘হুসাইনি ব্রাহ্মণ’ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মহররম পালন করে আসছেন। কারবালার প্রান্তরে ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ৬১) মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) শহীদ হন। এই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায়। প্রতিবছর মহররমের ১০ তারিখ, অর্থাৎ আশুরার দিনে শিয়া মুসলমানরা এই আত্মত্যাগ স্মরণ করেন শোকানুষ্ঠান, তাজিয়া মিছিল ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। তবে শুধু মুসলিমদের মধ্যেই নয়, এই ঘটনার প্রভাব ছড়িয়ে আছে অন্য ধর্মের একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্যেও। তারা হলেন হুসাইনি ব্রাহ্মণ। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের মোহিয়াল ব্রাহ্মণ নামেও পরিচিতি রয়েছে। বর্তমানে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ এবং ভারতের পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, কাশ্মীর

মুসলিম নন, তবু কেন মহররম পালন করেন হুসাইনি ব্রাহ্মণরা?

মহররম মাস এলেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শোক, স্মরণ আর আত্মত্যাগের নানা আয়োজন দেখা যায়। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার স্মরণে শিয়া মুসলমানরা আশুরা পালন করেন গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে। তবে অনেকেরই অজানা, এই শোকানুষ্ঠানে অংশ নেন এমন কিছু মানুষও আছেন, যারা মুসলিম নন। ভারতের একটি বিশেষ হিন্দু ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় ‘হুসাইনি ব্রাহ্মণ’ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মহররম পালন করে আসছেন।

কারবালার প্রান্তরে ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ৬১) মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) শহীদ হন। এই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায়। প্রতিবছর মহররমের ১০ তারিখ, অর্থাৎ আশুরার দিনে শিয়া মুসলমানরা এই আত্মত্যাগ স্মরণ করেন শোকানুষ্ঠান, তাজিয়া মিছিল ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।

jagonewsতবে শুধু মুসলিমদের মধ্যেই নয়, এই ঘটনার প্রভাব ছড়িয়ে আছে অন্য ধর্মের একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্যেও। তারা হলেন হুসাইনি ব্রাহ্মণ। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের মোহিয়াল ব্রাহ্মণ নামেও পরিচিতি রয়েছে। বর্তমানে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ এবং ভারতের পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, কাশ্মীর, দিল্লি ও লখনৌসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক হাজার হুসাইনি ব্রাহ্মণের বসবাস রয়েছে। কিছু গবেষকের মতে, আরব উপদ্বীপেও তাদের ছোট ছোট সম্প্রদায় রয়েছে।

মোহিয়াল ব্রাহ্মণরা ঐতিহাসিকভাবে যোদ্ধা ব্রাহ্মণ হিসেবে পরিচিত। তাদের অনেক বংশধর আজও ভারতীয় সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন। তবে তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

এই সম্পর্কের পেছনে একটি বহুল প্রচলিত জনশ্রুতি রয়েছে। হুসাইনি ব্রাহ্মণদের বিশ্বাস অনুযায়ী, কারবালার যুদ্ধে ভারতের এক সারস্বত ব্রাহ্মণ যোদ্ধা রাহিব সিধ দত্ত (বা রাহব দত্ত) ইমাম হুসাইন (রা.)-এর পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন। শুধু তিনিই নন, তাঁর সাত পুত্রও সেই যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করেন বলে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে।

jagonewsতবে ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এই ঘটনার পক্ষে নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায় না। ফলে এটি ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত সত্যের চেয়ে বরং একটি লোককথা বা সম্প্রদায়গত ঐতিহ্য হিসেবেই বেশি পরিচিত।

বাংলা সাহিত্যে প্রায় ১৪০ বছর আগে মীর মশাররফ হোসেনের 'বিষাদ সিন্ধু' কারবালার ঘটনাকে অমর করে তুললেও সেখানে রাহিব সিধ দত্তের উল্লেখ নেই। তবু ভারতীয় উপমহাদেশে বহু হুসাইনি ব্রাহ্মণ নিজেদের সেই বীর যোদ্ধার উত্তরসূরি বলে পরিচয় দেন এবং সেই ঐতিহ্যকে আজও লালন করে চলেছেন।

এই বিশ্বাস থেকেই তারা নিজেদের ধর্ম পরিবর্তন না করেও মহররমে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অনেকেই তাজিয়া মিছিলে যোগ দেন, কারবালার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং শিয়া মুসলমানদের অনেক ধর্মীয় রীতিও অনুসরণ করেন। বিশেষ করে মহররম মাসে আশুরা উদযাপন করে চলেছেন আজো।

jagonewsহুসাইনি ব্রাহ্মণদের এই ঐতিহ্য ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় সহাবস্থান ও সম্প্রীতির এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তারা হিন্দু ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখেও ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগকে মানবতা, ন্যায়বিচার ও সত্যের পক্ষে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

সংখ্যায় তারা খুব বেশি নন। কিন্তু শতাব্দী পেরিয়ে আজও যে ঐতিহ্য তারা ধরে রেখেছেন, তা দক্ষিণ এশিয়ার বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে। তাদের জীবনচর্চায় হিন্দু ও মুসলিম-দুই ধর্মের কিছু রীতি-নীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সহাবস্থান আজও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক বিরল নজির হিসেবে বিবেচিত হয়।

সূত্র: বিবিসি

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow