মোদীবিরোধী বিদ্রোহ! কেন বাবা-মায়ের আদর্শ ছাড়ছেন ভারতের তরুণরা?

ভারতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখন শুধু রাজপথে সীমাবদ্ধ নেই, ঢুকে পড়েছে অনেক পরিবারের মধ্যেও। দেশটিতে সাম্প্রতিক সরকাবিরোধী আন্দোলন অনেক পরিবারে বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে তৈরি করেছে গভীর রাজনৈতিক দূরত্ব। কেউ বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সমর্থক পরিবারের সন্তান হয়েও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। কেউ আবার বাবা-মায়ের আপত্তি উপেক্ষা করে বেছে নিয়েছেন ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ। তাদের অনেকেরই দাবি, পরিবারের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক চিন্তার পার্থক্য এতটাই বেড়েছে যে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনই একজন ১৯ বছর বয়সী কুনাল চৌধুরী। পাঞ্জাবের লুধিয়ানা থেকে গত ১৪ জুলাই দিল্লিতে তরুণদের আন্দোলনে যোগ দিতে যান তিনি। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আয়োজিত ওই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন হাজারো তরুণ। প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ২০ জনের বেশি পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। আন্দোলনের চাপে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন এবং সরকার ভর্তি পরীক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়। কুনালের জন্য দিল্লির আন্দোলনে যোগ দ

মোদীবিরোধী বিদ্রোহ! কেন বাবা-মায়ের আদর্শ ছাড়ছেন ভারতের তরুণরা?

ভারতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখন শুধু রাজপথে সীমাবদ্ধ নেই, ঢুকে পড়েছে অনেক পরিবারের মধ্যেও। দেশটিতে সাম্প্রতিক সরকাবিরোধী আন্দোলন অনেক পরিবারে বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে তৈরি করেছে গভীর রাজনৈতিক দূরত্ব।

কেউ বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সমর্থক পরিবারের সন্তান হয়েও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। কেউ আবার বাবা-মায়ের আপত্তি উপেক্ষা করে বেছে নিয়েছেন ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ। তাদের অনেকেরই দাবি, পরিবারের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক চিন্তার পার্থক্য এতটাই বেড়েছে যে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

এমনই একজন ১৯ বছর বয়সী কুনাল চৌধুরী। পাঞ্জাবের লুধিয়ানা থেকে গত ১৪ জুলাই দিল্লিতে তরুণদের আন্দোলনে যোগ দিতে যান তিনি। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আয়োজিত ওই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন হাজারো তরুণ।

প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ২০ জনের বেশি পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। আন্দোলনের চাপে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন এবং সরকার ভর্তি পরীক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়।

কুনালের জন্য দিল্লির আন্দোলনে যোগ দেওয়া ছিল বাড়ি ছাড়ার মতোই। তিনি বলেন, তার বাবা বিজেপি ও আরএসএসের সদস্য। নিজেও একসময় আরএসএসের সদস্য ছিলেন। কিন্তু আন্দোলনে যোগ দিতে গিয়ে তিনি বাড়ি ছাড়েন এবং শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষাও দিতে পারেননি।

কুনালের ভাষায়, চারপাশে যা ঘটছে তা দেখে চুপ করে বসে থাকা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

কুনালের বাবা জীবন চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত। কুনাল বলেন, ছোটবেলায় অনেকটা অনিচ্ছা থেকেই তিনি পরিবারের রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করেছিলেন।

তার অভিযোগ, আরএসএসে তাকে এমন কিছু শেখানো হয়নি যা বাস্তব জীবনে কাজে লাগে। বরং মুসলিম ও দলিতদের প্রতি ঘৃণা শেখানো হয়েছে।

ভারতের দলিত জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে বৈষম্যের শিকার। তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও সহিংসতার ঘটনা এখনো ঘটে।

কুনাল বলেন, আন্দোলনে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি তার পরিবার বুঝতে পারেনি তা হলো—সেখানে ধর্ম, জাত বা সামাজিক অবস্থান দিয়ে কাউকে আলাদা করা হয়নি। সবাই একসঙ্গে বসেছে, খেয়েছে এবং একে অপরকে সহযোগিতা করেছে।

আন্দোলনের সময় কুনালের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে তিনি সরকারের দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কথা বলেন এবং জানান, তিনি একজন বিজেপি কর্মীর ছেলে ও একসময় আরএসএসের সদস্য ছিলেন।

ভিডিওটি দেখার পর তার বাবা তাকে বিজেপি ও আরএসএসের বিরুদ্ধে কিছু না বলতে বলেন। কিন্তু কুনালের বক্তব্য, তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলেছেন।

বর্তমানে তিনি দিল্লির যন্তর মন্তরের কাছে একটি গুরুদ্বারে থাকছেন। আন্দোলনের সময় ওই শিখ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য দরজা খুলে দিয়েছিল।

কুনাল জানান, আন্দোলন চলাকালে তার কখনো না খেয়ে থাকতে হয়নি। কিন্তু আন্দোলন শেষ হওয়ার পর খাবার ও থাকার জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তার মানিব্যাগে থাকা টাকা ও পরিচয়পত্রও চুরি হয়ে গেছে।

তিনি এখন টেলিমার্কেটিংয়ের চাকরি করে নিজের খরচ চালাতে চান। পরে দূরশিক্ষণের মাধ্যমে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। মা তার সিদ্ধান্তে নীরবে সমর্থন দিলেও আপাতত বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা নেই।

২৪ বছর বয়সী প্রিয়া সিংয়ের গল্পও প্রায় একই। তার বাবা বিজেপির কট্টর সমর্থক। মেয়ে যন্তর মন্তরের আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তাকে শারীরিকভাবে মারধরের হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে জানান প্রিয়া।

আন্দোলনে যাওয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখতেন তিনি, যাতে ছবি বা ভিডিও দেখে তার বাবা তাকে চিনতে না পারেন। এমনকি তিনি বাবাকে জানিয়েছিলেন, মোদীর বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার জন্যই তিনি সেখানে যাচ্ছেন।

প্রিয়া দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী। বাড়ির কাউকে না জানিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন এবং পরে ভর্তি হন।

প্রিয়ার দাবি, তার বাবা আশঙ্কা করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মানুষ তাকে খারাপভাবে প্রভাবিত করবে এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করবে।

পরিবারের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু বা পড়াশোনা নিয়ে বাড়িতে খুব বেশি কথা বলেন না প্রিয়া। এমনকি বাড়িতে থাকাকালে বন্ধুদের ফোনও ধরেন না।

বাবা-মা আর সন্তানের দুই ভিন্ন রাজনৈতিক জগৎ

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অঞ্জলির ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক মতপার্থক্য তৈরি করেছে পারিবারিক দূরত্ব।

বিহারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা অঞ্জলি এখন বামপন্থি ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সঙ্গে যুক্ত। তার বাবা-মা বিজেপির সমর্থক এবং আরএসএসের সদস্য।

অঞ্জলি জানান, একসময় তিনিও মোদীর ভক্ত ছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালের দিকে তার চিন্তায় পরিবর্তন আসে। পরে তিনি এআইএসএতে যোগ দেন এবং বামপন্থি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

তার মা মাঝেমধ্যে গোপনে টেলিভিশনে মেয়ের বক্তব্য দেখেন এবং পরে ফোন করে প্রশংসা করেন। কিন্তু বাবার সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কথা এড়িয়ে চলেন অঞ্জলি।

২০ জুলাই আন্দোলনকারীরা যখন সংসদ অভিমুখে মিছিল করেন, সেদিন পুলিশ লাঠিচার্জে অঞ্জলি আহত হন। তার মা টেলিফোনে কাঁদতে কাঁদতে জানতে চান, মেয়ে ঠিক আছে কি না।

অঞ্জলির ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তার বাবা বলেন, তিনি আগেই জানতেন এই সরকার তাকে দমন করবে। তিনি প্রশ্ন করেন, তাদের মেয়ে কেন মার খেতে পছন্দ করে।

তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর অঞ্জলির মা তাকে নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন। তিনি মেয়েকে বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত এবং তারা প্রমাণ করেছে যে আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

‘তুমি দেশপ্রেমিক হয়ে গেছ’

২৯ বছর বয়সী নেহা বোরাও এমন পারিবারিক রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের উদাহরণ। তিনি এআইএসএর জাতীয় সভাপতি এবং দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী। আন্দোলনের সময় তিনি ২৩ দিন অনশন করেন।

তার বাবা একজন সেনা কর্মকর্তা এবং মা গৃহিণী। দুজনেই বিজেপির সমর্থক। মেয়ের বামপন্থি রাজনীতি তারা সহজভাবে নেননি।

তবে মেয়ের অনশনের খবর পেয়ে তার মা উত্তর প্রদেশের বেরেলি থেকে দিল্লির যন্তর মন্তরে ছুটে আসেন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর মেয়েকে অভিনন্দনও জানান তিনি।

কেন বাড়ছে প্রজন্মের রাজনৈতিক দূরত্ব?

আরএসএসের মুখপত্র ‘অর্গানাইজার’-এর সম্পাদক প্রফুল্ল কেতকার মনে করেন, পরিবারে প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ কমে যাওয়ার পেছনে সামাজিক পরিবর্তন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বড় ভূমিকা রয়েছে।

তার মতে, আগে দাদা-দাদিরা পরিবারে বাবা-মা ও সন্তানদের মধ্যে এক ধরনের সেতুর কাজ করতেন। কিন্তু এখন অনেক পরিবার ছোট হয়ে গেছে। একই ছাদের নিচে থাকা মানুষও মোবাইল ফোনে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলছে এবং নিজেদের মতের সঙ্গে মেলে এমন তথ্যই বেশি দেখছে।

তবে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক অনুভব সেনগুপ্তের মতে, বয়স্ক প্রজন্ম সাধারণত রাজনৈতিক বিষয়ে বাস্তববাদী অবস্থান নেয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অনেক সময় মূল্যবোধ ও আদর্শকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।

আন্দোলনের পর কী বদলাল?

দিল্লির গুরুদ্বারে থাকা কুনালও এখন নিজের পরিবার ও রাজনৈতিক বিশ্বাস নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। তার প্রশ্ন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে অবস্থান শেষ হলে বিজেপি ও তার সমর্থকেরা এরপর কাদের বিরুদ্ধে বিভাজনের রাজনীতি করবে?

তার মতে, এরপর উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের মানুষকে আলাদা করার চেষ্টা হতে পারে। তারপর আসতে পারে নতুন কোনো বিভাজন। তার বিশ্বাস, এই চক্র কখনো শেষ হয় না।

সম্প্রতি দিল্লিতে এক আরএসএস সদস্যের সঙ্গে তার দেখা হয়। ওই ব্যক্তি কুনালের ভাইরাল ভিডিও দেখেছিলেন। কুনাল তাকে প্রশ্ন করেন, বিজেপির ওপর প্রভাব থাকা সত্ত্বেও আরএসএস নেতারা কেন সরকারকে ভুল পথে না যেতে বলেন না।

জবাবে ওই ব্যক্তি তাকে বলেন, তুমি মনে হয় দেশপ্রেমিক হয়ে গেছ। আমরা দেশপ্রেমিক নই। আমাদের কাজ ঠিক করা আছে, আমরা সেটাই করে যাব।

কুনালের কাছে ওই কথাই তার সিদ্ধান্ত সঠিক হওয়ার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।

ভারতের সাম্প্রতিক তরুণদের আন্দোলন তাই শুধু শিক্ষা সংস্কার বা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অনেক পরিবারের ভেতরেও এটি তৈরি করেছে নতুন রাজনৈতিক প্রশ্ন। বাবা-মায়ের বিশ্বাস ও সন্তানের নতুন চিন্তার এই সংঘাত ভবিষ্যতের ভারতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: আল-জাজিরা

এমএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow