যৌবন হারিয়েছে আগেই, এখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা আলাই নদীর

গাইবান্ধা জেলার সদর, সাঘাটা ও ফলুছড়ি উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে আলাই নদী। একসময় এ অঞ্চলের প্রাণরেখা ও বাণিজ্যপথের একটি মাধ্যম ছিল নদীটি। কিন্তু দখল, ভরাট ও দূষণে অনেক আগেই যৌবন হারিয়েছে আলাই। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দখল-দূষণ বাড়ায় মারাত্মক হুমকিতে নাব্যতা হারিয়ে এখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা আলাই নদীর। জেলার শহরের ডেভিট কোম্পানি পাড়া হয়ে পুলবন্দি ও লোহাচোরা ব্রিজ এলাকা অতিক্রম করে ফুলছড়ি উপজেলা দিয়ে প্রবেশ করেছে আলাই নদী। প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া এলাকায় নদীটি দুই ভাগে বিভক্ত। এরপর প্রায় ২২ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে আলাই নদী ফুলছড়ি উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিলিত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, নদীর দুই তীর দখল করে গড়ে উঠেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি। সদর উপজেলার বাদিয়াখালী ইউনিয়নে নদীর প্রবাহ প্রশস্ত ও পানি চলাচল বাড়াতে একটি সেতু নির্মাণ করা হলেও তা কার্যত শুধু যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। নদীর দুই পাড় মাটি দিয়ে ভরাট করায় স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এছাড়া সেতুর দুই পাশে বাজারকেন্দ্রিক দোকানপাট গড়ে উঠছে। সরেজমিনে দেখা যায়, নদীতীরে শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসি

যৌবন হারিয়েছে আগেই, এখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা আলাই নদীর

গাইবান্ধা জেলার সদর, সাঘাটা ও ফলুছড়ি উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে আলাই নদী। একসময় এ অঞ্চলের প্রাণরেখা ও বাণিজ্যপথের একটি মাধ্যম ছিল নদীটি। কিন্তু দখল, ভরাট ও দূষণে অনেক আগেই যৌবন হারিয়েছে আলাই। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দখল-দূষণ বাড়ায় মারাত্মক হুমকিতে নাব্যতা হারিয়ে এখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা আলাই নদীর।

জেলার শহরের ডেভিট কোম্পানি পাড়া হয়ে পুলবন্দি ও লোহাচোরা ব্রিজ এলাকা অতিক্রম করে ফুলছড়ি উপজেলা দিয়ে প্রবেশ করেছে আলাই নদী। প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া এলাকায় নদীটি দুই ভাগে বিভক্ত। এরপর প্রায় ২২ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে আলাই নদী ফুলছড়ি উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিলিত হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, নদীর দুই তীর দখল করে গড়ে উঠেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি। সদর উপজেলার বাদিয়াখালী ইউনিয়নে নদীর প্রবাহ প্রশস্ত ও পানি চলাচল বাড়াতে একটি সেতু নির্মাণ করা হলেও তা কার্যত শুধু যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। নদীর দুই পাড় মাটি দিয়ে ভরাট করায় স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এছাড়া সেতুর দুই পাশে বাজারকেন্দ্রিক দোকানপাট গড়ে উঠছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নদীতীরে শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে। নদীর কোথাও কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও কিছুটা গভীরতা দেখা যায়। নদী ও আশপাশের এলাকায় স্থানে স্থানে আগাছা ও কচুরিপানা জন্মেছে। সেতুর পশ্চিম পাশে ব্যক্তি মালিকানাধীন বাড়ি, চাতাল ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠছে। সেতুর দক্ষিণ ও উত্তর পাশে মাংসের দোকান রয়েছে। এসব দোকান থেকে মুরগি ও গরুর রক্ত, উচ্ছিষ্ট নাড়িভুঁড়ি, হাড়, বাজারের পলিথিনসহ নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা সেতুর ওপর দিয়ে নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে পানির রং কালো হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এছাড়া সেতুর দুই পাশে পলিথিন, ডিমের খোসা, পচা মুরগির নাড়িভুঁড়িসহ বিভিন্ন ধরনের আবর্জনার স্তূপ জমে রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, এক সময় এই নদীর পাশে বড় বাজার ছিল। সে সময়ে নৌকা করে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন এসে মালামাল ক্রয়-বিক্রয় করতো। নদীতে সারা বছর পানি থাকতো। সেই পানি দিয়ে কৃষকরা জমি চাষাবাদ করতো। কিন্তু ধরে ধীরে নদীটি দখল-দূষণের বর্তমানে মরা খালে পরিণেত হয়েছে।

‘বাবার আমল থেকে এই সম্পত্তিগুলো ভোগ করছি আমরা। আমাদের নামে কাগজপত্র আছে। আর নদী ভাঙনের ফলে আমার স্থাপনা নদীর কাছে চলে এসেছে। তাই সবাই মনে করে নদীর ভরাট করে এসব স্থাপনা করা’

তাদের অভিযোগ, গত ১৫ বছরের অনেকেই ক্ষমতার শক্তি দেখিয়ে অনেক জায়গা দখল করে বাড়ি-ঘর দোকানপাট স্থাপনা তৈরি করছেন। আলাই নদী একবারও দখলদারদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছাড়া সংস্কার ও খনন করা হয়নি। বছরের পর বছর দখল আর ময়লা আবজর্নার স্তূপে নদীটি ভরাট হয়ে গেছে। বর্ষায় উজান থেকে ঢল নামলে নদীটি পানি ধারণ করতে পারে না। এতে ডুবে যায় আশপাশ এলাকা।

যৌবন হারিয়েছে আগেই, এখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা আলাই নদীর

নদী ভরাট করে বাউন্ডারি দেওয়া হচ্ছে/ ছবি: জাগো নিউজ

বাদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মোক্তাদির মুক্তি ও সাধারণ সম্পাদক মাসুদ করিম বাড়ি ও ধানের চাতাল এবং দোকাপাট তুলে নদীর জায়গা দখল করেছে বলে অভিযোগও উঠেছে।

এ বিষয়ে গোলাম মোক্তাদির মুক্তি বলেন, বাবার আমল থেকে এই সম্পত্তিগুলো ভোগ করছি আমরা। আমাদের নামে কাগজপত্র আছে। আর নদী ভাঙনের ফলে আমার স্থাপনা নদীর কাছে চলে এসেছে। তাই সবাই মনে করে নদীর ভরাট করে এসব স্থাপনা করা।

স্থানীয় বাসিন্দা খালিক হাসান বলেন, নদীর জায়গা দখল করতে নালায় পরিণত হয়েছে। এসব দখল উচ্ছেদ করে নদী খননের জোর দাবি জানাই।

‘নানান জটিলতায় দখল বন্ধ করা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে খননব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তালিকা পাঠানো হয়েছে। অুনমোদন পেলে নদী রক্ষায় প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে’

স্থানীয় বাসিন্দা মো. সুমন ইসলাম শুভ বলেন, আগে বন্ধুদের সঙ্গে এ নদীতে সাঁতার কাটতাম। তখন নদীতে প্রচুর পানি আর স্রোত ছিল। এখন নদীর পাশে দাঁড়ানোই কঠিন হয়ে গেছে দুর্গন্ধের কারণে। আগের সেই আলাই নদী এখন আর নেই।

বাদিয়াখালি বাজারের ব্যবসায়ী মো. গোলাম রহমান সুমন বলেন, ছোট সময়ে নদীর স্রোত দেখে ভয় পেতাম। তখন বড় নৌকা চলতো। এখন নদী ভরাট হয়ে নালায় পরিণত হয়েছে। নদীর অবস্থা দেখে খুব কষ্ট হয়। নদীটির জায়গা দ্রুত দখলমুক্ত করে খননের দাবি জানান।

যৌবন হারিয়েছে আগেই, এখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা আলাই নদীর

নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে দোকানপাট/ ছবি: জাগো নিউজ

স্থানীয় মতিয়ার রহমান নদীর ভরাট অংশে আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, নদীতে পানি না থাকায় ৭ থেকে ৮ বছর ধরে ধান আবাদ করছি। এটি খনন করে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করলে স্থানীয়দের উপকার হতো।

বাদিয়াখালী ইউনিয়নের সদস্য নুর আলম বলেন, নাব্য সংকটে আলাই নদীতে পানি নেই। নদীটি খনন করে নাব্য ফেরাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।

গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর কবীর তনু বলেন, নদীশাসন না হলে একসময় হয়তো নদীটি মানচিত্র থেকে মুছে যাবে। তাই অস্তিত্ব রক্ষায় এটি খনন ও সংস্কার করা জরুরি।

‘আগে বন্ধুদের সঙ্গে এ নদীতে সাঁতার কাটতাম। তখন নদীতে প্রচুর পানি আর স্রোত ছিল। এখন নদীর পাশে দাঁড়ানোই কঠিন হয়ে গেছে দুর্গন্ধের কারণে। আগের সেই আলাই নদী এখন আর নেই’

বিশেষজ্ঞদের মতে, আলাই শুধু একটি নদী নয়, এটি ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর উৎস। ফলে আলাই নদীটি মারা গেলে এ অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।

যৌবন হারিয়েছে আগেই, এখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা আলাই নদীর

গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. লোকমান হোসেন বলেন, মাত্র দুই মাস আগে এখানে জয়েন করছি। কেউ আমাকে এ বিষয়ে অভিযোগ করেনি। আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানলাম। খোঁজখবর নিয়ে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মো. মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, আলাই নদী দখল করে বাসা- বাড়ি দোকানপাট নির্মাণের বিষয়টি আমার জানা নেই। দখল তো সহজেই উচ্ছেদ করা যায় না। আইনগত প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, নানান জটিলতায় দখল বন্ধ করা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে খননব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তালিকা পাঠানো হয়েছে। অুনমোদন পেলে নদী রক্ষায় প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এএনএইচএস/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow