রন্ধনশালা থেকে রাজশাসন: অদম্য সুমীর আকাশছোঁয়া স্বপ্নজয়ের গল্প

ভোরবেলা উনুনের ধোঁয়া আর মেয়ের কান্নায় দিন শুরু হয় তাঁর। দুপুরের তপ্ত রোদে কলেজে ক্লাস নেওয়া, বিকেলে বাজার-ঘাট আর রান্নাবান্না। এরপর যখন নিঝুম রাত নামে, গোটা শহর যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন এক লড়াকু মা বসেন বইয়ের টেবিলে। সংসার, মাতৃত্ব আর পেশার ত্রিমুখী চাপকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এভাবেই নিজের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন গাজীপুরের কালীগঞ্জের মেয়ে সুমী আক্তার। অদম্য এই তরুণী ৪৪তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে ৪৩তম মেধাতালিকায় উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সরকারি গেজেটে তাঁর এই সাফল্যের চূড়ান্ত স্বীকৃতি মিলেছে। তবে সুমীর এই পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। গাজীপুরের প্রত্যন্ত বক্তারপুর গ্রামের মেয়ে সুমী আক্তারের শিক্ষাজীবন ছিল ঈর্ষণীয়। কালীগঞ্জের সেন্ট মেরীস গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ এবং উত্তরার হলি চাইল্ড কলেজ থেকে এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে তিনি মেধার স্বাক্ষর রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘ডিনস অ্যাওয়ার্ড’। এরপর ৪১তম বিসিএসে শিক্ষা

রন্ধনশালা থেকে রাজশাসন: অদম্য সুমীর আকাশছোঁয়া স্বপ্নজয়ের গল্প

ভোরবেলা উনুনের ধোঁয়া আর মেয়ের কান্নায় দিন শুরু হয় তাঁর। দুপুরের তপ্ত রোদে কলেজে ক্লাস নেওয়া, বিকেলে বাজার-ঘাট আর রান্নাবান্না। এরপর যখন নিঝুম রাত নামে, গোটা শহর যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন এক লড়াকু মা বসেন বইয়ের টেবিলে। সংসার, মাতৃত্ব আর পেশার ত্রিমুখী চাপকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এভাবেই নিজের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন গাজীপুরের কালীগঞ্জের মেয়ে সুমী আক্তার।

অদম্য এই তরুণী ৪৪তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে ৪৩তম মেধাতালিকায় উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সরকারি গেজেটে তাঁর এই সাফল্যের চূড়ান্ত স্বীকৃতি মিলেছে। তবে সুমীর এই পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না।

গাজীপুরের প্রত্যন্ত বক্তারপুর গ্রামের মেয়ে সুমী আক্তারের শিক্ষাজীবন ছিল ঈর্ষণীয়। কালীগঞ্জের সেন্ট মেরীস গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ এবং উত্তরার হলি চাইল্ড কলেজ থেকে এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে তিনি মেধার স্বাক্ষর রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে লাভ করেন মর্যাদাপূর্ণ ‘ডিনস অ্যাওয়ার্ড’। এরপর ৪১তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সারা দেশে তৃতীয় স্থান অর্জন করে শরীয়তপুরের সরকারি গোলাম হায়দার খান মহিলা কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল আরও উঁচুতে—প্রশাসন ক্যাডারে কাজ করে সরাসরি মানুষের সেবা করা।

৪৪তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি থেকে ভাইভা—পুরো যাত্রায় সুমী ছিলেন একজন মা এবং স্ত্রী। স্বামী মোহাম্মদ ছাত্তার মোল্লা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। আড়াই বছরের ছোট্ট কন্যাসন্তান রুমাইসা নূর ফিওনাকে সামলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছিল হিমালয় জয়ের মতো কঠিন। সুমী বলেন, "এক সময় মনে হয়েছিল আর পারব না। মাতৃত্বের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পড়াশোনা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার স্বামীই ছিলেন সেই মানুষ, যিনি আমাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছেন।"

সামাজিক মাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সুমী লিখেছেন, "বাজারের ফর্দ আনতে ভুলে গেলেও আমার পড়াশোনার কোনো বই বা প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে ভুলতেন না আমার স্বামী।" গভীর রাতে মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে যখন সুমী পড়তে বসতেন, পাশে থেকে সাহস জোগাতেন তাঁর প্রিয়জনরা। মা-বাবা এবং শাশুড়ির সহযোগিতা সুমীর এই দুর্গম পথকে সহজ করে দিয়েছিল।

কালীগঞ্জ উপজেলা থেকে ৪৪তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া একমাত্র ব্যক্তি সুমী। তাঁর এই সাফল্যে এখন আনন্দিত গোটা এলাকা। স্থানীয় শিক্ষাবিদদের মতে, সুমীর এই গল্প প্রমাণ করে যে—পরিবারের সমর্থন আর নিজের ইচ্ছাশক্তি থাকলে গ্রামীণ পটভূমি থেকেও দেশের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।

চাকরিতে থেকেও হাল না ছাড়া এবং সাধারণ এক গৃহবধূর জীবন থেকে ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে ওঠার এই রূপকথা এখন শুধু সুমীর নয়; বরং বাংলাদেশের হাজার হাজার সংগ্রামী নারীর। সুমী আক্তার এখন কেবল একটি নাম নয়, একটি অনুপ্রেরণার নাম।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow