যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ : সমঝোতার পথ কতটা বাস্তব?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৫ দফার একটি পরিকল্পনা দিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রস্তাবটি পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে পাঠিয়েছে। ইসলামাবাদ শান্তি আলোচনার আয়োজন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে ইরান শুরু থেকেই বলছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসেনি। দেশটির নেতারা দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজের সঙ্গেই আলোচনা করছে। কী আছে মার্কিন ১৫ দফা পরিকল্পনায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় রয়েছে : ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বাড়ানো ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন বন্ধ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে ‍যুক্তরাষ্ট্র এছাড়া ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সহায়তার প্রস্তাবও রয়েছে। ইরানের শর্ত

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ : সমঝোতার পথ কতটা বাস্তব?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৫ দফার একটি পরিকল্পনা দিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রস্তাবটি পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে পাঠিয়েছে। ইসলামাবাদ শান্তি আলোচনার আয়োজন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

তবে ইরান শুরু থেকেই বলছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসেনি। দেশটির নেতারা দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজের সঙ্গেই আলোচনা করছে।

কী আছে মার্কিন ১৫ দফা পরিকল্পনায়

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় রয়েছে :

  • ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি
  • ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলা
  • ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা
  • আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বাড়ানো
  • ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা
  • আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন বন্ধ
  • হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা
  • বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে ‍যুক্তরাষ্ট্র
  • এছাড়া ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সহায়তার প্রস্তাবও রয়েছে।

ইরানের শর্ত কী

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুদ্ধ শেষ করতে হলে ইরানের ন্যায্য অধিকার স্বীকার করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে হামলা না হওয়ার আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা চেয়েছে তেহরান।

ইরানের পক্ষ থেকে আরও দাবি এসেছে :

  • সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
  • অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ
  • হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা নিশ্চিত করা

আলোচনা কি সম্ভব?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ইরানেই প্রায় ১,৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে সরকারি হিসাব।

হরমুজ প্রণালি আংশিক বন্ধ হওয়ায় তেলের দাম বেড়ে ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এর প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারে, শেয়ারবাজারেও দেখা দেয় অস্থিরতা।

বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে। তবে যুদ্ধের ব্যয় ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ায় আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমিত পর্যায়ে যোগাযোগ শুরু হলেও পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হবে। কারণ, নিরাপত্তা, পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব, এই তিন ইস্যুতে দুই পক্ষের অবস্থান একেবারেই বিপরীত।

আলজাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অনিশ্চিত সত্ত্বেও চলমান সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনা নিয়ে নতুন করে জোরালো আশা দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখনো পূর্ণাঙ্গ সংলাপ না হলেও সীমিত পর্যায়ে যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

মার্কিন গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনা না হলেও যোগাযোগ বা প্রাথমিক পর্যায়ের আলাপ চলছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, সংঘাত শেষ করতে ইরান টেকসই কোনো প্রস্তাব শুনতে প্রস্তুত রয়েছে।

ওই সূত্রের দাবি, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, এমন নিশ্চয়তা দিতে রাজি। তবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার তারা বজায় রাখতে চায়। একই সঙ্গে তেহরানের প্রধান শর্ত হিসেবে রয়েছে, সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। এর প্রভাবে দেশটির অর্থনীতি, তেল রপ্তানি ও বিমান খাত দীর্ঘদিন ধরে চাপের মুখে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দুই পক্ষকেই আলোচনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ থামানোর চাপ বাড়ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা, সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, ইরানও সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের ভূখণ্ডে হামলা বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে, যা কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে।

মধ্যস্থতায় এগিয়ে এসেছে কয়েকটি দেশ। মিশর, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ইতোমধ্যে যোগাযোগের পথ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।

তবে আলোচনার সম্ভাবনা থাকলেও সফলতা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। ইরানি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ নাদের হাবিবি মনে করেন, আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা সফল হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র একটি স্বল্পমেয়াদী যুদ্ধের প্রত্যাশা করছিল, যার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে। এখন তারা তাদের প্রত্যাশা পুনর্বিবেচনা করছে এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের উচ্চ মূল্য সম্পর্কে সচেতন। তারা ভালোভাবেই বুঝেছে, যুদ্ধে ইরান ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণেও বলা হচ্ছে, শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দ্রুত যুদ্ধ শেষের আশা করলেও বাস্তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি স্পষ্ট হচ্ছে। একইভাবে ইরানও পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা দেখিয়েছে। আর ইরানের এই সক্ষমতাই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের প্রশ্নটিও গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সমঝোতা হবে কি না, তা নির্ভর করছে দুই পক্ষ কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত তার ওপর।

আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার ‘US-Iran mediation: What are each side’s demands – and is a deal possible?’ থেকে সংক্ষেপিত।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow