যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ অর্থনীতিবিদদের
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, বিএনপির বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকার, সামাজিক সুরক্ষা, কর আদায় ও সুশাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও নীতিকে নতুন করে পুনর্গঠন করতে হবে এশিয়াকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে। বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাতে ‘বিএনপি সরকারের ১০০ দিন’ শীর্ষক এক ওয়েবিনার আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠান আয়োজন করে সমাজ গবেষণা কেন্দ্র। ওয়েবিনারে অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রমুখ। ওয়েবিনারটি সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে জাগো নিউজের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউবে চ্যানেলে। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। আলোচনায় অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, বাংলাদে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, বিএনপির বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকার, সামাজিক সুরক্ষা, কর আদায় ও সুশাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও নীতিকে নতুন করে পুনর্গঠন করতে হবে এশিয়াকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাতে ‘বিএনপি সরকারের ১০০ দিন’ শীর্ষক এক ওয়েবিনার আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠান আয়োজন করে সমাজ গবেষণা কেন্দ্র।
ওয়েবিনারে অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রমুখ।
ওয়েবিনারটি সরাসরি সম্প্রচার হয়েছে জাগো নিউজের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউবে চ্যানেলে। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।
আলোচনায় অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য নীতিতে একটি ‘কাঠামোগত বিভ্রান্তি’ রয়েছে। আমরা এই ধারণায় আচ্ছন্ন যে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। কিন্তু এটি মাত্র ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের বাজার। আমাদের প্রকৃত বৃহত্তম বাজার হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রধান বাজার হওয়া সত্ত্বেও সেখান থেকে পণ্য না কিনে মার্কিন বিমান কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দেওয়া সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না। এ ধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে প্রতিবাদও এসেছে।
রেহমান সোবহান আরও বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এখন এশিয়ায়, বিশেষ করে পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায়। তাই বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকারও এই অঞ্চলভিত্তিক হওয়া উচিত।
সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, বড় আকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিতে হলে তা একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। ফ্যামিলি কার্ড ও অন্যান্য কর্মসূচিকে একীভূত করে একটি বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অনুপাত দ্বিগুণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বলেন, বর্তমান ৮ শতাংশ কর আদায়ের হার বড় ধরনের বাজেট চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। উচ্চ আয়ের স্তর থেকে যথাযথ কর আদায় না হওয়াকে তিনি বৈষম্যের অন্যতম উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ঋণ খেলাপি সংকট শুধু ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেই দুর্বল করেনি, বরং এটি আয় বৈষম্য বাড়ানোর বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ একটি সংকীর্ণ অভিজাত শ্রেণির হাতে চলে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়েও কথা বলেন রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ শুরুতে মধ্যপন্থি সামাজিক গণতান্ত্রিক অবস্থানে থাকলেও পরে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমে’ জড়িয়ে পড়ে। একইভাবে বিএনপির নেতৃত্বের সামাজিক পটভূমিও কর আদায় ও ঋণ খেলাপি ইস্যুতে তাদের অবস্থানকে প্রভাবিত করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মূল প্রবন্ধে নজরুল ইসলাম বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিএনপি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে বিএনপির প্রতিশ্রুতি থাকলেও তারা কতটা তা বাস্তবায়ন করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তিনি বলেন, কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে সংসদের উচ্চকক্ষ কীভাবে গঠিত হবে এবং তার এখতিয়ার কী হবে—এসব বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
বৈষম্য হ্রাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপির প্রতিশ্রুতিতে সামগ্রিক বৈষম্য কমানোর স্পষ্ট লক্ষ্য নেই। তবে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি প্রাথমিক আয় বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মজুরিকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয়ের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সরকার গ্রাম সরকার ও গ্রাম সংস্কারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও তা বাস্তবায়নের রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়। সবার জন্য সামরিক শিক্ষার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে সামাজিক সংহতি ও কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারের কিছু পদক্ষেপ আশাব্যঞ্জক। খাল খনন, গাছ রোপণ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগে জনবান্ধব হওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে একজন ব্যবসায়ীকে নিয়োগ, পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা প্রকল্পে আলোচনা ছাড়াই অগ্রসর হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়গুলো উদ্বেগ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে এসআরও সংস্কৃতির মাধ্যমে পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতি তৈরি হয়েছিল। এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক পরিকল্পনা, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগবান্ধব নীতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে শুধু আমদানিনির্ভর না থেকে দেশে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে এবং গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি অবকাঠামো সংস্কার প্রয়োজন।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান কাঠামোগত সমস্যার সমাধানে কার্যকর সংস্কারের বিকল্প নেই। ব্যাংক ও কর খাতে সমন্বিত সংস্কার না হলে বাংলাদেশ রাজনৈতিক অর্থনীতির ‘অন্ধগলি’ থেকে বের হতে পারবে না।
তিনি বলেন, কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া অসমতা কমানো, অর্থনীতিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা এবং বহুমুখীকরণের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।
সরকারের বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডসহ কিছু উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং সেগুলোর সফলতা কাম্য। তবে এসব উদ্যোগের অর্থায়ন কতটা টেকসই হবে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
এসএম/এমকেআর
What's Your Reaction?