যশোরে বিএনপির ভরাডুবি, নেপথ্যে...

যশোরে প্রথমবারের মতো জামায়াত এককভাবে নির্বাচনে পাঁচটি আসন পেয়েছে। যশোরের ছয়টি আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৫টি আসন পেয়েছে। এ নিয়ে যশোরের বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। যশোরের ৬টি সংসদীয় আসনে ৭২ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট পড়েছে। জেলায় ২৪ লাখ ৭১ হাজার ৯০৫ জন ভোটারে মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১৭ লাখ ৫ হাজার ৭৮৭ জন। জেলার ৬টি আসনের মধ্যে যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে সবচেয়ে বেশি ৭৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে যশোর-৩ (সদর) আসনে ৬৪ শতাংশ।  এ ছাড়া যশোর-১ (শার্শা) আসনে তিন লাখ ৮ হাজার ৪১৭ ভোটারের মধ্যে ২ লাখ ১৯ হাজর ৫৮০ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এ আসনে ভোট পড়েছে ৭২ শতাংশ। যশোর-২ (ঝিকরগাছা- চৌগাছা) আসনে চার লাখ ৭৭ হাজার ৫৫৬ ভোটারের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন তিন লাখ ২৮ হাজার ৯ জন। এ আসনে ভোট পড়েছে ৬৯ শতাংশ। যশোর-৩ (সদর) আসনে ছয় লাখ ৬ হাজার ৬২৭ ভোটারের মধ্যে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৪৩৫ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ভোট পড়েছে ৬৪ শতাংশ। যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনে আসনে চার লাখ ৫৩ হাজার ৬২৬ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন তিন লাখ ১৭ হাজার ৩৩৮। ভোট পড়েছে ৭০ শতাংশ।  যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে তিন

যশোরে বিএনপির ভরাডুবি, নেপথ্যে...

যশোরে প্রথমবারের মতো জামায়াত এককভাবে নির্বাচনে পাঁচটি আসন পেয়েছে। যশোরের ছয়টি আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৫টি আসন পেয়েছে। এ নিয়ে যশোরের বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।

যশোরের ৬টি সংসদীয় আসনে ৭২ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট পড়েছে। জেলায় ২৪ লাখ ৭১ হাজার ৯০৫ জন ভোটারে মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১৭ লাখ ৫ হাজার ৭৮৭ জন। জেলার ৬টি আসনের মধ্যে যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে সবচেয়ে বেশি ৭৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে যশোর-৩ (সদর) আসনে ৬৪ শতাংশ। 

এ ছাড়া যশোর-১ (শার্শা) আসনে তিন লাখ ৮ হাজার ৪১৭ ভোটারের মধ্যে ২ লাখ ১৯ হাজর ৫৮০ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এ আসনে ভোট পড়েছে ৭২ শতাংশ।

যশোর-২ (ঝিকরগাছা- চৌগাছা) আসনে চার লাখ ৭৭ হাজার ৫৫৬ ভোটারের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন তিন লাখ ২৮ হাজার ৯ জন। এ আসনে ভোট পড়েছে ৬৯ শতাংশ। যশোর-৩ (সদর) আসনে ছয় লাখ ৬ হাজার ৬২৭ ভোটারের মধ্যে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৪৩৫ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। ভোট পড়েছে ৬৪ শতাংশ।

যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনে আসনে চার লাখ ৫৩ হাজার ৬২৬ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন তিন লাখ ১৭ হাজার ৩৩৮। ভোট পড়েছে ৭০ শতাংশ। 

যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে তিন লাখ ৬৯ হাজার ৭৮ ভোটারের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন দুই লাখ ৮১ হাজার ৫৬ জন। এ আসনে ৭৭ শতাংশ ভোট পড়েছে।

যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে দুই লাখ ২৬ হাজার ৪২৩ ভোটারের মধ্যে এক লাখ ৭৬ হাজার ৩৬৯ জন ভোট দিয়েছেন। যা ভোট প্রদানের হার ৭৮ শতাংশ।

ফলাফল ও হারে কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যশোর-১ (শার্শা) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা আজিজুর রহমান ২৫ হাজার ৫৫১ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। 

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দলীয় কোন্দল ও প্রার্থী পরিবর্তনের কারণে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী উপজেলার সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন পরাজিত হয়েছে। এ আসনে প্রথমে বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। প্রার্থী পরিবর্তনের দাবির মুখে নুরুজ্জামান লিটনকে নতুন প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। পরে মফিকুল হাসান তৃপ্তি ও হাসান জহিরের সমর্থকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। যার প্রভাব পড়েছে ভোটের বাক্সে।

যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। ৩৪ হাজার ৫১৮ ভোটে পরাজিত হয়েছেন বিএনপির সাবিরা সুলতানা মুন্নী। 

মনোনয়ন বঞ্চিতের বিরোধিতা, দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পার্টি অফিস দখল, সাংগঠনিক দুর্বলতা কারণে সাবিরা সুলতানা মুন্নীর পক্ষে জোরেশোরে মাঠে ছিলেন না দলের বড় অংশ। সাবিরা সুলতানাকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও সেটি বাতিলের দাবিতে বঞ্চিতদের রাজপথে আন্দোলন সাধারণ ভোটারদের মাঝে নেতিবাচক বার্তা গিয়েছে বলেও মনে করেন অনেকে।

যশোর-৪ আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক মো. গোলাম রছুল। তিনি ৪৪ হাজার ৯৯৫ ভোটে বিএনপি প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফারাজীকে পরাজিত করেন। এ আসনে প্রথম ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুবকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঋণখেলাপির দায়ে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাহার করা হয়। এরপর বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মতিয়ার রহমান ফারাজী মনোনয়ন পান। নেতাদের অসহযোগিতার কারণে ফারাজী নিজের কেন্দ্রেই বিজয় নিশ্চিত করতে পারেননি।

যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক (দাঁড়িপাল্লা প্রতীক) নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ৪৭ হাজার ৮৩১ ভোটে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শহীদ ইকবালকে পরাজিত করেন। 

প্রথমে শহীদ ইকবালকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও পরে প্রার্থী পরবির্তন করে জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের রশীদ আহমাদকে ধানের শীষের চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়। এটি মেনে না নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ ইকবাল।

যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মোক্তার আলী বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ১২ হাজার ৯৩ ভোটে বিএনপির আবুল হোসেন আজাদকে পরাজিত করেন। 

এ আসনে প্রথমে মনোনয়ন দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির ত্যাজ্যপুত্র হওয়ায় তাকে ঘিরে ভিন্ন মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২৪ ডিসেম্বর হঠাৎ শ্রাবণকে বাদ দিয়ে আবুল হোসেন আজাদকে প্রার্থী করা হয়। শ্রাবণ দলের পক্ষে মাঠে থাকলেও আওয়ামী ভোটের সমীকরণ আর কাজে আসেনি। 

অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী মুক্তার আলী একজন কলেজশিক্ষক এবং এলাকায় তার স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রয়েছে। গত ১৭ বছর তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে এলাকায় কাজ করেছেন, যা তাকে বিজয়ী হতে সহায়তা করেছে।

বিএনপির একাধিক নেতা ও তৃণমূলের কর্মীরা জানান, সাবেক তথ্যমন্ত্রী মরহুম তরিকুল ইসলামের মতো বড় মাপের কোনো নেতা যশোর জেলায় নেই। ফলে সমন্বয় করে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সক্ষমতা ও সাংগঠনিক সমর্থন না থাকায় দিশাহীন বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনৈক্যের কারণে দল অনেকটা ছন্নছাড়া অবস্থায় আছে। এতে জেলা বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটি নড়েবড়ে অবস্থায়। এ ছাড়া নেতাদের মধ্যে দলীয় কোন্দল ভরাডুবিতে ভূমিকা রেখেছে। 

অন্যদিকে, ৫ আগস্টের পর বিএনপির প্রতি ভোটারদের অনুভূতি ছিল অনেক বেশি ইতিবাচক। কিন্তু দিন যতই গড়াতে থাকে, বিএনপির নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া কিছু বিতর্কিত নেতাকর্মীর বিব্রতকর কর্মকাণ্ডে যশোর বিএনপির এ বড় পরাজয়।

যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, আমাদের কোথায় কোন ধরনের ভুল হয়েছে; সেই বিষয়ে আমরা দ্রুত নোট করে দলকে সংগঠিত করার জন্য জেলা বিএনপি দ্রুত কাজ শুরু করব।

বিএনপির খুলনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোর-৩ (সদর) আসন থেকে বিজয়ী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিএনপির এই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ খোঁজার চেষ্টা করছি। আগামী দিনে হারানো জমিন ফিরে পেতে আমাদের অনুসন্ধান করতেই হবে। আমরা ইতোমধ্যে দলীয় বিভিন্ন ইউনিটে আলোচনা করেছি। কী কী কারণে এমন পরাজয় ঘটল, সেগুলো খোঁজার চেষ্টা করছি। ভিন্ন ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়ার পর প্রার্থী পরিবর্তন, মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের নির্বাচনী মাঠে ঠিকমতো নামাতে না পারা, নির্বাচনে জামায়াতের ধর্মীয় প্রচারের কৌশল প্রতিহত করতে না পারা ইত্যাদি উঠে এসেছে। তবে আমরা বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow