রমজান, প্যানিক বায়িং আর ‘সোনার’ লেবু

রমজান মানেই ইফতারের টেবিলে এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত। কিন্তু এবার সেই শরবত যেন সাধারণ মানুষের জন্য বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। রমজানের প্রথম দিন থেকেই রাজধানীর বাজারে লেবুর দাম আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে যে লেবু ২০-৩০ টাকা হালি দরে পাওয়া যেত, তা বর্তমানে প্রকারভেদে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, এমনকি কোথাও কোথাও প্রতি হালি ২০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। মাঝারি মানের লেবু বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকায়, আর ভালো মানের বড় লেবু ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত উঠছে। ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, এটি লেবুর ভরা মৌসুম না হওয়ায় সরবরাহ কম। খরা ও সেচ সংকটের কারণে ফলন কমে যাওয়ার প্রভাব বাজারে পড়েছে। অনেক জায়গায় প্রশাসনের অভিযানের পর দাম নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। যেমন—সুনামগঞ্জে ডিসির তদারকিতে ১২০ টাকার লেবু ৪০ টাকায় নেমে আসে। উৎপাদন ঘাটতিকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হলেও, ভোক্তাদের অভিযোগ—রমজান এলেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। অথচ কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে তারা রমজান উপলক্ষে লেবুর দাম ২ টাকা কমিয়ে বিক্রি করবেন। রমজানে সংযম ও সহমর্মি

রমজান, প্যানিক বায়িং আর ‘সোনার’ লেবু

রমজান মানেই ইফতারের টেবিলে এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত। কিন্তু এবার সেই শরবত যেন সাধারণ মানুষের জন্য বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। রমজানের প্রথম দিন থেকেই রাজধানীর বাজারে লেবুর দাম আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে যে লেবু ২০-৩০ টাকা হালি দরে পাওয়া যেত, তা বর্তমানে প্রকারভেদে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, এমনকি কোথাও কোথাও প্রতি হালি ২০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

মাঝারি মানের লেবু বিক্রি হচ্ছে ১০০-১২০ টাকায়, আর ভালো মানের বড় লেবু ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত উঠছে। ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, এটি লেবুর ভরা মৌসুম না হওয়ায় সরবরাহ কম। খরা ও সেচ সংকটের কারণে ফলন কমে যাওয়ার প্রভাব বাজারে পড়েছে। অনেক জায়গায় প্রশাসনের অভিযানের পর দাম নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। যেমন—সুনামগঞ্জে ডিসির তদারকিতে ১২০ টাকার লেবু ৪০ টাকায় নেমে আসে।

উৎপাদন ঘাটতিকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হলেও, ভোক্তাদের অভিযোগ—রমজান এলেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। অথচ কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে তারা রমজান উপলক্ষে লেবুর দাম ২ টাকা কমিয়ে বিক্রি করবেন।

রমজানে সংযম ও সহমর্মিতার শিক্ষা থাকলেও বাজারের চিত্র প্রায়ই উল্টো হয়। সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিত্যপণ্য রাখতে কঠোর বাজার মনিটরিং এবং সঠিক সরবরাহ চেইন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

দুই.

রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে কেবল একটি কারণ নয়, বরং বেশ কিছু অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত বিষয় কাজ করে।

অতিরিক্ত চাহিদা: রমজানে ছোলা, চিনি, তেল, খেজুর এবং বেগুনের মতো নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিপুল এই চাহিদার চাপে অনেক সময় সরবরাহ ব্যবস্থা ভারসাম্য হারায়।

অসাধু সিন্ডিকেট ও মজুতদারি: এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার আশায় পণ্য মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। পর্যাপ্ত আমদানি ও স্টক থাকা সত্ত্বেও সিন্ডিকেটের কারণে খুচরা পর্যায়ে দাম বেড়ে যায়।

সরবরাহ চেইনে বাধা: বন্দর জট, পরিবহনে চাঁদাবাজি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে পৌঁছাতে পণ্যের দাম অনেকটা বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে দেরি হওয়াকেও দাম বাড়ার একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভোক্তাদের আচরণ: অনেক ক্রেতা রমজানের শুরুতেই পুরো মাসের বাজার একসাথে করার চেষ্টা করেন। এই ‘প্যানিক বায়িং’ বা হুজুগে কেনাকাটার ফলে বাজারে হঠাৎ পণ্যের টান পড়ে এবং বিক্রেতারা দাম বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পায়।

বাজার মনিটরিংয়ের অভাব: প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার তদারকির কথা বলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয় না। দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগে খুচরা বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দামে পণ্য বিক্রি করেন।

বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রভাব: আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াও পরোক্ষভাবে পণ্যের মূল্যে প্রভাব ফেলে।

রমজান শুরুর কয়েকদিন আগে থেকেই ক্রেতাদের মধ্যে একটি ভয় কাজ করে— ‘পরে পাব তো?’ বা ‘দাম আরও বেড়ে যাবে না তো?’ এই অনিশ্চয়তা থেকে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পণ্য মজুত করতে শুরু করে। যখন সবাই একসাথে বিপুল পরিমাণ পণ্য কেনে, তখন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং বিক্রেতারা দাম বাড়ানোর অজুহাত পায়। অনেক সময় সামর্থ্যবান ক্রেতারা বাজারের চড়া দাম নিয়ে মাথা ঘামান না। তারা ব্যাগ ভরে দামি জিনিস কেনাকে এক ধরনের সামাজিক স্বস্তি বা সক্ষমতা হিসেবে দেখেন। ফলে বাজারে একটি ভুল সংকেত যায় যে, উচ্চমূল্যেও পণ্যের চাহিদা কমছে না। তখনই লেবুর দাম আকাশচুম্বী হয়।

তবে আশার কথা হলো, রমজানের প্রথম সপ্তাহের চাপ কাটিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে অনেক পণ্যের দাম কিছুটা কমে আসে। যেমন—সম্প্রতি কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা রমজান উপলক্ষে কিছু পণ্যের দাম কমিয়ে বিক্রির ঘোষণা দিয়েছেন।

তিন.

রমজানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে ক্রেতাদের সাইকোলজি বা মনস্তাত্ত্বিক আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থনীতিতে একে অনেক সময় ‘বিহেভিয়ারাল ইকোনমিক্স’ বলা হয়।

ক্রেতাদের মনস্তাত্ত্বিক যেসব বিষয় বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে, সেগুলো হলো-

‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত কেনাকাটা

রমজান শুরুর কয়েকদিন আগে থেকেই ক্রেতাদের মধ্যে একটি ভয় কাজ করে— ‘পরে পাব তো?’ বা ‘দাম আরও বেড়ে যাবে না তো?’ এই অনিশ্চয়তা থেকে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পণ্য মজুত করতে শুরু করে। যখন সবাই একসাথে বিপুল পরিমাণ পণ্য কেনে, তখন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং বিক্রেতারা দাম বাড়ানোর অজুহাত পায়।

উৎসবকেন্দ্রিক আবেগ ও নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাস

আমাদের মনস্তত্ত্বে রমজান মানেই নির্দিষ্ট কিছু খাবার (যেমন: ইফতারে বেগুনি, পিঁয়াজু বা লেবুর শরবত)। আমরা মানসিকভাবে সেট করে নিয়েছি যে, এগুলো ছাড়া ইফতার অসম্পূর্ণ। এই ‘ইনফ্লেক্সিবল ডিমান্ড’ বা অনমনীয় চাহিদার সুযোগ নেন ব্যবসায়ীরা। ক্রেতারা দাম বাড়ালেও ওই নির্দিষ্ট পণ্যটি কেনা বন্ধ করেন না, যা বিক্রেতাকে উচ্চমূল্য ধরে রাখতে উৎসাহিত করে।

বাজেটের মানসিক প্রস্তুতি

অনেক ক্রেতা আগে থেকেই ধরে নেন যে, ‘রমজান এলে তো দাম বাড়বেই।’ এই মানসিক গ্রহণযোগ্যতা ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধা তৈরি করে। ক্রেতা যখন মানসিকভাবে বাড়তি দাম দিতে প্রস্তুত থাকে, তখন সে প্রতিবাদ বা বিকল্প খোঁজার বদলে বাড়তি দামেই পণ্যটি কিনে নেয়।

সামাজিক মর্যাদা বা স্ট্যাটাস

অনেক সময় সামর্থ্যবান ক্রেতারা বাজারের চড়া দাম নিয়ে মাথা ঘামান না। তারা ব্যাগ ভরে দামি জিনিস কেনাকে এক ধরনের সামাজিক স্বস্তি বা সক্ষমতা হিসেবে দেখেন। ফলে বাজারে একটি ভুল সংকেত যায় যে, উচ্চমূল্যেও পণ্যের চাহিদা কমছে না। তখনই লেবুর দাম আকাশচুম্বী হয়।

গুজবে বিশ্বাস করার প্রবণতা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা লোকমুখে কোনো পণ্যের সংকট নিয়ে গুজব ছড়ালে ক্রেতারা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সেই পণ্যটি সংগ্রহে মরিয়া হয়ে ওঠেন। অতীতে লবণ বা পেঁয়াজ নিয়ে এমন মনস্তাত্ত্বিক গণ-উন্মাদনা আমরা দেখেছি, যা মুহূর্তের মধ্যে দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

যদি ক্রেতারা ‘একসাথে পুরো মাসের বাজার না করে’ এবং ‘দাম বাড়লে বিকল্প কিছু খোঁজার’ মানসিকতা তৈরি করতে পারতেন, তবে চাহিদার চাপে দাম এভাবে বাড়ার সুযোগ পেত না। মূলত ক্রেতাদের অস্থিরতা ব্যবসায়ীদের অসাধু সিন্ডিকেটকে শক্তিশালী করে।

চার.

রমজানে পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি পরিবর্তনের জন্য আমাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক আচরণে কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। ক্রেতা হিসেবে আমরা যদি একটু সচেতন হই, তবে বাজারের এই লাগামহীন ঘোড়াকে কিছুটা হলেও থামানো সম্ভব।

পরিস্থিতি উত্তরণে আমরা যা করতে পারি-
ধাপে ধাপে কেনাকাটা: পুরো মাসের বাজার একদিনে না করে সপ্তাহে সপ্তাহে করার মানসিকতা তৈরি করা। এতে বাজারে হুট করে সরবরাহ সংকট তৈরি হবে না।

বিকল্প পণ্যের ব্যবহার: কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের (যেমন: লেবু বা বেগুন) দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে সাময়িকভাবে তার বিকল্প বা অন্য খাবার গ্রহণ করা। চাহিদা কমলে ব্যবসায়ীরা দাম কমাতে বাধ্য হবেন।

গুজবে কান না দেওয়া: কোনো পণ্যের সংকট নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ালে আতঙ্কিত না হয়ে স্বাভাবিক থাকা।

যৌথ প্রতিবাদ: অহেতুক দাম বাড়ানো বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য কেনা বন্ধ করে দিলে তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়বে।

সাশ্রয়ী হওয়া: রমজানের মূল শিক্ষা হলো সংযম। ইফতারে পদের সংখ্যা কমিয়ে অপচয় রোধ করলে বাজারের ওপর চাপ অনেক কমে আসবে।

আমাদের এই সচেতনতা যদি গণআন্দোলনে রূপ নেয়, তবেই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হবে।

রমজানের সংযম সবক্ষেত্রে বিরাজ করুক- এটিই কাম্য।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow