ময়লার ভাগাড়ে মিললো ‘প্লাস্টিক গেলা’ ছত্রাক

মানুষের তৈরি এমন এক ধরনের প্লাস্টিক, যা শত শত বছরেও সহজে নষ্ট হয় না, সেটি মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ধ্বংস ফেলতে সক্ষম একটি ছত্রাক। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি ময়লার ভাগাড়ে পাওয়া এই মাটির ছত্রাক ঘিরে এখন নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, প্রকৃতিই হয়তো মানুষের তৈরি প্লাস্টিক বর্জ্যের ভয়াবহ সংকটের সমাধানের পথ দেখাতে পারে। পলিউরেথেন (Polyurethane) এমন একটি প্লাস্টিক, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য পণ্যে ব্যবহৃত হয়। সোফার কুশন, দৌড়ানোর জুতা, রেফ্রিজারেটরের ইনসুলেশন, এমনকি কার্পেটের নিচের ফোমেও এই প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হলেও সবচেয়ে কম পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকগুলোর একটি। শত শত বছর টিকে থাকার মতো করে তৈরি হওয়ায় পলিউরেথেন এখন বৈশ্বিক প্লাস্টিক বর্জ্যের অন্যতম বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। তবে ইসলামাবাদের ময়লার ভাগাড়ে বসবাসকারী ‘অ্যাসপারজিলাস টিউবিনজেনসিস’ (Aspergillus tubingensis) নামের মাটির ছত্রাক মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই প্লাস্টিক ভেঙে ফেলতে পারে। যেভাবে প্লাস্টিক খেয়ে ফেলে এই ছত্রাক অ্যাসপারজিলাস টিউবিনজেনসিস একটি প্রাকৃতিক ছত্রা

ময়লার ভাগাড়ে মিললো ‘প্লাস্টিক গেলা’ ছত্রাক

মানুষের তৈরি এমন এক ধরনের প্লাস্টিক, যা শত শত বছরেও সহজে নষ্ট হয় না, সেটি মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ধ্বংস ফেলতে সক্ষম একটি ছত্রাক। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের একটি ময়লার ভাগাড়ে পাওয়া এই মাটির ছত্রাক ঘিরে এখন নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, প্রকৃতিই হয়তো মানুষের তৈরি প্লাস্টিক বর্জ্যের ভয়াবহ সংকটের সমাধানের পথ দেখাতে পারে।

পলিউরেথেন (Polyurethane) এমন একটি প্লাস্টিক, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য পণ্যে ব্যবহৃত হয়। সোফার কুশন, দৌড়ানোর জুতা, রেফ্রিজারেটরের ইনসুলেশন, এমনকি কার্পেটের নিচের ফোমেও এই প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হলেও সবচেয়ে কম পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকগুলোর একটি।

শত শত বছর টিকে থাকার মতো করে তৈরি হওয়ায় পলিউরেথেন এখন বৈশ্বিক প্লাস্টিক বর্জ্যের অন্যতম বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। তবে ইসলামাবাদের ময়লার ভাগাড়ে বসবাসকারী ‘অ্যাসপারজিলাস টিউবিনজেনসিস’ (Aspergillus tubingensis) নামের মাটির ছত্রাক মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই প্লাস্টিক ভেঙে ফেলতে পারে।

যেভাবে প্লাস্টিক খেয়ে ফেলে এই ছত্রাক

অ্যাসপারজিলাস টিউবিনজেনসিস একটি প্রাকৃতিক ছত্রাক, যা প্লাস্টিকের পৃষ্ঠে জন্মাতে পারে। এই ছত্রাক বিশেষ ধরনের এনজাইম নিঃসরণ করে, যা প্লাস্টিকের অণুগুলোর মধ্যে থাকা রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে দেয়। একই সঙ্গে ছত্রাকের শিকড়সদৃশ সূক্ষ্ম তন্তু বা মাইসেলিয়া শারীরিকভাবে প্লাস্টিককে টেনে আলাদা করে ফেলে।

পুরো প্রক্রিয়াটি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়।

প্রথমে ছত্রাকের স্পোর বা বীজাণু প্লাস্টিকের গায়ে আটকে যায়। এরপর ছত্রাকটি ধীরে ধীরে প্লাস্টিকের পুরো পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ ধাপে এনজাইমগুলো কাজ শুরু করে ও পলিউরেথেনকে দীর্ঘস্থায়ী ও অত্যন্ত টেকসই করে তোলা রাসায়নিক বন্ধনগুলো ভেঙে দেয়।

গবেষণাগারে তরল মাধ্যমে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় দুই মাসের মধ্যে পলিউরেথেন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়। আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় ৯০ শতাংশ প্লাস্টিক ক্ষয় হয়ে যায়, যেখানে সাধারণভাবে এই প্লাস্টিক নষ্ট হতে কয়েক দশক সময় লেগে যায়।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ছত্রাকের জন্য কোনো বিশেষ পরিবেশ, অত্যাধুনিক গবেষণাগার কিংবা মানুষের তৈরি জিনগত পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মানুষের ফেলে যাওয়া বর্জ্যের মধ্যে দীর্ঘদিন বসবাস করতে করতেই ছত্রাকটি স্বাভাবিকভাবে এই সক্ষমতা অর্জন করেছে।

কেন পলিউরেথেন এত বড় সমস্যা?

বিশ্বের অধিকাংশ প্লাস্টিকই পুনর্ব্যবহার করা কঠিন। তবে পলিউরেথেনকে সবচেয়ে কঠিন প্লাস্টিকগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়।

অন্য অনেক প্লাস্টিকের মতো এটিকে গলিয়ে নতুন করে তৈরি করা যায় না, কারণ এটি রাসায়নিকভাবে খুব সহজে ভাঙে না। ফলে এটি ময়লার ভাগাড় প্রায় অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে।

বর্তমানে আসবাবপত্র, জুতা, তাপ নিরোধক উপকরণ, কৃত্রিম চামড়া, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানার অসংখ্য পণ্যে পলিউরেথেন ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব পণ্যের বড় একটি অংশ পুনর্ব্যবহারের কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই।

অন্য প্লাস্টিক-ভাঙা জীবের তুলনায় এটি কেন আলাদা?

এ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এমন ৪৩৬টি ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলো প্লাস্টিক ভাঙতে সক্ষম। তবে এদের অধিকাংশই খুব ধীরগতিতে কাজ করে, নির্দিষ্ট পরিবেশের প্রয়োজন হয় অথবা কেবল বিশেষ ধরনের প্লাস্টিকের ওপর কার্যকর।

অন্যদিকে, অ্যাসপারজিলাস টিউবিনজেনসিস খুব দ্রুত পলিউরেথেন ভাঙতে পারে, যা অন্য অনেক প্লাস্টিক-ভাঙা ছত্রাকের তুলনায় একে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

শিল্প পর্যায়ে ব্যবহারেও রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ

যদিও এই ছত্রাক ঘিরে আশাবাদ তৈরি হয়েছে, তবুও শিল্প পর্যায়ে ব্যবহার সহজ নয়। তাপমাত্রা, পিএইচ (pH) ও পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে এর কার্যকারিতাও বদলে যায়।

বর্তমানে মাইকোরেমেডিয়েশন (Mycoremediation) নিয়ে কাজ করা গবেষকরা এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছেন। পরিবেশ দূষণ রোধ করতে ছত্রাক ব্যবহারের এই পদ্ধতিকে বিশ্বজুড়ে বর্জ্য শোধনাগার ও দূষিত ভূমি পরিষ্কারের কাজে ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে গবেষণা চলছে।

গবেষকদের আশা, এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারলে মানুষের তৈরি প্লাস্টিক বর্জ্য মোকাবিলায় প্রকৃতির এই অনন্য ছত্রাক ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: Green Living magazine

এসএএইচ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow